সহকারী শিক্ষক
১৯ এপ্রিল, ২০২৬ ০৭:৪৪ অপরাহ্ণ
আমার সন্তানের হাতে আমার ফাসি হোক
আমার সন্তানের হাতে আমার ফাসি হোক
আমার প্রথম স্ত্রীর নাম ছিল নাজমা। আমাদের মধ্যে আগে হালকা প্রেমের সম্পর্ক ছিল, তারপরই বিয়ে। বিয়েতে দুজনেরই আগ্রহ ছিল। শুরুতে সংসার মোটামুটি ভালোই চলছিল। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই আমাদের সম্পর্কের মধ্যে অস্বস্তি দেখা দিতে থাকে। নাজমার কোনো কিছুই আমার ভালো লাগত না, আর আমার কোনো কিছুই যেন তার ভালো লাগত না।
এর মধ্যেই আমাদের প্রথম সন্তান, পুত্র,তার নাম রাখলাম শুভ। কিন্তু আমাদের দাম্পত্য জীবনের ঝগড়া-বিবাদ সন্তানের ওপরও প্রভাব ফেলতে লাগল। আমাদের সম্পর্কটা যেন সূক্ষ্ম এক সুতোয় ঝুলে ছিল—ভাঙেনি, কিন্তু মজবুতও ছিল না। সংসার টিকে ছিল, তবে ভালোবাসা আর সম্মানের ঘাটতি ছিল স্পষ্ট।
সত্যি বলতে, আমি তখন খুব স্বার্থপর ছিলাম। নিজের কাজ, নিজের জীবন,এসব নিয়েই ব্যস্ত থাকতাম। স্ত্রীর প্রতি আমার সম্মান ছিল না বললেই চলে। পরে আমাদের একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হলো।সে দেখতে একেবারে আমার মতো। কিন্তু বাবা হিসেবে আমার স্নেহ-দায়িত্ববোধ তখনও জাগেনি।
আমাদের বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ির দূরত্ব ছিল প্রায় একশো কিলোমিটার। কন্যাসন্তানের জন্মের কিছুদিন পরই আমি স্ত্রী-সন্তানদের তাদের নানাবাড়িতে পাঠিয়ে দিই। জানতাম সেখানে সমস্যা আছে, কিন্তু কখনো গুরুত্ব দিয়ে ভাবিনি। আমি নিজের জগৎ নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম।বন্ধুবান্ধব, আড্ডা, নিজের মতো থাকা। স্ত্রী বা সন্তানের খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজনও অনুভব করিনি।
একসময় আমাদের বিচ্ছেদ হলো। ছেলে তার মায়ের সঙ্গে চলে গেল, আর মেয়েটা আমার কাছে রইল। কিছুদিন পর আমি দ্বিতীয়বার বিয়ে করলাম। আমার দ্বিতীয় স্ত্রী আমার মেয়েকে নিজের সন্তানের মতোই ভালোবাসত, যত্ন নিত। অথচ আমি নিজেই কখনো সেই দায়িত্বটা ঠিকভাবে পালন করিনি।
অদ্ভুত লাগে,প্রথম স্ত্রীর প্রতি যেমন দায়িত্বহীন ছিলাম, দ্বিতীয় স্ত্রীর প্রতিও তেমনই ছিলাম। আমি যেন কোনো সম্পর্কের মূল্যই বুঝিনি।
কিছুদিন পর দ্বিতীয় স্ত্রী আমার মেয়েকে নিয়ে চলে গেল। অনেক দিন পরে একদিন ফোন করে বলল“তোমার নিজের সন্তান তোমার কাছে যতটা অবহেলিত ছিল, আমার কাছে সে ততটাই আদরের। আমি আবার বিয়ে করেছি। তোমার সন্তান আমার কাছেই বড় হচ্ছে। আমিও একজন মা। তুমি ভালো থেকো।”
এই কথাগুলো বলেই সে ফোন কেটে দেয়।
আজ ভাবি—আমি কি সত্যিই মানুষ ছিলাম? একজন বাবার কি সন্তানের প্রতি কোনো দায়িত্ব থাকবে না? কোনো মায়া, মমতা, ভালোবাসা থাকবে না? আমি নিজেই নিজের কাছে প্রশ্ন করি।
আমি স্বীকার করি,আমি ব্যর্থ ছিলাম। একজন স্বামী হিসেবে, একজন বাবা হিসেবে—আমি আমার দায়িত্ব পালন করতে পারিনি। আজ সেই ভুলগুলোর জন্য গভীর অনুতাপ হয়।
৪
৪ মন্তব্য