Loading..

ব্লগ

রিসেট

১০ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:২৭ অপরাহ্ণ

শেষ বিকেলের মেঘ আর কষ্ট

শেষ বিকেলের মেঘ!


এসএসসি পরীক্ষার ফল হাতে পেয়েছিল মেঘলা।চোখভরা স্বপ্ন, বুকভরা আশা। কিন্তু ভাগ্য যেন ওর জন্য অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। এক বিকেলের ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা সবকিছু বদলে দিল।

হাসিখুশি, ছুটে চলা মেয়েটা হঠাৎই হয়ে গেল নিস্তব্ধ… অচল… অসহায়।

হাসির জায়গায় এলো নীরবতা, আর চোখে জমে উঠলো না বলা কান্না।

রাতের পর রাত মেঘলা কাঁদতো—

“আমি কি আর কোনোদিন স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারবো?”

এই প্রশ্নটাই যেন তার বুকের ভেতর প্রতিধ্বনি হয়ে বাজতো।

তবুও হার মানেনি সে।

লাঠিতে ভর দিয়ে, হাজার কষ্ট গোপন করে কলেজে ভর্তি হলো।

প্রতিটি পা ফেলা যেন যুদ্ধ, প্রতিটি দিন যেন পরীক্ষা।

সেই কলেজেই পরিচয় শাওনের সাথে।

প্রথম দিন থেকেই শাওন লক্ষ্য করেছিল মেঘলার নিঃশব্দ যন্ত্রণা।

কিছু না বলেও সে বুঝে ফেলেছিল,এই মেয়েটার ভেতরে কতটা কষ্ট লুকিয়ে আছে।

ধীরে ধীরে কথা শুরু হলো, তারপর বন্ধুত্ব।

কিন্তু এই বন্ধুত্বটা ছিল অন্যরকম…

যেদিন মেঘলার পা ব্যথায় কাঁপতো,

শাওন নিঃশব্দে তার পাশে দাঁড়াতো।

“চল, আমি আছি।”

যেদিন সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হতো,

শাওন তার ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিতো,

আর ধীরে ধীরে পাশে হেঁটে উঠতো।

যেন ওর কষ্টটা নিজের মধ্যে টেনে নিচ্ছে।

কখনো ক্লাস শেষে বেঞ্চে বসে মেঘলার চোখ ভিজে যেতো।

নিজেকে বোঝা মনে হতো।

তখন শাওন বলতো,

“তুমি বোঝা না… তুমি সাহস।”

এই কথাগুলোই মেঘলার ভাঙা মনকে জোড়া দিতো।

অন্যদিকে, শাওনের জীবনও সহজ ছিল না।

অভাব ছিল তার নিত্যসঙ্গী।

কিন্তু সেটা কখনো মুখে আনতো না।

মেঘলা বুঝতে পারতো,

আর নিজের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও চেষ্টা করতো শাওনের পাশে দাঁড়াতে।

নিজের টিফিন বাঁচিয়ে, ছোট ছোট উপায়ে,

সে শাওনের কষ্ট ভাগ করে নিতো।

দুজনের চোখে অনেক না বলা কথা ছিল,

অনেক অশ্রু, অনেক মায়া,

কেউ কাউকে ভালোবাসি বলেনি,

তবুও ভালোবাসাটা নিঃশব্দে জন্ম নিয়েছিল।

একদিন বিকেলে, কলেজের সেই চেনা পথটায় বসে ছিল তারা।

আকাশটা ছিল মেঘলা,ঠিক মেঘলার মনের মতোই।

হঠাৎ শাওন চুপচাপ বললো,

“মেঘলা… আমি হয়তো আর বেশিদিন এখানে থাকবো না”

মেঘলার বুকটা কেঁপে উঠলো।

“কেন?”গলায় কাঁপন।

শাওন চোখ নামিয়ে বললো,

“বাড়ির অবস্থা খুব খারাপ, আমাকে ঢাকায় যেতে হবে। কাজ করতে হবে, সংসার চালাতে হবে।”

মেঘলার চোখে জল এসে গেল,

তবুও সে হাসার চেষ্টা করলো,

“তুমি অনেক বড় হবে একদিন,

কথাগুলো বললেও, তার ভেতরটা ভেঙে যাচ্ছিল।

সেদিন তারা দুজনেই অনেক কথা বলতে চেয়েছিল,

কিন্তু কিছুই বলা হলো না।

বিদায়ের সময়,

শাওন শুধু বলেছিল,

“নিজের খেয়াল রাখবে… আর কখনো ভাববে না তুমি একা।”

মেঘলা কিছু বলতে পারেনি…

শুধু চোখের পানি গড়িয়ে পড়েছিল,নিঃশব্দে।

তারপর… শাওন চলে গেল।

দিন যায়, মাস যায়…

কলেজের সেই পথটা এখনও আছে,

গাছগুলো এখনও ছায়া দেয়,

কিন্তু মেঘলার পাশে আর কেউ হাঁটে না।

লাঠিতে ভর দিয়ে যখন সে একা হাঁটে,

মনে হয়—প্রতিটা পদক্ষেপে শাওনের স্মৃতি জড়িয়ে আছে।

ক্লাস শেষে সেই বেঞ্চটায় বসে,

সে আজও চুপচাপ তাকিয়ে থাকে রাস্তার দিকে…

হয়তো একদিন শাওন ফিরে আসবে,

এই আশায়।

কিন্তু… সব অপেক্ষার শেষ হয় না।

একদিন, অনেকদিন পর,

একটা খবর এলো,

ঢাকায় কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় মারা গেছে শাওন!

মেঘলার পৃথিবীটা যেন থেমে গেল।

সে শুধু বারবার বলছিল,

“তুমি তো বলেছিলে আমি একা নই…

তাহলে এখন আমি কার?”

তার চোখের পানি আর থামেনি।

কিন্তু এখন সে জোরে কাঁদে না!

চুপচাপ, নিঃশব্দে কাঁদে।

কলেজের সেই পথটা এখনও আছে,

কিন্তু এখন সেখানে হাঁটে শুধু একা একটা মেয়ে!

আর তার ছায়ার সাথে হাঁটে এক অদৃশ্য মানুষ!

যে আর কোনোদিন ফিরে আসবে না।

মন্তব্য করুন

ব্লগ