সহকারী শিক্ষক
২৭ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:৩২ অপরাহ্ণ
রূপা এবং একটি বাস ভ্রমণ
রূপা এবং একটি বাস ভ্রমণ!
সময় ২০১২ সালের জুলাই। তারিখটা হয়তো ১২।
তার আগের দিন হঠাৎ রূপার একটি ম্যাসেজ,
“তুমি কি আগামীকাল ফ্রি আছ? আমি একটু সাতক্ষীরা যাব গাজীপুর থেকে।”
অবাক হয়েছিলাম, তবু একটুও দেরি করিনি। এক কথায় রাজি হয়ে গেলাম।
জিজ্ঞেস করলাম, “আমি কোথায় আসব?”
ও বলল, “আমি রাজেন্দ্রপুরে আছি। সন্ধ্যা ৬টা ১৫-তে চলে আসো।”
রূপার ব্যাপারে আমি কখনো দুবার ভাবিনি।
পরদিন সকালে ট্রেনে রওনা দিলাম। বিকেল গড়িয়ে ৫টার পর রাজেন্দ্রপুর পৌঁছালাম।
ও আগেই ছিল—মাসির বাড়িতে বেড়াতে। দেখা হলো।
কিন্তু হঠাৎই এক অপ্রত্যাশিত বাধা—যে বাসে যাওয়ার কথা, সেটাই যাবে না!
তবুও আমরা থামিনি। এক অদ্ভুত তাড়নায় ছুটে চললাম।
কাউন্টারে দৌড়, সময় তখন হাতে মাত্র ১০ মিনিট।
অবশেষে আরেকটি বাস পাওয়া গেল। উঠে পড়লাম। সিট পড়ল একদম পেছনের দিকে,
যেন আমাদের জন্যই ফাঁকা রাখা ছিল।
বাসে যাত্রী কম। আমাদের গন্তব্য আঠারো মাইল।
বাস ছাড়ল। কিছুদূর গিয়ে থামল।
রূপা জানালার পাশে বসে,সূর্য তখন দিগন্তে গড়িয়ে পড়ছে।
হঠাৎ আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে হলো। ওরও হলো।
টাকা দিল রূপা—যেন খুব স্বাভাবিক এক অভ্যাস।
টাকা দিতে ও কখনো কার্পণ্য করত না।
ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেই তখন ওর একটা এনজিওতে চাকরি হয়েছে।
আবার বাস চলল। গাজীপুর থেকে নবীনগর,প্রায় তিন ঘণ্টা, শুধু জ্যাম আর জ্যাম।
নবীনগরে আবার থামা।
এইবার কোল্ড ড্রিংস।আবারও রূপার হাতেই বিল।
রাত নেমে এল ধীরে ধীরে।
রাত ১১টার দিকে আমরা পৌঁছালাম আরিচা।
ফেরিঘাটের সেই রেস্টুরেন্টে ওঠার সময়,
অজান্তেই আমি ওর বাম হাতটা ধরেছিলাম।
ও কিছু বলেনি। আমিও না।
কিন্তু সেই নীরব মুহূর্তে, অদৃশ্য এক সেতু যেন গড়ে উঠেছিল আমাদের মাঝে।
ইলিশ ভাজা নিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু মান ভালো লাগল না।
শেষমেশ দুজনেই মুরগি খেলাম। খাবার ভালো ছিল না।
তবুও সেই সময়টা, সেই মুহূর্ত—অদ্ভুত সুন্দর।
আকাশে তখন চাঁদ। মৃদু আলো নদীর বুকে ছড়িয়ে আছে।
আমরা দুজন—নদী দেখি, আকাশ দেখি—
আর আমি হারিয়ে যাই এক অজানা ভাবনায়…
রূপা বলেছিল, একদিন ওর শ্বশুরবাড়ি দিনাজপুরে নিয়ে যাবে…
রাত ৪টার দিকে আমরা নামলাম আঠারো মাইলে।
চারপাশ নিস্তব্ধ। শেষ রাতের হিমেল হাওয়া।
রূপা বলল, “আমাকে সাতক্ষীরা দিয়ে আসতে হবে।”
আমি কিছু না ভেবেই রাজি হয়ে গেলাম।
দুজন দাঁড়িয়ে রইলাম সেই নির্জন পথের ধারে।
ধীরে ধীরে ভোরের আলো ফুটতে লাগল।
তারপর অন্য এক বাসে উঠে,
আমি ওকে সাতক্ষীরা পৌঁছে দিলাম।
সকালে একটা ছোট রেস্টুরেন্টে নিয়ে গিয়ে নাস্তা করাল।
তারপর আসার ভাড়া হাতে দিয়ে বলল,
“এটা রাখ।”
আমি লজ্জা পেয়েছিলাম। তবুও নিলাম।
হয়তো সেই টাকাটা নয়,
সেই যত্ন, সেই নীরব সঙ্গ, সেই স্পর্শটাই ছিল আসল…
আজও মনে হয়,
ওটাই ছিল আমার জীবনের সেরা বাস ভ্রমণ।
৪
৪ মন্তব্য