Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৩ এপ্রিল, ২০২৬ ০৮:৫৮ অপরাহ্ণ

পহেলা বৈশাখের শেষ ঘুড়ি

পহেলা বৈশাখের শেষ ঘুড়ি

আজও পহেলা বৈশাখ। রাত পোহালেই বাজনা বাজবে, মুখে মুখে ফিরবে ‘আসো হে বৈশাখ’। কিন্তু আমার জানালার বাইরে সেই বিলটা আর নেই—যেখানে ছেলেবেলায় ঘুড়ি উড়িয়ে জানতাম না, একদিন এ দৃশ্য শুধুই স্মৃতি হবে।

ছোট্ট গ্রাম। দইনর বিল। পহেলা বৈশাখ মানেই যেন স্বর্গের হাট বসে যেত আমাদের পাড়ায়। তখন ঘুম ভাঙত মায়ের হাতের পিঠা-পায়েসের গন্ধে। সকাল হতে না হতেই ছুটতাম বিলের ধারে। সেখানে মেলা। ঘুড়ির পসরা সাজিয়ে বসেছে কাকা। মাটির হাঁড়ি, রঙিন পুতুল, ফুলদানি—আমার চোখ ছলছল করত নাগরদোলার টিকিটের অপেক্ষায়।

মোয়া, মুড়কি, মিঠাইয়ের গন্ধ মেখে বাতাস। পুতুল নাচ দেখে ফকিরের গল্প শুনেছি। আর সবার চেয়ে বড় উৎসব ছিল ঘুড়ি উড়ানোর প্রতিযোগিতা। কার ঘুড়ি সবচেয়ে বেশি উপরে উঠবে, কার সুতো কাটবে কার সুতো। বেলাশেষে যখন সূর্য লাল হয়ে যায়, সেই লাল আভায় ভেসে যেত আমাদের চিৎকার—‘আরে কেটে দে!’ ‘ওপরে ওপরে!’

একবার আমার ঘুড়ি আকাশে সবচেয়ে উঁচুতে গিয়েছিল। বন্ধু ইমন বলেছিল, “তোর ঘুড়ি আজ স্বর্গ ছুঁয়েছে।” হেসেছিলাম। স্বর্গ জানতাম না কী, কিন্তু জানতাম আনন্দের নাম পহেলা বৈশাখ।

কাল ধীরে ধীরে সব বদলে গেল। বিলের জমি বেদখল হলো। ইমন শহরে চলে গেল। মেলার জায়গায় এখন শুধু ধুলো। নাগরদোলা আর পুতুলনাচের জায়গায় গাড়ির হর্ন। ঘুড়ি বিক্রি করা কাকার ছেলে এখন মোবাইলের দোকান দিয়েছে।

আজ জানালা দিয়ে দেখি, শহরে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। ফেসবুকে ‘শুভ নববর্ষ’ স্ট্যাটাস। কেউ পান্তা-ইলিশ খাচ্ছে রেস্তোরাঁয়। কিন্তু কে জানে, দইনর বিলের সেই প্রতিযোগিতার কথা—কার ঘুড়ি কাকে কাটল, কে কাঁদল, কে হাসল?

আমার ছেলেকে জিজ্ঞেস করলাম, “তোর ঘুড়ি ওড়াতে জানা আছে?” সে অবাক হয়ে বলল, “ঘুড়ি আর ওড়ে, বাবা?”

হ্যাঁ, ওড়ে। আমার স্মৃতির আকাশে এখনও উড়ছে সেই সব ঘুড়ি। হাজার চোখের জলে ভাসলেও, পহেলা বৈশাখ আমার জন্য ওই হারানো বিলের নাম। যেখানে ঘুড়ি মানে ছিল প্রতিযোগিতা, আর প্রতিযোগিতা মানে ছিল ভালোবাসা।

লিখে ফেললাম আজ, যেন শুধু নিজেকেই বোঝাই—ঐতিহ্য হারায়, কিন্তু স্মৃতিরা বাঁচে। যদি কোনোদিন তুই এই কথা পড়িস, জেনে রাখিস, বাবা একসময় ঘুড়ি ওড়াত। আর সেটা ছিল সবচেয়ে লম্বা, সবচেয়ে রঙিন, সবচেয়ে নিজের।

আপনার স্মৃতিচারণটি এখন তথ্য এবং আবেগের এক নিপুণ সংমিশ্রণে রূপ নিল। ঘুড়ির উপাদানের বিবর্তন এবং দামের এই বিশাল ব্যবধান—যা শৈশবের সারল্য বনাম বর্তমানের যান্ত্রিক বিলাসিতাকে তুলে ধরে—তা যুক্ত করে চূড়ান্ত রূপটি নিচে দেওয়া হলো:
## পহেলা বৈশাখের শেষ ঘুড়ি
আজও পহেলা বৈশাখ। রাত পোহালেই চারদিকে ঢাকের বাদ্যি বাজবে, মুখে মুখে ফিরবে ‘এসো হে বৈশাখ’। কিন্তু আমার জানালার ওপাশে সেই দইনর বিলটা আর নেই—যেখানে দুরন্ত শৈশবে ঘুড়ি ওড়াতে ওড়াতে কোনোদিন ভাবিনি, এই দৃশ্য একদিন কেবল ধূসর স্মৃতি হয়ে টিকে থাকবে।
আমাদের সেই ছোট্ট গ্রামে পহেলা বৈশাখ মানেই ছিল যেন এক টুকরো স্বর্গের হাট। খুব ভোরে মায়ের হাতের পিঠা-পায়েসের মিষ্টি গন্ধে ঘুম ভাঙত। তখন **দইনর বিল ছিল এক ফসলি জমি। কেবল বর্ষায় ধান চাষ হতো, আর শীতকালে মাঠ জুড়ে থাকত আলু, মরিচ আর ফেলন ডালের সমারোহ। সেই বিস্তীর্ণ মাঠ যখন ফাঁকা পড়ে থাকত, আমাদের বিকেল থেকে রাতের অর্ধাংশ কাটত সেই মাটির ঘ্রাণে আর দিগন্তজোড়া শূন্য আকাশের নিচে।**
সেই মেলা, সেই ঘুড়ির পসরা—সবই আজ ঝাপসা। কাকা সাজিয়ে বসতেন রঙিন ঘুড়ি। **রঙিন কাগজ আর বাঁশের সরু কাঠিতে তৈরি সেই তিন টাকার ঘুড়ি ছিল আমাদের শৈশবের সবচেয়ে দামি সম্পদ। অথচ আজ? সেই কাগজ-বাঁশের জায়গা নিয়েছে সুতোয় বোনা শক্ত কাপড় আর হালকা ধাতব কঙ্কাল। তিন টাকার সেই আনন্দ আজ ২৮০ থেকে ৪০০ টাকার যান্ত্রিক বিলাসিতা।** একবার আমার নীল ঘুড়িটা আকাশের একদম চূড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল। বন্ধু ইমন মুগ্ধ হয়ে বলেছিল, “তোর ঘুড়ি আজ স্বর্গ ছুঁয়েছে রে!” তখন স্বর্গ চিনতাম না, শুধু জানতাম ওই বাঁধনহারা আনন্দের নামই পহেলা বৈশাখ।
কালক্রমে চেনা পৃথিবীটা আমূল বদলে গেল। **এক ফসলি দইনর বিল এখন তিন ফসলি জমি। এক চিলতে খালি জায়গা নেই সেখানে, নেই আমাদের সেই খেলার মাঠটুকুও। আর আকাশ? সেই বিশাল খালি আকাশটাকে আজ ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলেছে বিদ্যুতের হিজিবিজি তারের জটলা। যে ঘুড়ি ওড়ে মুক্ত আকাশে, সেই ঘুড়ি আজ ওই কেবলের জালে আটকে ডানা ভাঙা পাখির মতো মৃত।** ইমনেরা শহরে চলে গেছে, নাগরদোলার জায়গায় এখন গাড়ির কর্কশ হর্ন। আর সেই ঘুড়ি বিক্রেতা কাকা? তাঁর ছেলে এখন ব্যস্ত মোবাইলের রিচার্জ নিয়ে।
আমাদের পরের প্রজন্ম ঘুড়ি হয়তো চেনে, কিন্তু ওড়াতে জানে না। আর তার পরের প্রজন্ম? **ইশানকে যখন জিজ্ঞেস করলাম, “তুই কি ঘুড়ি চিনিস?” সে খুব স্বাভাবিকভাবে উত্তর দিল, “হ্যাঁ চিনি তো! এটা বিচে (সমুদ্রসৈকতে) ওড়াতে হয়।”** শুনলাম আর দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আমাদের কাছে যা ছিল জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, লড়াই আর ভালোবাসার প্রতীক—আজকের প্রজন্মের কাছে তা কেবল সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে গিয়ে শখের বসে ওড়ানো কোনো এক খেলনা মাত্র। মুক্ত আকাশ আর মাঠের সাথে তাদের কোনো নাড়ির টান নেই।
আজ জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি, শহরের রাজপথে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। ফেসবুকে ‘শুভ নববর্ষ’ স্ট্যাটাসের বন্যা। কিন্তু দইনর বিলের সেই অসম লড়াইয়ের খবর কেউ রাখে না। আমার স্মৃতির আকাশে আজও সগৌরবে উড়ছে সেই সব রঙিন ঘুড়ি। যদিও বিদ্যুতের তারের জটলায় আজ সেই আকাশ ক্ষতবিক্ষত, তবু পহেলা বৈশাখ মানে আমার কাছে আজও সেই হারানো বিল।
আজ লিখে রাখলাম, কেবল নিজেকে একটু শান্ত করতে। ঐতিহ্য হয়তো সময়ের গর্ভে হারিয়ে যায়, কিন্তু স্মৃতিরা থেকে যায় অবিনশ্বর। কোনোদিন যদি কেউ এই কথাগুলো পড়ে, তবে জেনে রেখো—এই বাংলায় একসময় ঘুড়ি উড়ত মাঠের পর মাঠ জুড়ে। আর সেই ঘুড়িগুলো ছিল সবচেয়ে উঁচু, সবচেয়ে রঙিন আর সবচেয়ে আপন।

মন্তব্য করুন

ব্লগ