সিনিয়র শিক্ষক
০৩ মে, ২০২৬ ০৬:১৩ অপরাহ্ণ
নারীদের নাক-কান ছিদ্র করার বিধান
মানুষ স্বভাবতই সৌন্দর্যপ্রিয়। বিশেষত নারীদের মাঝে শালীনতার পরিসরে সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও অলংকার পরিধানের প্রবণতা একটি স্বাভাবিক বিষয়। ইসলাম এই স্বাভাবিক চাহিদাকে অস্বীকার করেনি; বরং তা নিয়ন্ত্রিত ও মার্জিত রূপে অনুমোদন দিয়েছে। তবে প্রতিটি বিষয়ের মতো এখানেও রয়েছে শরিয়তের নির্ধারিত সীমা ও বিধান। নাক-কান ছিদ্র করে অলংকার পরিধান—এটা কি বৈধ, নাকি সৃষ্টির মাঝে পরিবর্তনের অন্তর্ভুক্ত? এ প্রশ্ন অনেকের মনেই জাগে। ইসলামী ফিকাহ ও হাদিসের আলোকে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে, যা জানলে বিষয়টি সহজেই পরিষ্কার হয়ে যায়।
ইসলামের দৃষ্টিতে নারীদের জন্য সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা বৈধ, যদি তা শরিয়তের সীমার মধ্যে থাকে। আর নাক ও কান ছিদ্র করে অলংকার পরিধানও সেই বৈধতার অন্তর্ভুক্ত। সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে, ‘ঈদের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) নারীদের সদকা দিতে উদ্বুদ্ধ করলে তারা তাদের কানের দুল (খুরস) ও গলার অলংকার খুলে দান করেছিলেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর : ৫৮৮৩)
এতে স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় যে সাহাবি নারীরা কানে অলংকার পরিধান করতেন, যা কানের ছিদ্র ছাড়া সম্ভব নয়। রাসুল (সা.) এ ব্যাপারে কোনো আপত্তি করেননি; বরং তা নীরবে সমর্থন করেছেন। যা শরিয়তের দৃষ্টিতে অনুমোদনের প্রমাণ। অন্য একটি বর্ণনায় আয়েশা (রা.) উল্লেখ করেন, ‘নারীরা কানের অলংকার দ্বারা নিজেদের সাজাতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর : ৫১৮৯)
এই হাদিস প্রমাণ করে যে কান ছিদ্র করা একটি স্বীকৃত ও প্রচলিত বিষয় ছিল। ফিকাহর কিতাবসমূহেও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়। হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহে বলা হয়েছে, মেয়েদের নাক-কানে ছিদ্র করা জায়েজ। কারণ এটি নারীদের অলংকারের অংশ হিসেবে বিবেচিত।
আদ দুররুল মুখতার গ্রন্থে আছে, কোনো মেয়ে বা শিশুর কান ফোড়ানোয় কোনো দোষ নেই, কারণ এটি একটি ভালো কাজ বলেই সমাজে গণ্য করা হয়। আর রাদ্দুল-মুহতার গ্রন্থে আছে, ‘যদি এটি এমন কিছু হয়, যা নারীরা নিজেদের সাজানোর জন্য ব্যবহার করে, যেমনটা কিছু দেশে প্রচলিত আছে, তবে তা কানের দুল ফোড়ানোর মতোই।’ শাফিঈ মাজহাব স্পষ্টভাবে এর বৈধতার কথা বলেছে। (আদ দুররুল মুখতার ও রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড : ৯, পৃষ্ঠা : ৬০২, কারতাশি, খণ্ড : ৬, পৃষ্ঠা : ৪২০)
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি ‘সৃষ্টির পরিবর্তন’ হিসেবে গণ্য হবে না। কারণ এটি স্থায়ী বিকৃতি বা বিকলাঙ্গতা সৃষ্টি করে না; বরং স্বাভাবিক সৌন্দর্যচর্চার অংশ হিসেবে স্বীকৃত। তবে পুরুষদের ক্ষেত্রে এর বিধান ভিন্ন। পুরুষদের জন্য নাক বা কান ছিদ্র করে অলংকার পরিধান করা হারাম। কারণ এতে নারীদের অনুকরণ হয়, তাই ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। (আল ফাতাওয়াল হিন্দিয়্যা, খণ্ড : ৫, পৃষ্ঠা : ৩৫৭) অতএব, নারীদের জন্য নাক ও কান ছিদ্র করে অলংকার পরিধান করা শরিয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ এবং এটি স্বাভাবিক সৌন্দর্যচর্চার অন্তর্ভুক্ত। এটি সৃষ্টির বিকৃতি নয়; বরং অনুমোদিত অলংকারের একটি মাধ্যম। তবে শর্ত হলো, এতে যেন অপব্যয়, অহংকার বা শরিয়তবিরোধী কোনো বিষয় যুক্ত না হয়। অন্যদিকে, পুরুষদের জন্য এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। তাই আমাদের উচিত, প্রতিটি কাজ আল্লাহর বিধানের আলোকে পরিচালিত করা এবং বৈধতার মধ্যেই সৌন্দর্য খোঁজা।
৪
৪ মন্তব্য