সহকারী শিক্ষক
০৩ মে, ২০২৬ ০৯:৫৪ অপরাহ্ণ
সূরা হাশরের শেষ ৩ আয়াত — ৬টি ফজিলত
সূরা হাশরের শেষ ৩ আয়াত — ৬টি ফজিলত যা জানলে আর কখনো ছাড়তে পারবেন না
মাত্র ৩টি আয়াত।পড়তে ২ মিনিট লাগে।কিন্তু এর ফজিলত শুনলে চমকে যাবেন —
কারণ এই ৩টি আয়াতে আল্লাহ নিজের এমন কিছু পরিচয় দিয়েছেন, যা পুরো কুরআনে এতটা ঘনভাবে আর কোথাও একসাথে আসেনি। আর নবীজি ﷺ এই আয়াতগুলোর সাথে এমন কিছু আমল জুড়ে দিয়েছেন, যা জানলে কেউ আর ছাড়তে পারবেন না।
আজকের পোস্টে সেই ৬টি ফজিলত — একটি একটি করে।
সূরা হাশর সম্পর্কে সংক্ষেপে
সূরা হাশর মাদানী সূরা। আয়াত সংখ্যা ২৪।
এই সূরার শেষ ৩টি আয়াত (২২, ২৩, ২৪) — এগুলোতে আল্লাহ তাআলা নিজের ১৫টিরও বেশি গুণবাচক নাম একসাথে উল্লেখ করেছেন।
আর নবীজি ﷺ এই আয়াতগুলো সকাল-সন্ধ্যায় পড়ার বিশেষ ফজিলত বর্ণনা করেছেন।
আয়াত ৩টি কী?
هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ ۖ هُوَ الرَّحْمَـٰنُ الرَّحِيمُ
উচ্চারণ: হুয়াল্লাহুল্লাযি লা ইলাহা ইল্লা হুওয়া, আলিমুল গাইবি ওয়াশ শাহাদাহ, হুয়ার রাহমানুর রাহীম।
"তিনিই আল্লাহ, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছুর জ্ঞানী। তিনিই রাহমান, রাহীম।"
(সূরা হাশর: ২২)
هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ الْمَلِكُ الْقُدُّوسُ السَّلَامُ الْمُؤْمِنُ الْمُهَيْمِنُ الْعَزِيزُ الْجَبَّارُ الْمُتَكَبِّرُ ۚ سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يُشْرِكُونَ
উচ্চারণ: হুয়াল্লাহুল্লাযি লা ইলাহা ইল্লা হুওয়া, আল-মালিকুল কুদ্দুসুস সালামুল মুমিনুল মুহাইমিনুল আযীযুল জাব্বারুল মুতাকাব্বির। সুবহানাল্লাহি আম্মা ইউশরিকুন।
"তিনিই আল্লাহ, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনি বাদশাহ, পবিত্র, শান্তিদাতা, নিরাপত্তাদাতা, রক্ষক, পরাক্রমশালী, প্রতাপশালী, মহিমান্বিত। তারা যা শরীক করে তা থেকে আল্লাহ পবিত্র।"
(সূরা হাশর: ২৩)
هُوَ اللَّهُ الْخَالِقُ الْبَارِئُ الْمُصَوِّرُ ۖ لَهُ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَىٰ ۚ يُسَبِّحُ لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۖ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
উচ্চারণ: হুয়াল্লাহুল খালিকুল বারিউল মুসাউয়ির। লাহুল আসমাউল হুসনা। ইউসাব্বিহু লাহু মা ফিস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ। ওয়া হুয়াল আযীযুল হাকীম।
"তিনিই আল্লাহ, সৃষ্টিকর্তা, উদ্ভাবনকর্তা, আকৃতিদানকারী। তাঁর জন্যই সুন্দরতম নামসমূহ। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সব তাঁরই তাসবিহ করে। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।"
(সূরা হাশর: ২৪)
এখন দেখুন — এই ৩টি আয়াতের ৬টি ফজিলত।
✅ ফজিলত ১: ৭০ হাজার ফেরেশতা আপনার জন্য দোয়া করবেন
নবীজি ﷺ বলেছেন — যে ব্যক্তি সকালে ৩ বার "আউযু বিল্লাহিস সামিইল আলিমি মিনাশ শাইতানির রাজীম" পড়ে, তারপর সূরা হাশরের শেষ ৩ আয়াত পড়ে, আল্লাহ তার জন্য ৭০ হাজার ফেরেশতা নিযুক্ত করেন, যারা সন্ধ্যা পর্যন্ত তার জন্য রহমতের দোয়া করতে থাকেন।
(জামে তিরমিযী: ২৯২২)
ভাবুন একটু —
আপনি ফজরের পর মাত্র ২ মিনিট সময় দিচ্ছেন। আর ৭০ হাজার ফেরেশতা সারাদিন আপনার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করছেন। আপনি অফিসে আছেন — তারা দোয়া করছেন। আপনি রান্না করছেন — তারা দোয়া করছেন। আপনি ক্লান্ত হয়ে বসে আছেন — তারা তখনও দোয়া করছেন।
আমরা মানুষের কাছে দোয়া চাই। অথচ ৭০ হাজার ফেরেশতার দোয়া পাওয়ার সুযোগ প্রতিদিন হাতের কাছে, আর আমরা ছেড়ে দিচ্ছি।
✅ ফজিলত ২: সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সুরক্ষা
একই হাদিসে এসেছে — সকালে পড়লে সন্ধ্যা পর্যন্ত, আর সন্ধ্যায় পড়লে সকাল পর্যন্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে হিফাজত।
(জামে তিরমিযী: ২৯২২)
আজকের জীবনে এটা কতটা দরকার ভেবে দেখুন।
ঘর থেকে বের হচ্ছেন — রাস্তায় কী হবে জানেন না। সন্তানকে স্কুলে পাঠাচ্ছেন — সারাদিন চিন্তায় থাকেন। ব্যবসায় বের হচ্ছেন — কোন বিপদ আসবে কেউ জানে না।
কিন্তু আপনি যদি সকালে এই ৩টি আয়াত পড়ে বের হন, তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি অদৃশ্য ঢাল আপনার সাথে থাকছে সন্ধ্যা পর্যন্ত।
এই সুরক্ষা কোনো মানুষ দিতে পারে না। কোনো তালা, কোনো সিকিউরিটি, কোনো ইন্সুরেন্স দিতে পারে না। এটা শুধু আল্লাহর পক্ষ থেকে।
---
✅ ফজিলত ৩: শাহাদাতের মর্যাদা
নবীজি ﷺ বলেছেন — যে ব্যক্তি সকালে এই আমল করে, আর সেদিন মারা যায়, সে শহীদের মর্যাদা পায়। আর সন্ধ্যায় পড়ে রাতে মারা গেলেও একই মর্যাদা।
(জামে তিরমিযী: ২৯২২)
শাহাদাত। ইসলামে সবচেয়ে সম্মানিত মৃত্যু।
আমরা কেউ জানি না আজকের দিনটা আমাদের শেষ দিন কি না। কিন্তু ভাবুন — সকালে মাত্র ৩টি আয়াত পড়ে আল্লাহর কাছ থেকে শাহাদাতের মর্যাদার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এত বড় মর্যাদা, এত সহজ আমল — আর আমরা জানিই না।
---
✅ ফজিলত ৪: শয়তান থেকে হিফাজত
আমলের শুরুতে ৩ বার "আউযু বিল্লাহিস সামিইল আলিমি মিনাশ শাইতানির রাজীম" পড়তে হয়।
এই বাক্যে আল্লাহর দুটি নাম আছে — আস-সামি (সর্বশ্রোতা) ও আল-আলিম (সর্বজ্ঞানী)।
মানে আপনি বলছেন — ইয়া আল্লাহ, আপনি সব শোনেন, সব জানেন, আমাকে শয়তান থেকে বাঁচান।
আজকের জীবনে শয়তানের ওয়াসওয়াসা চারদিক থেকে আসে। মোবাইলের স্ক্রিনে, সোশ্যাল মিডিয়ায়, রাতের একাকীত্বে, রাগের মুহূর্তে, হারাম উপার্জনের লোভে। সকালে এই আমল করলে আল্লাহ সারাদিন শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে আপনাকে হিফাজত করেন।
---
✅ ফজিলত ৫: আল্লাহর ১৫টিরও বেশি নাম — একসাথে, ৩ আয়াতে
পুরো কুরআনে আল্লাহর ৯৯টি নাম ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন সূরায়।
কিন্তু সূরা হাশরের শেষ ৩ আয়াতে একসাথে ১৫টিরও বেশি নাম এসেছে — আল-আলিম, আর-রাহমান, আর-রাহীম, আল-মালিক, আল-কুদ্দুস, আস-সালাম, আল-মুমিন, আল-মুহাইমিন, আল-আযীয, আল-জাব্বার, আল-মুতাকাব্বির, আল-খালিক, আল-বারি, আল-মুসাউয়ির, আল-হাকীম।
এটা শুধু নামের তালিকা না। এটা আল্লাহর পূর্ণ পরিচয়।
তিনি জানেন (আল-আলিম) — আপনার গোপন কষ্ট, চোখের পানি, বুকের ভেতরের চাপা কান্না।
তিনি দয়ালু (আর-রাহমান, আর-রাহীম) — আপনার ভুলের পরও তিনি রহমতের দরজা বন্ধ করেন না।
তিনি রক্ষক (আল-মুহাইমিন) — আপনি ঘুমিয়ে থাকলেও তিনি জেগে আছেন।
তিনি আকৃতিদাতা (আল-মুসাউয়ির) — আপনার চেহারা, আপনার সন্তানের চেহারা, সব তাঁরই সৃষ্টি।
যখন এই নামগুলো বুঝে পড়বেন, তখন শুধু তিলাওয়াত হবে না — আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গভীর হবে।
---
✅ ফজিলত ৬: ঈমান তাজা হয় — প্রতিদিন
এই ৩টি আয়াত প্রতিদিন পড়লে একটি অদ্ভুত জিনিস ঘটে — ঈমান তাজা থাকে।
কারণ এই আয়াতগুলোতে আল্লাহর তাওহিদ, তাঁর ক্ষমতা, তাঁর রহমত, তাঁর সৃষ্টিক্ষমতা, তাঁর মহিমা — সব একসাথে আসে। প্রতিদিন এই কথাগুলো মুখে আনলে অন্তরে আল্লাহর বড়ত্ব বসে যায়।
আর যখন অন্তরে আল্লাহর বড়ত্ব বসে, তখন দুনিয়ার ভয় কমে, মানুষের ভয় কমে, আর আল্লাহর ওপর ভরসা বাড়ে।
আজকের জীবনে আমরা প্রতিদিন এত কিছু দেখি, শুনি, পড়ি — যার বেশিরভাগই ঈমানকে দুর্বল করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাই, কিন্তু আল্লাহর নাম নিয়ে ২ মিনিট বসি না। এই ৩ আয়াত সেই ভারসাম্য ফিরিয়ে দেয়।
---
✅ ৬টি ফজিলত — এক নজরে
▪️ফজিলত ১ — ৭০ হাজার ফেরেশতা সারাদিন দোয়া করেন।
▪️ফজিলত ২ — সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আল্লাহর হিফাজত।
▪️ফজিলত ৩ — সেদিন মারা গেলে শাহাদাতের মর্যাদা।
▪️ফজিলত ৪ — শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে সুরক্ষা।
▪️ফজিলত ৫ — আল্লাহর ১৫+ নামের মাধ্যমে তাঁকে গভীরভাবে চেনা।
▪️ফজিলত ৬ — ঈমান প্রতিদিন তাজা ও মজবুত থাকে।
আমল পদ্ধতি —
ফজরের পর ৩ বার "আউযু বিল্লাহিস সামিইল আলিমি মিনাশ শাইতানির রাজীম" পড়ুন, তারপর সূরা হাশরের শেষ ৩ আয়াত (২২, ২৩, ২৪) পড়ুন। মাগরিবের পরও একইভাবে পড়ুন।
---
মনে রাখবেন!
মাত্র ৩টি আয়াত। পড়তে ২ মিনিট। কিন্তু বিনিময়ে — ৭০ হাজার ফেরেশতার দোয়া, সারাদিন হিফাজত, শাহাদাতের মর্যাদা, শয়তান থেকে সুরক্ষা, আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক, আর ঈমানের তাজাতা।
এত কম সময়ে এত বড় ফজিলত — আর আমরা জানি না, কিংবা জেনেও আমল করি না।
আজ থেকে শুরু করুন। ফজরের পর পড়ুন। মাগরিবের পর পড়ুন। মোবাইলে স্ক্রিনশট রাখুন। মুখস্থ করে ফেলুন। পরিবারকে শেখান।
হয়তো এই ৩টি আয়াতই আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় ঘুরিয়ে দেবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সূরা হাশরের শেষ ৩ আয়াত প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় আমল করার, এর ফজিলত হাসিল করার, আর এর মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভ করার তাওফিক দিন। আমিন।
৬টি ফজিলতের মধ্যে কোনটা আপনাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করলো?
কমেন্টে লিখুন —
রেফারেন্স:
— সূরা হাশর: ২২–২৪
— জামে তিরমিযী: ২৯২২
সংগৃহীত
৪
৪ মন্তব্য