সহকারী শিক্ষক
১২ এপ্রিল, ২০২৬ ০৬:৪৭ অপরাহ্ণ
পাহাড়ি ঝরনার ধারায় বৈসাবির রঙ: এক অনন্য সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন
পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী জনপদে যখন বসন্তের বিদায় আর নতুনের আগমনের সুর বাজে, তখন পাহাড়ের ঢালে ঢালে শুরু হয় এক বর্ণিল উৎসবের মহড়া। চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাসহ পাহাড়ের প্রতিটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর হৃদস্পন্দনে তখন অনুরণিত হয় ‘বৈসাবি’। এটি কেবল একটি উৎসবের নাম নয়, বরং পাহাড়ের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এক সুসংগত রূপ। ত্রিপুরাদের ‘বৈসু’, মারমাদের ‘সাংগ্রাই’ আর চাকমাদের ‘বিজু’—এই তিন প্রধান উৎসবের আদ্যক্ষর নিয়েই তৈরি হয়েছে ‘বৈসাবি’র নাম। উৎসবের প্রথম ভোরে যখন পাহাড়ী নর-নারীরা বন থেকে ফুল সংগ্রহ করে নদীর স্রোতে ভাসিয়ে দেয়, তখন চারপাশ এক পবিত্র স্নিগ্ধতায় ভরে ওঠে। এই ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে তারা পুরনো বছরের সব গ্লানি মুছে ফেলে গঙ্গা দেবীর আশীর্বাদ প্রার্থনা করে।
উৎসবের প্রতিটি দিন পাহাড়ী গ্রামগুলোতে বয়ে যায় আনন্দের জোয়ার। ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে নতুন পোশাকে সেজে অতিথিদের আপ্যায়ন করার দৃশ্যটি অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। বিশেষ করে মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী জলকেলি বা ওয়াটার ফেস্টিভ্যাল এই উৎসবকে এক ভিন্ন মাত্রা দান করে। স্বচ্ছ জলের ঝাপটায় তারা একে অপরকে ধুয়ে দেয়, যা মূলত অতীতের কালিমা মুছে নতুন বছরকে নির্মলভাবে বরণ করার এক রূপক প্রকাশ। ঘরে ঘরে তৈরি হওয়া হরেক রকমের সবজির মিশ্রণে রান্না করা ‘পাজন’ এই উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আর ভালোবাসার স্বাদ নিয়ে আসে সবার পাতে।
বৈসাবি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বৈচিত্র্যের মাঝেই লুকিয়ে আছে প্রকৃত সৌন্দর্য। পাহাড়ী নাচের ছন্দ, ঐতিহ্যবাহী ঘিলা খেলা আর তরুণ-তরুণীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আমাদের জাতীয় সংস্কৃতিকে করে তোলে আরও সমৃদ্ধ ও বর্ণাঢ্য। এটি কেবল আনন্দ উদযাপনের সুযোগ নয়, বরং নতুন প্রজন্মের কাছে নিজের শিকড় ও ঐতিহ্যকে পৌঁছে দেওয়ার এক শক্তিশালী মাধ্যম। পাহাড়ের এই আনন্দধারা যেন সমতল আর পাহাড়ের মানুষের মাঝে গড়ে দেয় এক অবিচ্ছেদ্য মৈত্রীর বন্ধন।
৪
৪ মন্তব্য