Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৪ এপ্রিল, ২০২৬ ০২:৫৩ অপরাহ্ণ

পাহাড়ের হৃদস্পন্দন: বৈসাবি ও সম্প্রীতির অবিনাশী সুর

পাহাড়ের হৃদস্পন্দন: বৈসাবি ও সম্প্রীতির অবিনাশী সুর

ভূমিকা

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম — বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের এক অনন্য লীলাভূমি। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা অকৃত্রিম প্রকৃতি আর সেখানকার মানুষের সহজ-সরল জীবনধারা আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বিশাল ক্যানভাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল ও বর্ণিল রঙটি হলো ‘বৈসাবি’। এটি শুধু একটি উৎসব নয়, বরং পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের ঐতিহ্য, আত্মপরিচয় এবং পারস্পরিক সম্প্রীতির জীবন্ত দলিল। 

ত্রিপুরাদের ‘বৈসু’, মারমাদের ‘সাংগ্রাই’ এবং চাকমাদের ‘বিজু’ — এই তিন উৎসবের আদ্যাক্ষর নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘বৈসাবি’। আজ এটি সমগ্র পাহাড়ের এক অভিন্ন মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে, যেখানে ভিন্ন ভাষা ও রীতির মানুষ একই ছন্দে নাচে, গায় ও হাসে।

ভৌগোলিক পরিচয় ও পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি

পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজ পাহাড়, ঝরনা ও জঙ্গলের মাঝে যুগ যুগ ধরে বাস করছেন বিভিন্ন পাহাড়ী জনগোষ্ঠী। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা এই মানুষেরা একইসঙ্গে প্রকৃতিকে দেবতাজ্ঞানে শ্রদ্ধা করেন। আমার দৃষ্টিতে তাঁদের ‘আদিবাসী’ বলার চেয়ে ‘পাহাড়ী জনগোষ্ঠী’ হিসেবে অভিহিত করা অধিকতর বাস্তবসম্মত। কারণ এই শব্দটি তাঁদের ভৌগোলিক আবহ, কঠোর জীবনসংগ্রাম এবং পাহাড়ের সঙ্গে নাড়ির টানকে সরাসরি প্রতিফলিত করে। 

বৈসাবি এই জনগোষ্ঠীকে একই সুতোয় গেঁথে রাখে। ভৌগোলিক দূরত্ব ঘুচিয়ে হৃদয়ের বন্ধনকে প্রধান করে তোলে।

উৎসবের ত্রিমাত্রিক রূপ: বৈসু, সাংগ্রাই ও বিজু
চৈত্র সংক্রান্তির সন্ধিক্ষণে প্রতিটি জনগোষ্ঠী নিজস্ব ঢঙে উৎসবের রঙ ছড়ায়। 

ত্রিপুরাদের "বৈসু" তিন দিনব্যাপী। প্রথম দিন ‘হারি বৈসু’তে নারীরা বন থেকে ফুল সংগ্রহ করে নদীতে ভাসিয়ে প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। দ্বিতীয় দিন ‘বিসুমা’ মূল উৎসব — ঘরে ঘরে ঐতিহ্যবাহী খাবার ও আনন্দ। শেষ দিন ‘বিসিকাতাল’ বা আতাদাং — নতুন সংকল্প গ্রহণ ও বড়দের আশীর্বাদ নেওয়ার দিন। 

মারমাদের "সাংগ্রাই" ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও বাঁধভাঙা উৎসাহের মিশ্রণ। এর প্রধান আকর্ষণ ‘রিলং পোয়ে’ বা জলকেলি। পবিত্র পানি শরীরের পাশাপাশি মনের কলুষতা ধুয়ে দেয় বলে তাঁদের বিশ্বাস। 

চাকমাদের "বিজু" শুরু হয় ‘ফুল বিজু’ বা ‘ফুল বিজু’র স্নিগ্ধতায় — নদীতে ফুল ভাসিয়ে পুরোনো বছরের দুঃখ-ক্লেশ বিদায়। দ্বিতীয় দিন ‘মূল বিজু’তে প্রায় ৩০-৪০ রকমের সবজি দিয়ে তৈরি হয় বিখ্যাত 'পাজন'। শেষ দিন ‘নূয়াবঝর’ বা গোজ্যাপোজ্য — বড়দের সম্মান ও নতুন বছরের শুভকামনা।

পাহাড়ী নারীদের বর্ণিল সাজ ও নান্দনিকতা 
বৈসাবির দিনগুলোতে পাহাড়ী নারীরা চিরায়ত ঐতিহ্যকে সগৌরবে তুলে ধরেন। তাঁদের সাজপোশাক পাহাড়ী সংস্কৃতির গভীর মমত্ববোধ ও শৈল্পিক রুচির প্রতিচ্ছবি। 

চাকমা নারীরা পরেন লাল-কালোর বৈচিত্র্যময় "পিনন-হাদি", যা হাতে বোনা সূক্ষ্ম নকশায় সমৃদ্ধ। মারমা ও ত্রিপুরা নারীরা রঙিন "থামি" ও ব্লাউজে সজ্জিত হন। গাঢ় লাল, নীল, সবুজ ও হলুদ রঙের আধিক্য পাহাড়ের প্রশান্তির মাঝে চঞ্চল প্রাণের স্পন্দন জাগায়। 

সাজের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ 'পাইজাং ফুল' বা বিজু ফুলসহ বনের তাজা বুনোফুল। নারীরা লম্বা চুলে খোপা বেঁধে তাতে ফুল গুঁজে রাখেন'কখনো ফুলের মালা গলায় বা খোপার চারপাশে জড়ান। সঙ্গে রুপা ও পুঁতির সাবেকি গয়না, বড় ঝুমকো আর রুপার বালা — সব মিলিয়ে এক আভিজাত্যময় পূর্ণতা পায়।

প্রাণের স্পন্দনে দলীয় নৃত্য
বৈসাবি মানেই গান আর নাচের অবিরাম ছন্দ। প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিজস্ব দলীয় নৃত্য এই উৎসবের প্রাণ। 

চাকমা তরুণ-তরুণীরা পরিবেশন করেন 'বিজু নৃত্য' — হাতের মুদ্রা ও পায়ের ছন্দে জীবনের জয়গান। ত্রিপুরাদের 'গড়াইয়া নৃত্য' বর্ণাঢ্য; ২২টি মুদ্রার সমন্বয়ে বৃত্তাকারে ঘুরে ঢোলের তালে বীরত্ব ও কৃষি সংস্কৃতির আবহ সৃষ্টি হয়। মারমা তরুণীরা রঙিন পাখা বা ছাতা হাতে সুশৃঙ্খল দলীয় নৃত্য করেন। ম্রোসহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের 'বাঁশ নৃত্য' সাহসিকতা ও দক্ষতার পরিচয় দেয়। 

এই নাচ শুধু আনন্দ নয়, পাহাড়ের জীবনদর্শন — প্রকৃতি, শ্রম ও সম্প্রীতির প্রতীক।

পাজন: বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের প্রতীক 
বৈসাবির আলোচনা অপূর্ণ থাকবে পাজন ছাড়া। পাহাড়ের গভীর বন থেকে সংগ্রহ করা ২৫-৩০ রকমের ভেষজ লতা-পাতা ও সবজির সমন্বয়ে তৈরি এই ব্যঞ্জন পাহাড়ী জীবনদর্শনের প্রতিফলন। হাজারো উপাদানের মিশ্রণ যেমন এক পাত্রে সুস্বাদু হয়ে ওঠে, তেমনি ভিন্ন ভাষা-সংস্কৃতির পাহাড়ী জনগোষ্ঠী মিলেমিশে এক সুন্দর সমাজ গড়ে তোলে। পাজন সেই বার্তাই দেয় — বৈচিত্র্যই আমাদের শক্তি। এটি কেবল খাবার নয়, পাহাড়ের ঐতিহ্যের স্বাদ।

সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা ও জীবনদর্শন
পাহাড়ের মানুষ প্রকৃতিনির্ভর। তাঁদের গানে, নাচে ও জীবনযাত্রায় অরণ্য ও ঝরনার শব্দ বাজে। বৈসাবির সময় যখন নিভৃত পল্লীতে বাঁশি ও মাদলের সুর ওঠে, মনে হয় পাহাড় নিজেই কথা বলছে। আধুনিকতার চাপ সত্ত্বেও তাঁরা শিকড় আগলে রেখেছেন। 

বাঙালির পহেলা বৈশাখ ও পাহাড়ের বৈসাবি একই সময়ে পালিত হওয়ায় পাহাড় ও সমতলের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময় ঘটে। এটি আমাদের জাতীয় সংহতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

উপসংহার
পরিশেষে, বৈসাবি কেবল বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ের উদযাপন নয়। এটি পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা। এ উৎসব শেখায় — পুরোনোকে বিদায় দিয়ে নতুনকে আলিঙ্গন করতে হয়। পাহাড়ের রঙিন পোশাক, বুনোফুলের ঘ্রাণ, মাদলের তাল ও দলীয় নৃত্য শুধু বিনোদন নয়, ঐক্যবদ্ধ শক্তির প্রতীক। 

জলকেলির পবিত্র জল আর পাজনের সুগন্ধে মুখরিত পাহাড়ের প্রতিটি কোণ যেন সারা বছর শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের সুবাতাস ছড়িয়ে দেয়। সম্প্রীতির এই আঙিনায় একে অপরের আনন্দ ভাগ করে নেওয়াই বৈসাবির প্রকৃত সার্থকতা।

মুফিদুল আলম
শিক্ষক
রামু,কক্সবাজার।

মন্তব্য করুন

ব্লগ