সিনিয়র শিক্ষক
০৭ মে, ২০২৬ ০৯:০৮ অপরাহ্ণ
বিলুপ্তির পথে বন্য শটি একটি প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের অবসান ও শৈশবের সবুজ স্মৃতি
বিলুপ্তির পথে বন্য শটি
একটি প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের অবসান ও শৈশবের সবুজ স্মৃতি
ভূমিকা
প্রকৃতির প্রতিটি উদ্ভিদ কেবল সবুজের অলংকার নয়; অনেক সময় একটি গাছ হয়ে ওঠে একটি অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি, লোকজ জ্ঞান ও মানুষের জীবনযাপনের নীরব সাক্ষী। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের পাহাড়ি বনাঞ্চলের পাদদেশে এমনই এক বিস্মৃতপ্রায় বুনো উদ্ভিদ ছিল—শটি বা বন্য শটি। স্থানীয়ভাবে একে কেউ বলত শটি ফুল, কেউ বন হলুদ, আবার কোথাও জংলি হলুদ নামেও পরিচিত ছিল।
একসময় বর্ষা ও গ্রীষ্মের সন্ধিক্ষণে পাহাড়ি ঢালজুড়ে শটির রঙিন ফুল ফুটে উঠত। দূর থেকে মনে হতো, সবুজ পাহাড়ের বুকজুড়ে যেন আগুনরঙা আলোর মালা ঝুলে আছে। প্রকৃতি তখন ছিল প্রাণবন্ত, উর্বর এবং মানুষের খুব কাছের। অথচ আজ বন উজাড়, পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত নগরায়ন, প্লাস্টিক সংস্কৃতি ও পরিবেশ ধ্বংসের আগ্রাসনে সেই শটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
হারিয়ে যাচ্ছে শুধু একটি উদ্ভিদ নয়—হারিয়ে যাচ্ছে একটি পরিবেশবান্ধব জীবনধারা, লোকজ ঐতিহ্য, এবং শৈশবের নির্মল স্মৃতিভূমি।
উদ্ভিদতাত্ত্বিক পরিচয়
শটি মূলত হলুদ-আদা পরিবারের একটি বর্ষজীবী বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ। এটি আর্দ্র, ছায়াযুক্ত পাহাড়ি ঢাল, ঝোপঝাড় ও বনের প্রান্তে স্বাভাবিকভাবে জন্মায়। মাটির নিচে এর মোটা রাইজোম বা কন্দসদৃশ অংশ থাকে, যা উদ্ভিদের খাদ্য সঞ্চয় করে এবং পরবর্তী মৌসুমে নতুন অঙ্কুর গজাতে সাহায্য করে।
শ্রেণিবিন্যাস
- রাজ্য: Plantae
- বিভাগ: Angiosperms
- শ্রেণি: Monocotyledonae
- পরিবার: Zingiberaceae (হলুদ/আদা পরিবার)
- বৈজ্ঞানিক নাম: Curcuma aromatica
(কিছু অঞ্চলে Curcuma zedoaria-এর সঙ্গেও সাদৃশ্য দেখা যায়) - স্থানীয় নাম: শটি, বন্য শটি, বন হলুদ, জংলি হলুদ
গাছের গঠন ও প্রকৃতি স্বভাব
শটির কোনো দৃশ্যমান শক্ত কাণ্ড থাকে না। বর্ষার শুরুতে মাটির নিচে ঘুমন্ত রাইজোম থেকে গুচ্ছাকারে পাতা বের হয়। পাতাগুলো লম্বাটে, প্রশস্ত, কোমল ও মসৃণ; দেখতে অনেকটা ছোট আকৃতির কলাপাতার মতো। পাতার রঙ সাধারণত গাঢ় সবুজ, মাঝখানে কখনো বেগুনি বা গাঢ় রেখা দেখা যায়।
উদ্ভিদটি আর্দ্রতা ও ছায়া পছন্দ করে। পাহাড়ি বনাঞ্চলের পচা পাতা-মিশ্রিত মাটিতে এটি ভালো জন্মে। অতিরিক্ত রোদ বা শুষ্কতা শটির জন্য অনুকূল নয়। বর্ষাকালে এর বৃদ্ধি দ্রুত হয়, আর শীতের শুরুতে পাতাগুলো শুকিয়ে যায়। তখন রাইজোম মাটির নিচে সুপ্ত অবস্থায় থেকে পরবর্তী বর্ষার অপেক্ষা করে।
ফুলের বিবরণ: পাহাড়ি সৌন্দর্যের রঙিন বিস্ময়
শটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ নিঃসন্দেহে তার ফুল। সাধারণত গ্রীষ্মের শেষভাগ বা বর্ষার শুরুতে ফুল ফোটে। আশ্চর্যের বিষয় হলো—অনেক সময় পাতার পূর্ণ বিকাশের আগেই মাটি ফুঁড়ে ফুলের থোকা বেরিয়ে আসে।
ফুলের গঠন শঙ্কু আকৃতির। পাপড়িগুলো কোমল, কিছুটা বাঁকানো এবং রঙে হালকা গোলাপি, সাদা, বেগুনি আভাযুক্ত কিংবা স্থানভেদে কমলা-লাল আভাও দেখা যায়। ফুলের উপরের অংশে রঙের গাঢ়ত্ব বেশি থাকায় দূর থেকে অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন লাগে।
পাহাড়ি ঢালে যখন অসংখ্য শটি একসঙ্গে ফোটে, তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন নিজ হাতে রঙের উৎসব সাজিয়েছে। শিশুকালে আমরা সেই ফুল ছিঁড়ে খেলতাম, ফুলের ভেতরে জমে থাকা হালকা মিষ্টি তরল চুষে খেতাম। সেই সরল আনন্দ আজকের প্রজন্মের কাছে প্রায় অচেনা।
শৈশবের পুষ্পিত পাহাড়
আমাদের শৈশবের পাহাড় ছিল অনেক বেশি জীবন্ত, অনেক বেশি সবুজ। বর্ষার দিনে পাহাড়ি ঢালে শটির রঙিন ফুল ফুটে থাকত সারি সারি। আমরা বন্ধুরা মিলে সেই ফুল দিয়ে মুকুট বানাতাম, কখনো ফুল হাতে যুদ্ধ খেলতাম, কখনো আবার মাটির খেলাঘর সাজাতাম।
প্রকৃতি তখন ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় খেলাঘর। কোনো দামি খেলনার প্রয়োজন হতো না। একটি ফুল, একটি পাখি কিংবা পাহাড়ি ঝরনাই আমাদের আনন্দের জন্য যথেষ্ট ছিল।
আজ কংক্রিটের শহরে বেড়ে ওঠা শিশুদের কাছে এসব গল্প হয়তো রূপকথার মতো শোনাবে। অথচ এ ছিল আমাদের বাস্তব জীবন।
প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ মোড়ক
পলিথিনের আগমনের আগে শটির পাতা ছিল গ্রামীণ জনপদের এক জনপ্রিয় প্রাকৃতিক মোড়ক। মুদি দোকানিরা গুড়, তেঁতুল, মশলা, শুকনো খাবার কিংবা ভেষজ দ্রব্য শটির পাতায় মুড়িয়ে দিতেন।
এই পাতার বিশেষত্ব ছিল—
- নমনীয়তা,
- টেকসই গঠন,
- আর্দ্রতা ধরে রাখার ক্ষমতা,
- এবং সম্পূর্ণ জৈব-বিয়োজ্য স্বভাব।
ব্যবহারের পর এটি সহজেই মাটির সঙ্গে মিশে যেত, পরিবেশের কোনো ক্ষতি করত না। আজকের ভয়াবহ প্লাস্টিক দূষণের যুগে শটির পাতা আমাদের পূর্বপুরুষদের পরিবেশবান্ধব জ্ঞানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
শটির পালু: লোকজ পুষ্টি ও ভেষজ ঐতিহ্য
শটির রাইজোম থেকে তৈরি করা হতো বিখ্যাত শটির পালু—এক ধরনের সাদা শ্বেতসার বা স্টার্চ। গ্রামীণ অঞ্চলে এটি একসময় অত্যন্ত জনপ্রিয় পুষ্টিকর খাদ্য ছিল।
রাইজোম ধুয়ে পরিষ্কার করে পিষে তার থেকে সাদা শ্বেতসার বের করা হতো। পরে সেটি শুকিয়ে সংরক্ষণ করা হতো। দুধ বা পানির সঙ্গে রান্না করে শিশু, অসুস্থ ব্যক্তি ও দুর্বল মানুষের জন্য পুষ্টিকর খাবার হিসেবে খাওয়ানো হতো।
লোকজ চিকিৎসা ও আয়ুর্বেদিক ব্যবস্থায় শটির পালু ব্যবহৃত হতো—
- শরীর ঠান্ডা রাখতে,
- হজমশক্তি বাড়াতে,
- দুর্বলতা দূর করতে,
- এবং অসুস্থতার পর শক্তি ফিরিয়ে আনতে।
আধুনিক প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ভিড়ে আজ এই প্রাকৃতিক পথ্য প্রায় বিস্মৃত।
পলিথিনের আগ্রাসন ও শটির প্রস্থান
নব্বইয়ের দশকের পর সস্তা পলিথিনের সহজলভ্যতা বাজার সংস্কৃতিকে দ্রুত বদলে দেয়। ফলে শটির পাতার ব্যবহার কমতে শুরু করে। একই সঙ্গে পাহাড় কাটা, বন উজাড়, ইটভাটা, পর্যটনের অপরিকল্পিত বিস্তার এবং নগরায়নের কারণে শটির প্রাকৃতিক আবাস ধ্বংস হতে থাকে।
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বহু পাহাড়ে আজ আর শটির দেখা মেলে না। যে পাহাড় একসময় রঙিন ফুলে ঢেকে থাকত, সেখানে এখন কংক্রিটের স্থাপনা কিংবা ক্ষতবিক্ষত মাটি।
এ এক নীরব পরিবেশ বিপর্যয়।
ফিরে পাওয়ার আনন্দ: ২০২৫-এর পুনর্মিলন
চট্টগ্রামে শটি প্রায় হারিয়ে গেলেও সিলেটের আর্দ্র পাহাড়ি পরিবেশ এখনো এই উদ্ভিদের জন্য কিছুটা অনুকূল। ২০২৫ সালে সিলেট ভ্রমণের সময় পাহাড়ি পথের ধারে হঠাৎ আবার সেই পরিচিত ফুল চোখে পড়ল।
মুহূর্তেই মনে হলো—হারিয়ে যাওয়া শৈশব যেন ফিরে এসেছে। বহু বছর আগের পাহাড়, বর্ষার দিন, বন্ধুদের হাসি—সবকিছু একসঙ্গে স্মৃতিতে জেগে উঠল।
মনে মনে বলেছিলাম—
“শটি, তুমি এখনো বেঁচে আছো?”
সেই মুহূর্তে উপলব্ধি করলাম—প্রকৃতি পুরোপুরি হার মানেনি। যত্ন, ভালোবাসা ও সংরক্ষণ পেলে অবহেলিত বুনো সৌন্দর্যও আবার ফিরে আসতে পারে।
উপসংহার
চট্টগ্রামের পাহাড় থেকে শটির হারিয়ে যাওয়া কেবল একটি উদ্ভিদের বিলুপ্তি নয়; এটি একটি পরিবেশবান্ধব জীবনব্যবস্থা, লোকজ ঐতিহ্য এবং প্রকৃতিনির্ভর শৈশবের অবসানের প্রতীক।
আজ যখন পৃথিবী প্লাস্টিক দূষণ, বন উজাড় ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের ভয়াবহ সংকটে দাঁড়িয়ে, তখন শটির মতো দেশীয় উদ্ভিদ আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানই ছিল আমাদের পূর্বপুরুষদের প্রকৃত শক্তি।
সিলেটের পথে দেখা সেই বেঁচে থাকা শটি যেন নীরবে আমাদের আহ্বান জানায়—
প্রকৃতিকে ধ্বংস নয়, সংরক্ষণ করতে হবে।
কারণ একটি দেশীয় গাছ বাঁচানো মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক টুকরো সবুজ স্মৃতি সংরক্ষণ করা।
মুফিদুল আলম
বি.এসসি (বায়োলজি), বি.এড
এম.এ (ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি)
শিক্ষক, রামু, কক্সবাজার।
৪
৪ মন্তব্য