সিনিয়র শিক্ষক
০৭ মে, ২০২৬ ০৯:১৮ অপরাহ্ণ
ইসলামে মা-বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য
মানবজীবনের সবচেয়ে পবিত্র, নিঃস্বার্থ ও গভীর সম্পর্ক হলো মা-বাবার সঙ্গে
সন্তানের সম্পর্ক। পৃথিবীতে একজন সন্তানের আগমনের পর থেকে তার বেড়ে ওঠা,
শিক্ষা, আদর্শ, সুখ-দুঃখ—সবকিছুর পেছনে মা-বাবার ত্যাগ, ভালোবাসা ও নিরলস
পরিশ্রম জড়িয়ে থাকে। মা নিজের আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে গর্ভে ধারণ
করেন, আর বাবা জীবনের কঠোর সংগ্রাম করে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন। তাই
ইসলাম মা-বাবার মর্যাদাকে অত্যন্ত উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করেছে এবং তাদের
প্রতি সদাচরণ, আনুগত্য ও সম্মান প্রদর্শনকে ঈমান ও ইবাদতের গুরুত্বপূর্ণ
অংশ হিসেবে গণ্য করেছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর ইবাদতের পরপরই মা-বাবার সঙ্গে উত্তম
আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। মহানবী (সা.)-ও মা-বাবার সন্তুষ্টিকে আল্লাহর
সন্তুষ্টি এবং তাদের অসন্তুষ্টিকে আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হিসেবে উল্লেখ
করেছেন। বর্তমান যুগে যখন অনেকেই মা-বাবার অধিকার ভুলে আত্মকেন্দ্রিক জীবনে
অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে, তখন ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য
সম্পর্কে জানা এবং তা বাস্তব জীবনে পালন করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ মা-বাবার
সেবা ও দোয়া দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার অন্যতম চাবিকাঠি। তাইতো আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সঙ্গে
কাউকে শরিক কোরো না। তোমরা মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো।’ (সুরা : নিসা,
আয়াত : ৩৬)
অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘অতএব তুমি আমার প্রতি ও তোমার মা-বাবার
প্রতি কৃতজ্ঞ হও। (মনে রেখো, তোমার) প্রত্যাবর্তন আমার কাছেই। ’ (সুরা : লুকমান, আয়াত : ১৪)
১. মা-বাবার সঙ্গে নম্র ভাষায় কথা বলা
মা-বাবা সব মানুষের কাছে সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী। তাঁদের সম্মান দিয়ে কথা বলতে হবে এবং তাঁদের সঙ্গে নম্র-ভদ্র আচরণ করতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমার রব আদেশ করেছেন যে তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো উপাসনা কোরো না এবং তোমরা মা-বাবার প্রতি সদাচরণ করো। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়ে যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হন, তাহলে তুমি তাদের প্রতি উহ শব্দটিও বোলো না এবং তাদের ধমক দিয়ো না। আর তাদের সঙ্গে নরমভাবে কথা বলো। ’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৩)
২. তাঁদের অনুমতি ছাড়া সফর না করা
মা-বাবা সর্বদা সন্তানের কল্যাণ কামনা করেন। সন্তান কখনো তাঁদের চোখের আড়াল হলে তাঁরা চিন্তিত থাকেন। এ জন্য সন্তানের কর্তব্য হচ্ছে কোথাও গেলে তাঁদের জানিয়ে এবং তাঁদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে যাওয়া। এ মর্মে একটি হাদিসে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) বলেন, ‘এক ব্যক্তি নবী করিম (সা.)-এর কাছে এসে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করল। তখন তিনি বলেন, তোমার মা-বাবা জীবিত আছেন কি? সে বলল, হ্যাঁ। নবী করিম (সা.) বলেন, তবে (তাদের খেদমতের মাধ্যমে) তাদের মধ্যে জিহাদের চেষ্টা করো।’ (বুখারি, হাদিস : ৩০০৪)
৩. রাগান্বিত হয়ে তাঁদের মুখোমুখি না হওয়া
মা-বাবার সঙ্গে শালীনতা বজায় রাখার অন্যতম দিক হচ্ছে, তাঁদের সঙ্গে রাগান্বিত হয়ে কখনো কথা না বলা। কেননা এতে তাঁরা কষ্ট পান। আর মনঃকষ্টের কারণে তাঁরা সন্তানের বিরুদ্ধে কোনো বদদোয়া করলে তা আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায়। হাদিসে এসেছে, আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, তিন ব্যক্তির দোয়া নিঃসন্দেহে কবুল হয়—১. মা-বাবার দোয়া, ২. মুসাফিরের দোয়া, ৩. মজলুমের দোয়া। (তিরমিজি, হাদিস : ১৯০৫)
৪. মা-বাবার অবর্তমানে তাঁদের আত্মীয় ও বন্ধুদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা
মা-বাবার জীবদ্দশায় তাঁদের সঙ্গে যেমন সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, তেমনি তাঁদের মৃত্যুর পর তাঁদের মুসলিম বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গেও সুসম্পর্ক রাখতে হবে। এ মর্মে হাদিসে এসেছে, ‘সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার হলো কোনো ব্যক্তির পিতার মৃত্যুর পর তার বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে সদ্ভাব রাখা।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৫২)
৫. মা-বাবার মৃত্যুর পরে তাঁদের জন্য দোয়া করা
মা-বাবা মৃত্যুবরণ করলেও তাঁদের প্রতি সন্তানের কর্তব্য শেষ হয়ে যায় না। বরং তাঁদের মৃত্যুর পর তাঁদের জন্য দোয়া করা সন্তানের অন্যতম কর্তব্য। আল্লাহর শেখানো দোয়া পবিত্র কোরআনে এসেছে—‘বলো, হে আমার রব! তুমি তাদের প্রতি দয়া করো যেমন তারা আমাকে ছোটকালে দয়াবশে প্রতিপালন করেছিলেন।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৪)
৬. তাঁদের মৃত্যুর পর তাঁদের জন্য দান-সদকা অব্যাহত রাখা
মা-বাবা মৃত্যুবরণ করলে তাঁদের মাগফিরাতের জন্য দান-সদকা করা তাঁদের সঙ্গে শিষ্টাচারের অন্তর্গত। এই দানের সওয়াব তাঁরা কবরে বসে পাবেন। এ মর্মে হাদিসে এসেছে, আয়েশা (রা.) বলেন, একজন ব্যক্তি নবী করিম (সা.)-কে বলেন, ‘আমার মায়ের আকস্মিক মৃত্যু ঘটে। কিন্তু আমার বিশ্বাস তিনি (মৃত্যুর আগে) কথা বলতে সক্ষম হলে কিছু সদকা করে যেতেন। এখন আমি তাঁর পক্ষ থেকে সদকা করলে তিনি এর নেকি পাবেন কি? তিনি বলেন, হ্যাঁ।’ (বুখারি, হাদিস : ১৩৮৮)
৭. মৃত্যুর পর তাঁদের কবর জিয়ারত করা
মা-বাবার মৃত্যুর পর তাঁদের কবর জিয়ারত করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর মায়ের কবর জিয়ারত করেন। এ সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘নবী করিম (সা.) একবার নিজের মায়ের কবরে গেলেন। সেখানে তিনি নিজেও কাঁদলেন এবং তাঁর আশপাশের লোকদেরও কাঁদালেন। তারপর বলেন, ‘আমি আমার মায়ের জন্য মাগফিরাত কামনা করতে আল্লাহর কাছে অনুমতি চাইলাম। কিন্তু আমাকে অনুমতি দেওয়া হলো না। তারপর আমি আমার মায়ের কবরের কাছে যাওয়ার অনুমতি চাইলাম। আমাকে অনুমতি দেওয়া হলো। তাই তোমরা কবরের কাছে যাবে। কারণ কবর মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩২৩৪)
৮. মা-বাবাকে গালি দেওয়ার উপলক্ষ তৈরি না করা
মা-বাবা অপমানিত হয়—এমন কোনো কাজ করা এবং যেসব কাজের কারণে তাঁদের গালি দেওয়া হয় এমন কোনো কাজ করা যাবে না। এ মর্মে হাদিসে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) বলেন, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘কবিরা গুনাহসমূহের অন্যতম হলো নিজের মা-বাবাকে গালি দেওয়া। তাঁরা (সাহাবায়ে কেরাম) জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! নিজের মা-বাবাকে কোনো মানুষ কিভাবে গালি দিতে পারে? তিনি বলেন, সে অন্যের পিতাকে গালি দেয়, তখন সে তার পিতাকে গালি দেয় এবং সে অন্যের মাকে গালি দেয়, তখন সে তার মাকে গালি দেয়।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৯৭৩)ইসলামে মা-বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য শুধু সামাজিক বা মানবিক দায়িত্ব নয়; এটি একটি মহান ইবাদত এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। তাদের সম্মান করা, ভরণ-পোষণ দেওয়া, কথা ও আচরণে নম্রতা প্রদর্শন করা, বৃদ্ধ বয়সে সেবা করা এবং তাদের জন্য দোয়া করা—এসব একজন মুমিন সন্তানের অপরিহার্য কর্তব্য। মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য পরিবারে শান্তি, সমাজে সৌহার্দ্য এবং জীবনে বরকত বয়ে আনে। আর একজন সন্তান যত বড়ই হোক না কেন, মা-বাবার ঋণ কখনো পরিশোধ করতে পারে না। তাই আমাদের উচিত তাদের জীবদ্দশায় সর্বোচ্চ সম্মান ও সেবা করা এবং মৃত্যুর পরও তাদের জন্য দোয়া, সদকা ও নেক আমলের মাধ্যমে উপকার পৌঁছানো। যে সন্তান মা-বাবার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে, সে প্রকৃত অর্থেই দুনিয়া ও আখিরাতে সফল ও সৌভাগ্যবান। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মা-বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
৩
৩ মন্তব্য