সহকারী অধ্যাপক
০২ মে, ২০২৬ ০৯:৩৩ অপরাহ্ণ
হারানো হক, কান্নার প্রার্থনা মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
হারানো হক, কান্নার প্রার্থনা
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
বছরের পর বছর ঘাম ঝরানো হাতে,
রোদে পোড়া দিন, আর অন্ধকার রাতে।
নিজের সুখ-খাওয়া সব করেছি ত্যাগ,
স্বপ্নের বোঝা বয়ে চলেছি নির্ভাগ।
একটা কাজে জীবন দিলাম ঢেলে ঢেলে,
বারো-চৌদ্দ বছর গেল চোখের জলে।
নিজে না খেয়ে অন্যের মুখে হাসি,
নিজের কষ্টে গড়া সবারই আশ্বাসি।
তবু শেষ হলো না দেনার এই জ্বালা,
লোনের বোঝা বুকে বাড়ে হালা-হালা।
তিনটা ঋণের ভার মাথার উপর চাপ,
রাতের ঘুম হারায়, দিনের সবই তাপ।
ডিপোজিটের টাকা দিলাম ভরসা করে,
এক বন্ধুর হাতে, বিশ্বাসের ঘরে।
আজ সে বন্ধু মুখ ফিরিয়ে নেয় দূরে,
চাওয়ার সময় রেগে ওঠে গর্বের সুরে।
“দিবো না” বলে সে কেটে যায় পথ,
বন্ধুত্বের নামে ছিল শুধু অন্ধ রথ।
যে হাতে দিলাম, সে হাতই আজ শত্রু,
হৃদয়ের ভেতর জমে যায় নিঃশব্দ যন্ত্রণা-স্তু।
হে আল্লাহ! তুমিই তো সব দেখো জানো,
ভাঙা হৃদয়ের প্রতিটি কান্না মানো।
আমি তো দুর্বল, আমি তো অসহায়,
তোমার দয়ার ছাড়া আর নাই কোনো উপায়।
আমার হারানো হক ফিরিয়ে দাও তুমি,
অন্যায়ের পর্দা সরাও ভূমি-ভূমি।
যে নিয়েছে আমার ঘাম-রক্তের টাকা,
তার হিসাব তুমি করো ন্যায়ের শাখা।
হে মহান রব! তুমি তো ন্যায়ের রাজা,
তোমার দরবারে মজলুমেরই বাজা।
যে কষ্ট দিয়েছে, তার বিচার তুমি করো,
আমার ভাঙা স্বপ্ন আবার তুমি গড়ো।
আমি চাই না প্রতিশোধ, চাই না হিংসা,
শুধু চাই ন্যায়, চাই হৃদয়ের দিশা।
যে আমার হক নিয়েছে ছলনার ছলে,
তুমি সত্যের আলো দাও তারই ফলে।
দিন গেছে কেটে, রাত গেছে কেঁদে,
অসহায় মন শুধু তোমারই কাছে এঁকে।
“হে প্রভু!” বলে আজও ডাকি আমি,
তুমি ছাড়া এই দুনিয়া বড়ই শূন্য-স্বামী।
যে নেয় অন্যের হক, সে হারায় নিজ পথ,
যে কাঁদে নিঃশব্দে, তার পাশে থাকো সত্।
হে আল্লাহ, তুমি দাও ন্যায়ের জ্যোতি,
মজলুমের চোখে ফেরাও শান্তির গতি।
***
অন্যের ঘরে আলো জ্বালাই।
বারো-চৌদ্দ বছর একটানা পথ,
ক্লান্ত শরীরে তবু ছিল শপথ।
“হালাল পথে থাকবো সদা আমি,
হোক যত কষ্ট, আল্লাহই স্বামী।”
সময় গড়ালো, চাপ বাড়লো দিন,
ঋণের পাহাড় হলো কঠিন।
তিনটি লোনের ভার বুকে জমে,
ঘুম হারালো রাতের অন্ধকারে থেমে।
নিজের জন্য কিছুই আর থাকেনা,
হৃদয় শুধু কষ্টে কেঁদে ওঠে না।
এক বন্ধুর হাতে দিলাম ভরসা,
মনে ছিল না কোনো প্রতারণা-আশা।
ডিপোজিটের টাকা সঁপে দিলাম,
বন্ধুত্বের নামে জীবন বিলালাম।
সে হাসলো, বললো—“ফিরিয়ে দেবো পরে,”
কিন্তু সময় গেল, কথা গেল ঝরে।
আজ সে দূরে, মুখ ফিরিয়ে নেয়,
চাওয়ার সময় রাগে জ্বলে ওঠে হায়।
দিনের পর দিন গেল অপেক্ষায়,
“পাবো টাকা”—এই ছিল ভরসায়।
কিন্তু কথা শুধু বাতাসে মরে,
সময় হাসে নিঃশব্দে দূরে।
যে বলেছিল—“ফিরবে সবই ঠিক সময়ে,”
সে আজ নেই সেই আগের নামেম।
বন্ধুত্ব হলো কাঁচের মতো ভাঙা,
বিশ্বাস আজ কাঁদে নিঃসঙ্গ ডাঙা।
চাওয়ার দিনেই বদলে যায় সুর,
মানুষের মনে উঠে অহংকারের ঘুর।
“চাইছ কেন?”—এই প্রশ্নে আগুন,
সৎ মানুষের চোখে নামে ধূসর জুন।
যে দিলাম সব, সে-ই আজ কঠিন,
হৃদয়ের ভেতর জমে যায় ক্ষতদিন।
লোনের কিস্তি বাড়ে প্রতিদিন,
হৃদয় ভাঙে নিঃশব্দে ক্ষণভিন।
ব্যাংকের চিঠি, চাপের সুর,
রাতের ঘুম হয় দূরে দূর।
নিজের মুখে নেই আর হাসির রেখা,
জীবন যেন এক বোঝা-ঢাকা দেখা।
চোখে জল আসে, কেউ দেখে না,
ভেতরের কষ্ট কেউ বোঝে না।
হাসির মুখে লুকানো আগুন,
প্রতিটি রাত যেন দীর্ঘ গুনগুন।
“হে আল্লাহ”—এই একটাই ডাক,
বুকের ভেতর ভাঙে সব সাঁক।
কেউ বলে—“এটা তো জীবনের খেলা,”
কেউ হাসে—“তুমি বোকার মেলা।”
যার কষ্ট সে বোঝে শুধু নিজে,
অন্যরা সব থাকে দূরের দিগে।
সমাজের চোখে আমি এক ছায়া,
ভাঙা মানুষ, নিঃশেষ মায়া।
যে হাতে ছিল বন্ধুত্বের রঙ,
সে হাতেই আজ অবিশ্বাসের ঢঙ।
শপথ ভেঙে গেছে নীরবে নীরব,
সত্য আজ পড়ে আছে ধুলোর গর্ভ।
মানুষের মুখে মুখোশের খেলা,
সত্যের সাথে প্রতারণার মেলা।
হে আল্লাহ! তুমি সব দেখো জানো,
মজলুমের চোখের জল তুমি মানো।
আমি ক্লান্ত, আমি নিঃশেষ,
তোমার রহমত ছাড়া নাই আর শেষ।
যে নিয়েছে আমার ঘাম-রক্ত-হক,
তার হিসাব তুমি করো একদম কঠ।
আমি চাই না ঘৃণা, চাই না জ্বালা,
শুধু চাই তোমার ন্যায়ের আলো।
***
রাতের নিস্তব্ধতায় প্রশ্ন ওঠে মনে,
“কেন আমারই সাথে এমন ঘটে দিনে?”
কষ্ট কি শুধু আমারই ভাগ্যে লেখা,
নাকি এ জীবন এক কঠিন দেখা?
হৃদয় কাঁদে নিঃশব্দ আর্তনাদে,
আল্লাহ ছাড়া কেউ নেই এই ফাঁদে।
সময় বলে—“থেমে যেও না তুমি,”
অন্ধকারেও খুঁজে নাও আলোর ভূমি।
যে ধৈর্য ধরে, সে-ই পায় শক্তি,
দুঃখের ভেতর জন্ম নেয় ভক্তি।
আমি শিখি কষ্টের গভীর ভাষা,
ভেঙেও টিকে থাকা—এটাই আশা।
যে বন্ধু ছিল একদিন পাশে,
আজ তার নামই কষ্টের ভাষে।
প্রতিটি স্মৃতি ছুরি হয়ে কাটে,
ভরসার দেয়াল ধীরে ধীরে ভাঙে।
বিশ্বাস ছিল যেন ভোরের আলো,
আজ তা নিভে গেছে, পড়ে শুধু কালো।
আমি বুঝি—আমি একা নই,
এই কষ্টের ভার শুধু আমার নয়।
আল্লাহর হাতে সব হিসাব থাকে,
তিনি ছাড়া কেউ ন্যায় না রাখে।
হে রব! আমি তোমার দরজায় দাঁড়াই,
ভাঙা হৃদয় তোমার কাছে রাখি ভাই।
অন্ধকার যতই ঘন হয়ে আসে,
সত্যের আলো ততই জ্বলে ওঠে পাশে।
ভিতরে ভিতরে জাগে এক বিশ্বাস,
ন্যায় একদিন হবেই প্রকাশ।
যে কাঁদে চুপে, সে হারায় না,
আল্লাহ কখনো ভুলে যান না।
**মনে ওঠে আগুন—“ফিরিয়ে নাও সব,”
চোখে ভেসে আসে প্রতিশোধের রথ।
কিন্তু ভেতর থেকে এক কণ্ঠ বলে ধীরে,
“ন্যায় ছাড়া প্রতিশোধ শুধু ধ্বংসের ঘিরে।”
আমি থমকে যাই নিজেরই ভেতর,
ভালো-মন্দের যুদ্ধ তখনই প্রবল।
রাগ চায় আমাকে টেনে নিতে দূরে,
অন্যায়ের পথে আগুনের সুরে।
কিন্তু আমি থামাই নিজেকেই বারবার,
“হে মন! শান্ত হও, এটাই সততার ভার।”
প্রতিশোধ নয়—ন্যায় চাই আমি,
এই সিদ্ধান্তেই বদলে যায় ভূমি।
আমি শপথ করি অশান্ত হৃদয়ে,
ন্যায়ের বাইরে যাব না কখনো পথভ্রষ্ট হয়ে।
যে নিয়েছে, তার হিসাব আল্লাহ জানে,
আমি শুধু ধৈর্য রাখি প্রাণে প্রাণে।
রাত জাগে, তারারাও দেখে সব,
কার হৃদয় ভাঙে, কার চোখে জল প্রবল।
এই আকাশ যেন নীরব আদালত,
যেখানে লুকায় না কোনো অপরাধ।
হে রব! আমি তোমার হাতে সব ছেড়ে দিই,
আমার ভাঙা হক তুমি নিজে বুঝি।
যে অন্যায় করেছে, তুমি তার বিচার করো,
আমার কষ্টে তোমার ন্যায় প্রকাশ করো।
সময় নিজেই সাক্ষী হয়ে দাঁড়ায়,
কার পাপ কত গভীরে লুকায়।
মানুষ ভুলে যায়, সময় ভুলে না,
ন্যায়ের হিসাব কেউ থামাতে পারে না।
একদিন সত্য ঠিকই বেরিয়ে আসে,
মিথ্যার মুখোশ ধীরে ধীরে ফাঁসে।
যে হাসছিল অন্যের কষ্টে,
সে-ই পড়ে নিজেরই গর্তে।
একটি একটি করে হিসাব খুলে যায়,
অন্যায়ের বোঝা সামনে দাঁড়ায়।
যা লুকানো ছিল দিনের আলোয়,
তা ধরা পড়ে সত্যের ছায়ায়।
যে কেঁদেছিল নিঃশব্দে রাতের পরে,
তার কান্নাই আজ ন্যায়ের সুরে ঝরে।
সে জেতে না যুদ্ধের অস্ত্রে,
সে জেতে আল্লাহর রহমতের পথে।
যে নিয়েছিল অন্যের ঘাম,
তার সামনে আসে হিসাবের ধাম।
দুনিয়ার সব শক্তি তখন নিস্তব্ধ,
ন্যায়ের সামনে সবই অচল, অবদ্ধ।
অহংকার ধসে পড়ে মাটির মতো,
যে ছিল শক্ত, সে হয় নত।
জুলুমের দেয়াল ভেঙে পড়ে,
সত্যের আলো চারিদিকে জ্বলে।
চোখে নামে অনুতাপের জল,
“কেন করেছিলাম এমন ভুল?”
কিন্তু সময় আর ফিরে আসে না,
হারানো হক আর ফেরে না।
হে মহান রব! তোমার ন্যায় পূর্ণ,
তোমার বিচার কখনো হয় না অন্ধ।
যে কষ্ট দিয়েছিল অন্যায়ভাবে,
সে পেল ফল তার নিজের কাজে।
অন্ধকার শেষে আসে ভোরের আলো,
হৃদয়ে নামে শান্তির ভালো।
যে কেঁদেছিল, সে এখন থামে,
আল্লাহর রহমতে জীবন জাগে।
এই জীবন এক পরীক্ষার নাম,
ন্যায়, ধৈর্য আর আল্লাহর কালাম।
যে হারায় হক, সে হারায় না চিরতরে,
আল্লাহ ফেরান তার ন্যায়ের ঘরে।
মজলুমের কান্না বৃথা যায় না,
আল্লাহর দরবারে কিছুই হারায় না।
এই হলো জীবনের চূড়ান্ত সত্য—
ন্যায়ই শেষ, ন্যয়ই অমৃত।
যে কষ্ট পায়, সে একা নয়,
আল্লাহ আছেন—এটাই সত্য জয়।
ধৈর্য ধরো, ন্যায় আসবেই,
অন্ধকার শেষে আলো উঠবেই।
৪
৪ মন্তব্য