সহকারী অধ্যাপক
০৭ মে, ২০২৬ ০৭:০৩ পূর্বাহ্ণ
মরতে তো হবেই আমি কি তৈরি ? - মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
মরতে তো হবেই
আমি কি তৈরি ?
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
মরতে তো হবেই একদিন সবার,
রাজা-ভিখারি একই কবরের অধিকার।
এই দুনিয়া শুধু ক্ষণিকের মেলা,
আজ আছে আলো, কাল আঁধার ভেলা।
মানুষ কত স্বপ্ন গড়ে রাতদিন,
ভুলে যায়—মৃত্যুই জীবনের সঙ্গীন।
কেউ বানায় প্রাসাদ, কেউ জমায় ধন,
শেষে দু’মুঠো মাটিই হয় আপন।
তাই আজ হৃদয় প্রশ্ন তোলে ধীরে—
“আমি কি প্রস্তুত শেষ যাত্রার তীরে?”
এই দুনিয়া নদীর মতো বহমান,
আজ হাসি ভাসে, কাল কান্নার গান।
শৈশব আসে রঙিন প্রজাপতি হয়ে,
যৌবন দৌড়ায় আগুনের নেশায় বয়ে।
মানুষ ভাবে—
“সময় তো আছে অনেক!”
কিন্তু মৃত্যু দাঁড়িয়ে থাকে নীরব পথরোধক।
কত বন্ধু মাঝপথে চলে গেল হঠাৎ,
কত চেনা মুখ আজ কবরের প্রভাত।
যে মানুষ গতকালও হাসছিল প্রাণে,
আজ সে নিথর শুয়ে মাটির বিছানায় টানে।
দুনিয়া বড় অদ্ভুত নাট্যমঞ্চ ভাই,
কেউ আসে, কেউ যায়—থাকে না কেউই তাই।
একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে,
মানুষ দেখে নিজেকে গভীরভাবে চেয়ে।
চোখ দুটো ক্লান্ত, মুখে সময়ের দাগ,
ভেতরে জমেছে অজস্র অনুরাগ।
সে ভাবে—
“আমি কত অন্যায় করেছি জীবনে!
কত মানুষ কেঁদেছে আমার কারণে!”
কারো হৃদয় ভেঙেছি রাগের ভাষায়,
কারো স্বপ্ন পুড়িয়েছি অহংকারের আশায়।
কত মিথ্যা বলেছি স্বার্থের নেশায়,
কত ভালোবাসা হারিয়েছি অবহেলায়।
তখন বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে প্রাণ—
“ক্ষমা পাবো তো আমি পরম দয়াময় মহান?”
রাত গভীর হলে কবর যেন ডাকে—
“একদিন তুমিও আসবে আমার কাছে।”
চাঁদের আলো পড়ে নীরব কবরস্থানে,
ঘুমিয়ে আছে মানুষ মাটির বিছানায় টানে।
কেউ ছিল ধনী, কেউ ছিল গরিব,
আজ সবাই সমান—নেই কোনো বিভেদ নিরিবিলি।
কবর বলে—
“মানুষ, এত অহংকার কেন?
তোমার শরীরও একদিন হবে ক্ষয়িষ্ণু ধূলিকণা যেন।”
সেই ডাক শুনে কেঁপে ওঠে মন,
জেগে ওঠে ঘুমন্ত বিবেকের স্পন্দন।
এক মা বসে আছে দরজার পাশে,
ছেলের স্মৃতি আজও বুক ভাসে।
ছেলেটা বলেছিল—
“আসি মা, একটু পরে ফিরবো।”
কিন্তু সেই ফেরাটা আর হয়নি কখনও।
রাস্তার এক দুর্ঘটনা কেড়ে নিল প্রাণ,
মায়ের বুকজুড়ে রয়ে গেল শূন্যতার গান।
মা আকাশের দিকে তাকিয়ে কাঁদে—
“মানুষ এত তাড়াতাড়ি হারিয়ে যায় কাঁধে কাঁধে!”
জীবন সত্যিই ভাঙা কাঁচের মতো,
এক মুহূর্তেই সব হয় নীরব, নিঃশব্দ, ক্ষত।
এক ধনী মানুষ গুনছিল টাকা,
ভাবছিল—“আমিই পৃথিবীর একমাত্র শক্তি রাখা।”
সোনার ঘড়ি, দালান, গাড়ি সারি সারি,
তবু মৃত্যুর সামনে সবই হেরে যায় ভারী।
হঠাৎ একদিন থেমে গেল নিঃশ্বাস,
চিকিৎসকরাও পারলো না করতে আশ্বাস।
লোকেরা বললো—
“ইন্না লিল্লাহ…”
ধন-সম্পদ রইলো, মানুষ গেল আল্লাহর দরবারে আহা।
সাথে গেল না ব্যাংকের হিসাব,
সাথে গেল শুধু কর্মের জবাব।
এক যুবক রাতভর আকাশ দেখে,
ভাবছে জীবন কেন এভাবে ফুরিয়ে থাকে।
বন্ধুর মৃত্যু তাকে দিয়েছে নাড়া,
হঠাৎ যেন বদলে গেছে পৃথিবীর ধারা।
সে সিজদায় পড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে—
“হে প্রভু, আমাকে ফিরিয়ে নিন আপনার আলোয় চলে।
আমি ভুল করেছি বহুবার,
তবু আপনার রহমত অশেষ অপরিসীম অপার।”
সেই রাত থেকেই বদলে গেল মন,
পাপের পথ ছেড়ে খুঁজলো আলোর জীবন।
সময় কারো জন্য থেমে থাকে না,
ফুল যেমন ঝরে, জীবনও বাঁচে না।
আজ যে শিশু মায়ের কোলে হাসে,
কাল সে বৃদ্ধ হয়ে লাঠি হাতে ভাসে।
সময় বড় নিঃশব্দ জল্লাদ,
সবকিছু কেড়ে নেয় অবিরাম অবসাদ।
তবু মানুষ ভুলে থাকে মৃত্যুর কথা,
মগ্ন থাকে দুনিয়ার মায়া-মোহ ব্যথা।
একদিন হঠাৎ থেমে যাবে সব,
বন্ধ হবে হৃদয়ের শব্দরব।
বন্ধুরা কাঁধে তুলে নেবে নিথর দেহ,
চোখের জল ঝরবে নীরব স্রোতের ঢেউ।
সেই মুহূর্তে থাকবে না কোনো পরিচয়,
থাকবে না ক্ষমতা, থাকবে না বিজয়।
শুধু প্রশ্ন উঠবে গভীর অন্ধকারে—
“কী নিয়ে এলে? কী রেখে গেলে সংসারে?”
তাই এখনও সময় আছে বন্ধু,
ফিরে এসো সত্যের বন্দরে সুন্দর।
মানুষকে ভালোবাসো, ক্ষমা করে দাও,
অহংকার ছেড়ে বিনয়ের পথে যাও।
মায়ের মুখে হাসি ফোটাও আবার,
অসহায়ের পাশে দাঁড়াও বারবার।
কারো চোখের জল মুছে দিলে যদি,
সেই দোয়া তোমার সঙ্গী হবে নিরবধি।
যেদিন মৃত্যুর ফেরেশতা আসবে কাছে,
চাই হৃদয় তখন শান্তিতে ভাসে।
ঠোঁটে থাকুক প্রভুর পবিত্র নাম,
চোখে থাকুক ক্ষমার আলোকধাম।
কবর যেন হয় শান্তির বাগান,
ভরে উঠুক নূরের অফুরন্ত গান।
হাশরের ময়দানে দিও না লজ্জা,
রহমতের ছায়ায় রেখো প্রভু সজ্জা।
মরতে তো হবেই—এ সত্য অমলিন,
তাই জীবন হোক সুন্দর, পবিত্র, রঙিন।
ক্ষমা, ভালোবাসা, দয়া আর আলো,
এই হোক মানুষের চিরন্তন ভালো।
যেদিন পৃথিবী ছাড়তে হবে নীরবে,
চাই না আফসোস জেগে উঠুক অন্তরে।
তাই আজই হৃদয় প্রশ্ন করুক ধীরে—
“আমি কি প্রস্তুত শেষ যাত্রার তীরে?”
৪
৪ মন্তব্য