Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৭ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:৫০ অপরাহ্ণ

গ্রামীণ ও নগরায়ন পরিকল্পনা

আপনার আগের প্রশ্ন ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও আমাদের করণীয়’-এর পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামীণ ও নগরায়ন পরিকল্পনা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। কারণ সুপরিকল্পিত গ্রাম ও শহর দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমাতে পারে। নিচে দুর্যোগ-সহনশীল গ্রামীণ ও নগর পরিকল্পনার মূল দিকগুলো তুলে ধরা হলো:


গ্রামীণ পরিকল্পনা (Rural Planning)


দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে যা করবেন


· উঁচু স্থানে বসতি স্থাপন—বন্যাপ্রবণ এলাকায় বাড়ির মেঝে রাস্তার চেয়ে অন্তত ৩-৪ ফুট উঁচু করুন। মাচা বা দ্বিতীয় তলা রাখার চেষ্টা করুন।

· নিকাশি ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা—গ্রামের প্রতিটি বাড়ি থেকে পানি দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার জন্য খাল ও নালা পরিষ্কার ও প্রশস্ত রাখুন। পানি জমে থাকলে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

· বাঁধ ও আ retaining wall—পাহাড়ি গ্রামে ভূমিধস রোধে দেয়াল তৈরি করুন। নদীসংলগ্ন এলাকায় বাঁধ মজবুত করুন।

· স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার—বাঁশ, কাঠ, টিনের চেয়ে ইট, সিমেন্ট, রডের মিশ্রণে ঘর করলে ভূমিকম্প ও ঝড় সহ্য করতে পারে। তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতায় ‘বেস্ট প্র্যাকটিস’ হলো: ঝোঁকানো ছাদ (ঘূর্ণিঝড়ের বাতাসের চাপ কমায়) ও শক্ত খুঁটি।

· পানির উৎস সুরক্ষা—নলকূপ বন্যার পানিতে ডুবে গেলে দূষিত হয়। নলকূপের চারপাশে উঁচু বাঁধ বা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করুন।


নগরায়ন পরিকল্পনা (Urban Planning)


দুর্যোগ-সহনশীল শহর গঠনে করণীয়


· জলাশয় ও খাল রক্ষা—ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো শহরে খাল দখল করে পানি জমে বন্যা হয়। ভরাট বন্ধ, খাল পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করুন।

· গ্রিন বিল্ডিং ও রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং—বড় ভবনের ছাদে বাগান ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা রাখলে নিকাশির চাপ কমে এবং খরার সময় পানি মেলে।

· ভূমিকম্প ও অগ্নিনির্বাপণ নকশা—প্রতি ভবনে ফায়ার এক্সিট, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, ভূমিকম্পের সময় টেবিলের নিচে জায়গা রাখা বাধ্যতামূলক করুন। সরু গলি বড় করে প্রশস্ত সড়ক ও ওপেন স্পেস রাখুন।

· পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা—অধিকাংশ পুরনো নগরে নিকাশি অপর্যাপ্ত। পৃথক স্টর্মওয়াটার ড্রেনেজ লাইন ও সিওয়্যারেজ লাইন তৈরি করুন। রাস্তা ঢালু করে পানি নির্দিষ্ট স্টেশন বা খালে ফেলার ব্যবস্থা করুন।

· সতর্কীকরণ ও আশ্রয়কেন্দ্র—শহরের স্কুল, কলেজ, কমিউনিটি সেন্টারকে দুর্যোগের সময় আশ্রয়কেন্দ্র ঘোষণা করুন। প্রতিটি ওয়ার্ডে সাইরেন ও মাইকিং ব্যবস্থা রাখুন।


সমন্বিত পরিকল্পনার নীতি (গ্রামীণ ও নগর উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য)


· ভূমি ব্যবহার জোনিং—বন্যাপ্রবণ ও পাহাড়ি এলাকায় বসতি নির্মাণ নিষিদ্ধ করুন। সেই জমিতে বনায়ন বা পার্ক তৈরি করুন।

· প্রাকৃতিক বাফার রক্ষা—উপকূলীয় গ্রামে ম্যানগ্রোভ বন (সুন্দরবনের মতো) ঘূর্ণিঝড়ের গতি কমায়। শহরে পার্ক, খোলা মাঠ, ওয়েটল্যান্ড বন্যার পানি শোষণ করে।

· স্থানীয় অংশগ্রহণ—গ্রাম ও শহরের বাসিন্দাদের নিয়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন করুন। তাদের অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিন।

· অর্থায়ন ও প্রশিক্ষণ—সরকারি বরাদ্দের পাশাপাশি কমিউনিটি ফান্ড গড়ুন। দুর্যোগ মোকাবিলায় ইট-পাথর-কাঠের কাজের প্রশিক্ষণ দিন।


বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উদাহরণ


· সফল উদাহরণ: কুমিল্লার কিছু গ্রামে ‘ক্লাস্টার ভিলেজ’ (উঁচু জায়গায় গুচ্ছ গ্রাম) বন্যায় ক্ষতি কমিয়েছে। রাজশাহী নগরীতে ‘ওপেন স্পেস’ রক্ষা করে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা হয়।

· ব্যর্থ উদাহরণ: চট্টগ্রামের পাহাড় কেটে ভরাট করা বন্যার কারণ। ঢাকায় খাল ভরাট ও পাম্পিং স্টেশনের অপর্যাপ্ততা অতি বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে।


সংক্ষেপে—পরিকল্পনা মানেই ভবিষ্যতের দুর্যোগের সাথে বেঁচে থাকার কৌশল। গ্রামে প্রাকৃতিক উপকরণের সঙ্গে আধুনিক জ্ঞান মিশিয়ে, শহরে বিজ্ঞানসম্মত নকশা ও আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করলেই আমরা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কমাতে পারি।

মন্তব্য করুন

ব্লগ