সহকারী অধ্যাপক
৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:৪৯ পূর্বাহ্ণ
আরশের ছায়া - মোঃ মুজিবুর রহমান
আরশের ছায়া
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
যেদিন রোদ হবে দহনময়, ছায়া থাকবে না কোথাও,
মানুষ দিশেহারা হবে, আশ্রয় পাবে না কেউ আর কাও।
সেদিন আল্লাহ ডেকে নেবেন, সাতটি শ্রেষ্ঠ প্রাণ—
আরশের ছায়ায় বসাবেন, দিবেন শান্তির দান।
প্রথম সে ন্যায়বান নেতা, সত্য যার পথচলা,
ক্ষমতায় থেকেও করেনি কখনো অন্যায়কে ভোলা।
দ্বিতীয় সে তরুণ, যৌবন যার পবিত্রতায় ভরা,
ইবাদতে কাটিয়েছে দিন, ছিল আল্লাহরই ধরা।
তৃতীয় সে মানুষ, মসজিদে যার মন পড়ে রয়,
ফিরে আসার আকুলতা তার হৃদয়ে সদাই কয়।
চতুর্থ দুই বন্ধু, আল্লাহর প্রেমে গাঁথা প্রাণ,
মিলন-বিচ্ছেদ সবই তাদের আল্লাহরই দান।
পঞ্চম সে নির্জন রাতে, চোখে যার অশ্রুধারা,
আল্লাহ ভেবে কেঁদে ওঠে— সে তো ভাগ্যসারা।
ষষ্ঠ সে সংযমী বান্দা, প্রলোভন যারে ডাকে,
আল্লাহর ভয়ে ফিরে আসে, পাপ থেকে নিজেকে রাখে।
সপ্তম সে দানশীল জন, লুকিয়ে করে দান,
ডান হাত যা দেয়— বাম হাতও পায় না তার জ্ঞান।
এরা সাতজন ভাগ্যবান, আল্লাহর প্রিয় দাস,
আরশের ছায়ায় পাবে স্থান— হবে চিরউল্লাস।
***
যেদিন ভেঙে যাবে দুনিয়ার সব রঙিন আয়োজন,
সূর্য হবে নিকটতর, থামবে জীবনের গঠন।
মানুষ তখন দিশাহারা, তৃষ্ণায় কাতর প্রাণ,
ছায়াহীন সেই প্রান্তরে কে দেবে অবলম্বন?
সেদিন শোনা যাবে ডাক— মহাশক্তির বাণী,
“আজ আমারই ছায়া ছাড়া নেই কোনো আর টানি।”
কাঁপবে হৃদয়, থমকে যাবে সকল অহংকার,
কারা পাবে সেই ছায়া? কারা হবে ভাগ্যধার?
ক্ষমতার আসনে বসে যে রাখে ন্যায়ের মান,
অন্যায়ের সাথে আপোষ করে না কোনদিন প্রাণ।
বিচারে সে নির্ভীক, সত্য তার একমাত্র পথ,
মানুষের কল্যাণেই কাটে তার প্রতিটি রত্নরথ।
ঘুষ, লোভ, ভয়— কিছুই তাকে টলাতে পারে না,
আল্লাহর ভয়ে সে কখনো সত্য ছাড়ে না।
সেই নেতা সেদিন পাবে আরশের শীতল ছায়া,
ন্যায়ের জন্য কষ্ট সয়ে— পেয়েছে চির মায়া।
যৌবনের উত্তাপে যখন মন চায় উন্মাদনা,
সে তখন নামাজে খোঁজে জীবনের প্রেরণা।
বন্ধুরা যখন ভুল পথে, ডাকে তাকে বারবার,
সে বলে— “আমার পথ আল্লাহর, এটাই সত্যিকার।”
রাতের অন্ধকারে সে কাঁদে সিজদায় লুটিয়ে,
পবিত্রতায় ভরে ওঠে হৃদয় আলো ফুটিয়ে।
এই যুবকই সেদিন হবে ছায়ার অধিকারী,
তার ইবাদতই হবে মুক্তির পথচারি।
যে মানুষটির প্রাণ পড়ে থাকে মসজিদের দ্বারে,
বের হলেও ফিরে আসার ব্যাকুলতা তারে ডাকে।
আজান শুনলেই ছুটে আসে, থামে না কোনো কাজ,
আল্লাহর ঘরেই সে খুঁজে নেয় শান্তির সব সাজ।
তার হৃদয় যেন বাঁধা পড়ে মসজিদেরই সাথে,
পৃথিবীর টান হার মানে ঈমানেরই পথে।
সেই মানুষ সেদিন পাবে আরশের ছায়ার ছোঁয়া,
মসজিদের প্রেমে সে হয়েছে আল্লাহরই প্রিয় দোয়া।
দুইটি প্রাণ, এক হৃদয়— আল্লাহর প্রেমে বাঁধা,
স্বার্থ নয়, দুনিয়া নয়— ঈমানই তাদের সাধা।
মিলন তাদের আল্লাহর জন্য, বিচ্ছেদও তাই,
তাদের ভালোবাসায় নেই কোনো মিথ্যা বা দায়।
এই বন্ধুত্ব চিরন্তন, জান্নাতের পথপ্রদর্শক,
তাদের সম্পর্ক আল্লাহর কাছে সবচেয়ে আলোকিত রশ্মক।
সেদিন তারা ছায়ায় বসে হাসবে নির্ভয়ে,
কারণ তাদের প্রেম ছিল শুধু আল্লাহরই জন্যে।
গভীর রাতে, যখন ঘুমে ঢেকে যায় সব,
একজন উঠে দাঁড়ায়— তার হৃদয়ে রব।
চোখ বেয়ে নামে অশ্রু, কাঁপে তার প্রাণ,
আল্লাহর ভয়ে সে কাঁদে— এ তারই সম্মান।
কেউ দেখে না, কেউ জানে না তার এই আর্তনাদ,
তবু আল্লাহ জানেন সব— রাখেন তার হিসাব।
সেই কান্নাই হবে সেদিন মুক্তির কারণ,
আরশের ছায়ায় পাবে সে শান্তির আসন।
প্রলোভন যখন ডাকে, সুন্দরীর আহ্বান,
নফস বলে— “চল”, কিন্তু ঈমান দেয় বাধান।
সে বলে— “আমি ভয় করি আল্লাহর বিচার”,
ফিরে আসে সে— জিতে যায় তার অন্তর।
এই সংযমই তাকে করে প্রকৃত বীর,
পাপের আগুন থেকে রাখে নিজেকে ধীর।
সেদিন সে পাবে ছায়া— সম্মানের সাথে,
কারণ সে জিতেছে নিজের নফসেরই সাথে।
নীরবে যে দেয়, কাউকে না জানিয়ে,
দানের আনন্দ রাখে শুধু আল্লাহরই কাছে নিয়ে।
ডান হাত যা দেয়, বাম হাতও জানে না,
এমন নিঃস্বার্থ দান খুব সহজে পাওয়া না।
তার দানে নেই অহংকার, নেই কোনো প্রদর্শন,
শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টিই তার একমাত্র অর্জন।
সেই দানশীল বান্দা পাবে ছায়ার আশ্রয়,
তার গোপন আমলই তাকে দেবে চিরময়।
সাত শ্রেণির এই মানুষ— দুনিয়ায় ছিল ভিন্ন,
কিন্তু আল্লাহর কাছে তারা সবার চেয়ে মূল্যবান।
হাশরের সেই কঠিন দিনে, যখন নেই কোনো ছায়া,
তারা থাকবে আরশ তলে— পাবে শান্তির মায়া।
এই হাদিস শুধু গল্প নয়, জীবনের দিশা,
কেমন হলে মানুষ পাবে আল্লাহর ভালোবাসা।
চেষ্টা করি আমরা সবাই, এই পথে চলতে,
তাহলেই একদিন হয়তো— ছায়ায় যাবো ঢলতে।
***
রৌদ্র জ্বলে আগুন হয়ে, থামে না তার দাহ,
মানবজীবন কাঁপতে থাকে, নেই কোথাও চাহ।
মাটি যেন জ্বলন্ত চুলা, আকাশ নিঃসহায়,
ছায়াহীন সে মহামাঠে কে দেবে আশ্রয়?
সেদিন হবে ঘোষণা এক— কাঁপবে দিকবিদিক,
“আমার ছায়া ছাড়া আজ নেই তো কোনো ঠিক।”
মানুষ তখন দিশেহারা, বুক কাঁপে ভয় ঢেউ,
কারা পাবে সেই আশ্রয়— জানে না কেউ।
ক্ষমতার সিংহাসনে বসে, সত্য যারে টানে,
বিচারে সে নির্ভীক থাকে, অন্যায় নাহি মানে।
লোভ-ভয় কিছুই পারে না ন্যায় থেকে সরাতে,
মানবতার পথ দেখায় সে সত্যের আলো হাতে।
চারদিক থেকে চাপ আসে, প্রলোভনের ঢেউ,
স্বজনপ্রীতি, স্বার্থ লোভে ডাকতে থাকে কেউ।
তবু সে বলে— “আল্লাহ দেখেন, আমি করব ঠিক”,
এই সততা রাখে তাকে ছায়ার যোগ্য ঠিক।
যৌবন যখন ঝড়ের মতো টানে নানা দিকে,
সে তখন সিজদায় পড়ে আল্লাহরই ডাকে।
বন্ধুরা ডাকে ভুল পথে, হাসে তারে দেখে,
সে বলে— “আমার শান্তি নামাজেরই রেখে।”
নফসের সাথে যুদ্ধ করে, লড়াই চলে অন্তর,
পাপের আগুন নিভিয়ে দেয় ঈমানেরই জ্যোত্স্নার।
এই তরুণই একদিন হবে উজ্জ্বল নক্ষত্র,
আরশের ছায়ায় পাবে সে অনন্তেরই পথ।
***
আজানের ধ্বনি শুনলেই প্রাণ ছুটে যায় তায়,
দুনিয়ার সব ব্যস্ততা সে ভুলে যায় হায়।
মসজিদেরই মাটির গন্ধ শান্তি এনে দেয়,
তার হৃদয় আল্লাহর ঘরে বাঁধা হয়ে রয়।
বের হয় তবু মনে পড়ে— “কবে যাবো আবার?”
এই আকুলতা প্রমাণ করে প্রেম তার অপার।
যে হৃদয় আল্লাহর ঘরে পায় শান্তির ছোঁয়া,
সে হৃদয়ই পাবে সেদিন ছায়ার মধুর নোয়া।
দুইটি প্রাণ মিলেছে যেন আল্লাহরই টানে,
স্বার্থহীন ভালোবাসা, সত্য যার প্রাণে।
মিলন-বিচ্ছেদ সবই তাদের আল্লাহর সন্তোষে,
এই বন্ধন টিকে থাকে জান্নাতেরই রোষে।
দুনিয়ার লোভ এলে যখন ভাঙতে চায় সে বাঁধ,
তারা থাকে অটুট হয়ে— ঈমান তাদের সাধ।
এই ভালোবাসা পাবে একদিন শ্রেষ্ঠ পুরস্কার,
আরশের ছায়ায় বসবে তারা— সম্মান অপরিসীম আর।
নিশীথ রাতে সবাই ঘুমে, এক বান্দা জাগে,
চোখের জলে ভিজে যায় তার সিজদারই ভাগে।
কেউ দেখে না, কেউ জানে না— কান্না তার গোপন,
আল্লাহর ভয়ে কাঁপে তার অন্তরেরই স্পন্দন।
এক ফোঁটা অশ্রু ঝরে যদি খোদার ভয়ে প্রাণ,
সেই অশ্রু আগুন নেভায়, দেয় মুক্তির দান।
এই কান্নাই সেদিন হবে তার ঢাল ও ঢাল,
আরশের ছায়ায় পাবে সে শান্তিরই কাল।
সৌন্দর্য ডাকে মায়ার সুরে, টানে অন্তর প্রাণ,
পাপের পথে আহ্বান আসে— ভাঙে নৈতিক জ্ঞান।
তবু সে বলে— “আমি ভয় করি রবেরই বিচার”,
ফিরে আসে সে— বাঁচায় নিজের চরিত্র।
নিজেকে জয় করাই হলো সবচেয়ে বড় জয়,
নফসকে হারিয়ে যে বাঁচে— সে-ই প্রকৃত ভয়।
এই সংযমই তাকে দেয় মর্যাদার স্থান,
আরশের ছায়ায় পাবে সে সম্মানের দান।
অন্ধকারে দেয় যে দান, জানে না কেউ কভু,
তার দানে নেই কোনো গর্ব, নেই কোনো কভু।
ডান হাত যা দেয়, বাম হাত পায় না তার খবর,
এই দানেই খুশি হন রব, মুছে দেন সব কবর।
দান শুধু সম্পদ নয়— হৃদয়েরই আলো,
নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় খুলে জান্নাতের তালা।
এই দানশীল মানুষ পাবে ছায়ার অধিকার,
কারণ সে দিয়েছে শুধু আল্লাহরই দ্বার।
সাত শ্রেণির মানুষ তখন একত্রিত হয়,
প্রত্যেকে আলাদা পথে এসেছে সত্যময়।
আজ তারা একত্রে পায় মহান এক দান—
আরশের ছায়া, শান্তি, অফুরন্ত সম্মান।
যেখানে নেই কোনো ভয়, নেই কোনো কষ্ট,
সেই ছায়াতলে তারা পায় অনন্তেরই রশ্মি।
হাসি ভরা মুখ, হৃদয়ে শান্তির ঢেউ,
এই পুরস্কার পায় তারা— যাদের ঈমান ঢেউ।
যারা ভুলে গেছে সত্য, ডুবে ছিল পাপে,
তারা দাঁড়িয়ে কাঁদে আজ সেই কঠিন সাপে।
ছায়াহীন সে প্রান্তরে কষ্ট তাদের সাথী,
এই দৃশ্য শিক্ষা দেয়— সত্যই একমাত্র পথই।
এই কাহিনী শুধু নয়— জীবনেরই দিশা,
কেমন হলে মানুষ পাবে রবের ভালোবাসা।
ন্যায়, ইবাদত, ভালোবাসা, সংযম আর দান—
এই পথেই লুকিয়ে আছে মুক্তিরই জ্ঞান।
এসো আমরা চলি সবাই সেই আলোর পথে,
জীবন গড়ি সত্য দিয়ে, ঈমানেরই রথে।
হয়তো আমরাও একদিন পাবো সেই ছায়া,
আল্লাহর রহমতে মুছে যাবে সব মায়া।
***
৪
৪ মন্তব্য