সহকারী অধ্যাপক
০৪ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:৫৭ অপরাহ্ণ
মনুষ্যত্ব? - মোঃ মুজিবুর রহমান
মনুষ্যত্ব?
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক,
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
ফোন দিলাম—লাইনটা কেটে গেল হঠাৎ,
ভেসে এল কণ্ঠ—“এই নম্বরটা ঠিক না মোটে।”
কুলীনের নয় নাকি, তাই কথা হবে না!
মানুষ কি আজও মানুষকে চিনে না?
দাঁড়িয়ে আছি চুপচাপ, ভিড়ের মাঝখানে,
কেউ বলল—“সিট নাই, সরে দাঁড়ান সামনে।”
চোখে চোখ পড়ে না, মনেও লাগে না,
এ কেমন সমাজ, হৃদয় জাগে না?
ধনী-গরীব ভেদে গড়া দেয়াল এত উঁচু,
কেউ থাকে আকাশে, কেউ পড়ে নিচু।
পদে পদে বাধা, সম্মানের ভাগ,
কেউ পায় বেশি, কেউ শুধু দাগ।
তবুও মনে প্রশ্ন—শেষ কোথায় এ বিভাজন?
মানুষে মানুষে কবে হবে মিলন?
কবে ভাঙবে এই কৃত্রিম দেয়াল,
কবে জাগবে হৃদয়, হবে মানবিক কাল?
আমি তাই বসে আছি একটুখানি আশায়,
মানুষ আবার মানুষ হবে ভালোবাসায়।
হাত বাড়াবে সবাই সবার তরে,
মানুষ বাঁচবে মানুষেরই ঘরে।
ফোনে ফোনে ব্যস্ত সবাই, কিন্তু মনটা দূরে,
কথা হয় ঠিকই, হৃদয় থাকে সীমানার সুরে।
নাম দেখে বিচার, পরিচয়ে মান,
মানুষের চেয়ে বড় হয়ে গেছে পরিচয়ের জ্ঞান।
বাসে উঠি, ভিড় জমে চারপাশ ভরা,
কেউ বলে—“সরে যান”, কেউ করে ধাক্কা ধরা।
একটু জায়গা নেই, নেই মমতার ছোঁয়া,
মানুষের ভিড়ে আজ মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর বোধ হয়।
ধনী বলে দূরে থাকে, গরীব থাকে নিচে,
সম্মান যেন বন্দী কাগজের কিছু পিছে।
কেউ বড় পদে, কেউ ছোট কাজে,
তবুও সবাই তো মানুষ—এই সত্য কেন লাজে?
এভাবে কি চলবে? এভাবেই কি জীবন?
ভালোবাসা হারিয়ে যাবে, বাড়বে শুধু বিভাজন?
না, আমি মানি না—এ পথ ভুল,
মানুষের মাঝে থাকা উচিত সমতার ফুল।
একদিন আসবেই, বদলাবে এই সময়,
মানুষ বুঝবে—মানুষই সবচেয়ে বড় পরিচয়।
দূরত্ব ভেঙে যাবে, মুছে যাবে দেয়াল,
মানুষ হবে মানুষের—এই হোক চূড়ান্ত কাল।
***
ফোনটা কানে তুলে ডেকেছিলাম কারো নাম,
লাইনটা কেঁপে উঠেই থেমে গেল অবিরাম—
ওপাশ থেকে ভেসে এল শীতল এক উচ্চারণ,
“এই নম্বর কুলীনের নয়”—নির্দয় ঘোষণা যেন শাসন।
আমি থেমে গেলাম—নীরবতার দেয়ালে ঠেকে,
ভাবলাম, মানুষ কি আজও মানুষকে দেখে দেখে
তার হৃদয় নয়, দেখে তার পরিচয়ের খোলস,
নাম, পদ, বংশ—এই কি তবে আসল রূপের রোলস?
রাস্তার ভিড়ে দাঁড়িয়ে আছি, ক্লান্ত দুপুরে,
গাড়ির ধাক্কা, মানুষের ঢেউ, শব্দ ভেসে সুরে—
হঠাৎ কেউ চিৎকারে বলে—“দাঁড়িয়ে কেন? সরে যান!”
কথার ভেতর নেই মমতা, শুধু তাড়া আর অপমান।
সিটগুলো ভরা—কিন্তু মনগুলো ফাঁকা,
একটু জায়গা নেই, নেই কারো কাছে ডাকা।
মানুষের পাশে মানুষ থেকেও একা হয়ে যাই,
এই ভিড়ের মাঝেই নিঃসঙ্গতার শহর গড়ি তাই।
ধনী দাঁড়ায় উঁচু প্রাসাদে, আলোয় ভরা ঘরে,
গরীব থাকে মাটির কাছাকাছি, অন্ধকারের ঘোরে।
একজনের হাসি ঝলমল করে সোনার আভায়,
আরেকজনের চোখে জল শুকিয়ে যায় অভাবে।
পদে পদে বিভাজন, সম্মানের আলাদা মান,
কেউ পায় মাথার মুকুট, কেউ পায় শুধু অপমান।
যেন জন্মের সাথেই ভাগ হয়ে যায় মর্যাদা,
কেউ হয় রাজা, কেউ হয় চিরকাল নির্জনা সাধা।
তবুও কোথাও কি হারিয়ে যায় না সেই প্রথম আলো?
যেখানে মানুষ ছিল শুধু মানুষ—সহজ, স্বচ্ছ, ভালো?
যেখানে নামের আগে ছিল না কোনো প্রাচীর,
ছিল শুধু হৃদয়ের ডাকে জেগে ওঠা সমীর।
কোথায় সেই দিন—যখন হাত ধরত হাত,
অপরিচিত মুখেও জ্বলত আপন আলোর প্রভাত?
কোথায় সেই ভাষা—যেখানে সম্মান ছিল সমান,
কোথায় সেই পৃথিবী—যেখানে মানুষই ছিল প্রাণ?
আজ আমরা দূরে সরে গেছি নিজেদের মাঝেই,
নিজেদের গড়া দেয়ালে বন্দী হয়ে রয়েছি আজও তাই।
ভেদাভেদের ইট দিয়ে গড়া এই নগর,
যেখানে হৃদয় হারিয়ে যায়, থাকে শুধু অহংকারের ঘর।
কিন্তু তবুও, এই অন্ধকারের ভেতরেই জ্বলে এক আলো,
মনের গভীর থেকে উঠে আসে প্রশ্ন—কতদিন এ চলবে ভালো?
কতদিন মানুষ মানুষকে করবে এভাবে ছোট,
কতদিন মর্যাদা হবে কেবল জন্মের জোট?
একদিন তো ভাঙবেই এই অহংকারের প্রাচীর,
একদিন তো জাগবেই হৃদয়ের সত্য নীর।
একদিন মানুষ বুঝবে—সব পরিচয়ের শেষে,
মানুষই বড়—এই সত্যই দাঁড়াবে অবশেষে।
সেদিন কেউ বলবে না—“তুমি কুলীনের নও”,
সেদিন কেউ ঠেলে দেবে না—“সরে যাও, জায়গা দাও।”
সেদিন সিট হবে শুধু বসার জন্য নয়,
হৃদয়ও খুলে যাবে—সবার জন্য সমানময়।
ধনী-গরীব মিলবে এক কাতারে দাঁড়িয়ে,
পদ-পদবি হারাবে অহংকারের ভারে।
মানুষের পরিচয় হবে তার ভালোবাসা,
তার চোখের মায়া, তার হৃদয়ের ভাষা।
আমি সেই দিনের অপেক্ষায় আছি চুপচাপ,
যেখানে মানুষ হবে না আর বিভেদের প্রতিচ্ছাপ।
যেখানে প্রতিটি মুখে ফুটবে সমতার গান,
যেখানে মানুষ বাঁচবে মানুষের জন্য—এই হবে পরিচয় মহান।
ততদিন আমি লিখে যাব এই স্বপ্নের কথা,
ততদিন বয়ে যাব হৃদয়ের নীরব ব্যথা।
কারণ বিশ্বাস করি—অন্ধকার যতই ঘন হোক,
মানুষের আলো একদিন ঠিকই ফুটে উঠবে আলোকলোক।
***
ফোন দিলাম কাঁপা হাতে, লাইন কাঁপে নীরবতায়,
ওপাশ থেকে শীতল বাণী—“এই নম্বর যায় না তায়।”
কুলীনের নয় পরিচয়, তাই নাকি সে অযোগ্য,
মানুষ হয়ে মানুষ আজ কতভাবে হয় পরাজয়।
ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছি, ক্লান্ত শহর দুপুরে,
কেউ বলে দেয়—“সরে দাঁড়ান”, ধাক্কা লাগে সুরে সুরে।
সিটগুলো সব ভরা তবু শূন্য যত হৃদয়,
মানুষেরই ভিড়ের মাঝে মানুষ থাকে নিরালয়।
ধনীর ঘরে ঝলমলে আলো, সোনার সাজে ভরা,
গরীব থাকে ধুলোর মাঝে, স্বপ্নগুলো ছেঁড়া-ছড়া।
একজনের হাসি বাজে প্রাসাদের উঁচু দেয়াল,
অন্যজনের চোখের জলে ডুবে থাকে নীরব কাল।
পদে পদে বাঁধা পড়ে সম্মানেরও সীমারেখা,
কেউ যে বড় জন্ম থেকেই, কেউ বা ছোট লেখা।
এই বিভেদের শিকড় গেঁথে মাটির গভীর তলে,
মানুষ ভুলে মানুষ হওয়া, থাকে শুধু ছলে বলে।
কোথায় গেল সেই সকাল, সহজ সরল দিনগুলো,
যেখানে ছিল না ভেদাভেদ, ছিল না বিভাজনগুলো?
হাত ধরেছিল মানুষ মানুষ, ছিল না কোনো ভয়,
চোখে চোখে ফুটত শুধু ভালোবাসার পরিচয়।
এখন দেখি দেয়াল শুধু—নাম, পরিচয়, পদে,
মানুষ যেন হারিয়ে গেছে নিজের গড়া গদে।
কণ্ঠগুলো আজ কঠিন হয়ে, শব্দগুলো ধারাল,
ভালোবাসা হারিয়ে গেছে, বেঁচে আছে জড়কাল।
তবুও দেখি হৃদয়েরই গোপন এক আকুতি,
এই অন্ধকার ভেদ করেই উঠবে আলোর যাত্রাপথী।
একদিন সব ভেঙে যাবে অহংকারের বাঁধ,
মানুষ আবার খুঁজে নেবে মানুষেরই সাধ।
সেদিন কেউ বলবে না আর—“তুমি নিচু, দূরে যাও”,
সেদিন কেউ ঠেলে দেবে না—“এই জায়গাটা ছাড়াও।”
সেদিন সিট হবে শুধু বসার একটি স্থান,
হৃদয় খুলে বসবে সবাই, হবে সমান সম্মান।
ধনী-গরীব একসাথে হাত রাখবে হাতে,
পদ-পদবি হারিয়ে যাবে ভালোবাসার সাথে।
মানুষ তখন চিনবে মানুষ হৃদয়েরই আলোয়,
বিভেদের সব অন্ধকার মিলিয়ে যাবে ঢলায়।
আমি বসে আছি আজও সেই দিনেরই আশায়,
যেখানে কেউ ছোট হবে না পরিচয়ের ভাষায়।
যেখানে মানুষ বাঁচবে শুধু মানুষেরই তরে,
সমতারই ফুল ফুটবে প্রতিটি হৃদয় ঘরে।
যতদিন না আসবে সেই ন্যায়ভরা সকাল,
ততদিন লিখে যাব আমি এই বিভেদের জ্বাল।
কারণ জানি—অন্ধকার যতই গভীর হয়,
মানুষেরই আলো শেষে জয়ী হয়ে রয়।
***
ফোনের ওপাশে থেমে যায় শব্দ,
কথা হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যায় সংযোগ—
যেন সমাজের অদৃশ্য এক প্রাচীর
কণ্ঠরোধ করে দেয় পরিচয়ের আগে।
“এই নম্বর গ্রহণযোগ্য নয়”—
কথাটা কানে লাগে না, লাগে অন্তরে,
যেন কারো অস্তিত্বকে মাপা হচ্ছে
কোনো অদেখা বংশের পাল্লায়।
আমি থেমে যাই—
শুধু একজন মানুষ হয়ে দাঁড়িয়ে,
কিন্তু এই পরিচয় আজ সবচেয়ে ক্ষুদ্র,
সবচেয়ে অগ্রহণযোগ্য এক নাম।
রাস্তার ভিড়ে ঠাসা দুপুর—
মানুষের ঢেউ, শব্দের ঝড়,
কেউ কারো দিকে তাকায় না,
তবু সবাই ঠেলে দেয় একে অপরকে।
“সরে দাঁড়ান”—
শব্দটা আদেশ নয়, অভ্যাস,
এ যেন এক চর্চিত সংস্কৃতি
যেখানে মমতা অপ্রয়োজনীয়।
একটি সিট—
শুধু বসার জায়গা নয়,
এ যেন মর্যাদার মাপকাঠি,
যেখানে স্থান পায় ক্ষমতা,
আর বাদ পড়ে মানবতা।
ধনীরা আকাশ ছোঁয়া দেয়ালে
নিজেদের আলাদা করে রেখেছে,
তাদের জানালায় সূর্যের আলো
অন্যরকম উজ্জ্বল হয়ে পড়ে।
আর মাটির কাছাকাছি যারা,
তাদের আকাশটা ছোট হয়ে গেছে—
তাদের সূর্যও যেন
ধোঁয়ায় ঢাকা এক নিঃশব্দ দহন।
রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে—
আইন, শাসন, কাঠামোর ভার নিয়ে,
কিন্তু কোথাও কি লেখা আছে
মানুষের সমান মর্যাদার নিশ্চয়তা?
নিয়মগুলো কখনো নিরপেক্ষ নয়,
তারা ঝুঁকে পড়ে শক্তির দিকে,
ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে উঠে যায় কিছু নাম,
আর বাকিরা পড়ে থাকে নিচে।
শিক্ষা দেয় জ্ঞান,
কিন্তু শেখায় না সহানুভূতি,
অর্থ দেয় স্বাচ্ছন্দ্য,
কিন্তু কে শেখায় মানবতা?
পরিচয়ের রাজনীতি
মানুষকে টুকরো টুকরো করে—
কেউ ধর্মে বড়, কেউ বংশে,
কেউ পদে, কেউ সম্পদে।
তবু প্রশ্ন জাগে—
এই ভাঙনের শেষ কোথায়?
মানুষের এই বিভক্ত মানচিত্র
কবে আবার এক হবে?
ইতিহাস সাক্ষী—
প্রতিটি দেয়াল একদিন ভেঙেছে,
প্রতিটি অহংকার ধুলায় মিশেছে,
মানুষই শেষ কথা বলেছে।
কিন্তু বর্তমান—
সে যেন ভুলে গেছে অতীতের শিক্ষা,
নিজের তৈরি শৃঙ্খলে বন্দী হয়ে
নিজেকেই হারিয়ে ফেলছে।
একটি শিশুর জন্ম হয়—
সে জানে না ধনী-গরীব,
সে জানে না উচ্চ-নিম্ন,
সে শুধু জানে স্পর্শ, উষ্ণতা, ভালোবাসা।
তাহলে আমরা শেখাই কাকে?
কোথা থেকে আসে এই বিভেদ?
কোন বইয়ে লেখা আছে—
মানুষ মানুষকে ছোট করবে?
সমাজ গড়ে ওঠে আচরণে,
রাষ্ট্র টিকে থাকে ন্যায়ে,
কিন্তু যখন ন্যায় হারিয়ে যায়,
সমাজও হয়ে ওঠে ভাঙা আয়না।
আমরা দেখি—
মানুষ মানুষকে চিনতে ভুলে গেছে,
নাম, পদ, পরিচয়ের আড়ালে
হারিয়ে গেছে আসল মুখ।
তবুও আশা মরে না—
কারণ মানুষের ভেতরে এখনো
একটি আলো জ্বলছে,
যা নিভে যায়নি পুরোপুরি।
সেই আলো একদিন
ছড়িয়ে পড়বে সর্বত্র—
মানুষ বুঝবে,
সবচেয়ে বড় পরিচয়—মানুষ হওয়া।
সেদিন ফোন কাটা পড়বে না,
কণ্ঠ থেমে যাবে না মাঝপথে,
কারণ পরিচয় হবে হৃদয়ের,
কোনো কৃত্রিম দেয়ালের নয়।
সেদিন কেউ বলবে না—“সরে দাঁড়ান”,
বরং বলবে—“এসে বসুন”,
একটি সিট ভাগ করে নেওয়া
হয়ে উঠবে সৌভাগ্যের চিহ্ন।
রাষ্ট্র তখন হবে মানুষের,
আইন হবে ন্যায়ের প্রতিচ্ছবি,
শিক্ষা শেখাবে শুধু জ্ঞান নয়—
মানবিকতার গভীর অর্থ।
ধনী-গরীব শব্দগুলো
হারিয়ে যাবে অভিধান থেকে,
থাকবে শুধু একটি শব্দ—
মানুষ।
আমি সেই দিনের অপেক্ষায়—
এই ভাঙা পৃথিবীর ভেতর দাঁড়িয়ে,
একটি পূর্ণ পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি,
যেখানে দূরত্ব নয়, থাকবে বন্ধন।
যতদিন না আসে সেই দিন,
ততদিন এই কাব্য বয়ে চলবে—
প্রতিটি শব্দ হবে প্রতিবাদ,
প্রতিটি ছন্দ হবে আহ্বান।
মানুষের কাছে মানুষের ফিরে আসার,
মানবতার পুনর্জাগরণের,
একটি নতুন ভোরের—
যেখানে সূর্য উঠবে সবার জন্য সমান।
***
ফোনের রেখা থেমে যায়, কণ্ঠ থামে মাঝপথে,
“এই নম্বর গ্রহণযোগ্য নয়”—বিদ্ধ করে অন্তরেতে।
পরিচয়ের শিকল বেঁধে মাপে আজ মানবমান,
মানুষ হয়েও মানুষ যেন হারায় নিজের সম্মান।
দাঁড়িয়ে আছি জনসমুদ্রে, ঢেউয়ের মতো ভিড়,
কেউ ডাকে না আপন করে, তবু ধাক্কা নিরবধি।
“সরে দাঁড়ান”—শব্দটি যেন নিয়মেরই ভাষা,
এ সমাজে মমতা যেন হারানো এক আশা।
একটি সিট—একটি স্থান—ক্ষমতারই চিহ্ন,
যেখানে বসার অধিকারে জড়ায় অহংকারের বীজ।
যে বসে সে বড় হয়ে যায় অদৃশ্য কোনো মানে,
যে দাঁড়ায় সে ছোট হয়ে যায় নীরব অপমানে।
ধনীর প্রাসাদ আকাশ ছোঁয়, আলোর ঝলকানি,
গরীব থাকে মাটির কাছে, স্বপ্ন ভাঙে জানি।
একজনের পথ মসৃণ হয় সোনালী প্রলেপে,
অন্যজনের পথ রক্তাক্ত জীবনেরই ক্ষেপে।
রাষ্ট্র নামে এক কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে ঠিক,
আইনের ভার, শাসনের বল—সবই যেন লিখিত।
তবু কেন সেই নিয়মগুলো সমান থাকে না?
কেন শক্তির পাল্লা ঝুঁকে দুর্বলকে ঠেকায় না?
শিক্ষালয় দেয় অক্ষরজ্ঞান, সংখ্যা আর হিসাব,
কিন্তু শেখায় না কেন হৃদয়ের সঠিক জবাব?
সহানুভূতির পাঠ কোথায়? মানবতার মানে?
জীবনের বই খুলে দেখি—সেটা লেখা কানে কানে।
পরিচয়ের রাজনীতি ভাগ করে মানুষ,
ধর্মে, বর্ণে, ভাষায়, গড়ে অসংখ্য বিভাজন রূপ।
কেউ উচ্চে, কেউ নিচে—এ কেমন মাপকাঠি?
মানুষেরই হাতে গড়া, তবু মানুষই কাঁটি।
বিশ্বমঞ্চে একই দৃশ্য—ভিন্ন শুধু রং,
শক্তিশালী দেশগুলো গড়ে আধিপত্যের সংগ।
দুর্বল জাতি নতশিরে সহ্য করে ক্ষয়,
ন্যায়ের ভাষণ উচ্চারিত, তবু ন্যায় থাকে ক্ষয়।
অর্থনীতির চাকা ঘোরে বৈষম্যের তালে,
কেউ পায় সোনার ফসল, কেউ পড়ে অনাহারে।
এক পাশে ভোজনের উৎসব, অপচয়ের হাসি,
অন্য পাশে ক্ষুধার কান্না—নিঃশব্দে ভাসি।
মানুষ কোথায় হারিয়ে গেল এই ব্যবস্থার ভিড়ে?
কেন হৃদয় শুকিয়ে যায় হিসাবেরই নীড়ে?
কেন সম্পর্ক হয় মাপা লাভ-ক্ষতির দরে?
কেন ভালোবাসা হারিয়ে যায় কৃত্রিমতার ঘরে?
একটি শিশু জন্ম নেয়—শূন্য হাতে, শূন্য মনে,
তার চোখে নেই বিভেদ কোনো, নেই কোনো বর্ণ গুণে।
সে চেনে না উচ্চ-নিম্ন, জানে শুধু ছোঁয়া,
তার হাসিতে লুকিয়ে থাকে মানবতার বীজ বোনা।
তাহলে আমরা শিখাই কী? কোথা থেকে বিভেদ?
কোন ইতিহাস গড়ে তোলে এই কঠিন অবরোধ?
সমাজ কেন শেখায় তাকে আলাদা হতে ধীরে?
কেন ভালোবাসা হারিয়ে যায় নিয়মেরই নীড়ে?
ইতিহাস বলে—প্রাচীর ভাঙে, পতন ঘটে শাসন,
অহংকারের মুকুট খুলে পড়ে ধুলোরে শেষে গমন।
তবুও মানুষ ভুলে যায় সেই শিক্ষা প্রতিক্ষণ,
আবার গড়ে নতুন দেয়াল, আবার বিভাজন।
তবুও আশা বেঁচে থাকে মানুষের অন্তরে,
একটি আলো জ্বলে নীরব অন্ধকারের তরে।
সেই আলোই একদিন ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বময়,
মানুষ বুঝবে—মানুষই শেষ পরিচয়।
সেদিন ফোন কাটা পড়বে না পরিচয়ের দোষে,
কণ্ঠ থামবে না আর কোনো অযৌক্তিক রোষে।
সেদিন কেউ বলবে না—“তুমি অযোগ্য, দূরে যাও”,
বরং বলবে—“এসো পাশে, একসাথে পথ চলো।”
সেদিন সিট হবে না আর ক্ষমতার প্রতীক,
হৃদয়ের স্থান হবে বড়, সমতারই দীক্ষা ঠিক।
একটু জায়গা ভাগ করে নেওয়া হবে গৌরব,
মানুষ হবে মানুষেরই সবচেয়ে বড় স্বরূপ।
রাষ্ট্র তখন দাঁড়াবে ন্যায়ের ভিত্তিপ্রস্তরে,
আইন হবে সমান সবার জীবনেরই অন্তরে।
শিক্ষা শেখাবে মানবতা, ভালোবাসার পাঠ,
সমাজ হবে সমতার গান, হবে নতুন প্রভাত।
বিশ্ব তখন বদলে যাবে মানুষের স্পর্শে,
ভেদাভেদের সব রেখা মুছে যাবে হর্ষে।
ধনী-গরীব শব্দ দুটি হারাবে অর্থ,
থাকবে শুধু মানুষ—একটাই সত্য।
আমি সেই দিনের অপেক্ষায়, দৃঢ় বিশ্বাস বুকে,
এই অন্ধকার কেটে যাবে আলোরই সুখে।
যতদিন না আসে সে ভোর, ততদিন এ গান,
মানুষের জন্য মানুষ হবার অটুট আহ্বান।
প্রতিটি শব্দ হোক জাগরণ, প্রতিটি ছন্দ ডাক,
ভাঙুক সব বিভেদের বাঁধ, মুছে যাক সব ফাঁক।
মানুষ ফিরে পাক নিজেকে, হৃদয়েরই টানে,
মানবতার জয় হোক—বিশ্বের প্রতিটি প্রাণে।
***
ফোনের রেখা কাঁপে নীরব, শব্দ থামে হঠাৎ,
“এই নম্বর গ্রহণযোগ্য নয়”—বিদ্ধ করে অন্তঃস্থ।
পরিচয়ের অদৃশ্য জালে বেঁধে ফেলে মানুষ,
নাম-গোত্রে মাপে সবাই, হারায় মানব রূপ।
দাঁড়িয়ে আছি জনসমুদ্রে, ঢেউ ওঠে নিরবধি,
কেউ ডাকে না কাছে টেনে, তবু ঠেলে নিরবধি।
“সরে দাঁড়ান”—কঠিন ভাষা, অভ্যাসে রূপ নেয়,
সহানুভূতির কোমল ধারা শুকিয়ে কোথায় যায়?
একটি সিট—ক্ষমতারই নীরব প্রতীক যেন,
যে পায় সে মাথা তোলে, যে পায় না সে ক্ষীণ।
অধিকারও ভাগ হয়ে যায় অদৃশ্য মানদণ্ডে,
মানুষ হয়ে মানুষ থাকে নিজেকেই গণ্ডে।
ধনীর ঘরে আলো নাচে কাচের প্রাসাদ জুড়ে,
গরীব থাকে ধুলোর মাঝে, স্বপ্ন ভাঙে সুরে।
একজনের জীবন সোনায় মোড়া সুরভিতে,
অন্যজনের জীবন ডুবে অভাবেরই গহ্বরে।
রাষ্ট্র দাঁড়ায় শাসন নিয়ে, আইনেরই ভারে,
তবু ন্যায়ের পাল্লা কেন ঝুঁকে শক্তিধরে?
কাঠামোর এই দৃঢ়তা কি সত্যিই নিরপেক্ষ?
নাকি ভেতর লুকিয়ে থাকে স্বার্থেরই রক্ষক?
শিক্ষা দেয় জ্ঞান, কিন্তু হৃদয় গড়ে না,
অর্থ দেয় সুখ, কিন্তু মানুষ করে না।
সভ্যতার এই অগ্রগতি যদি মানবহীন হয়,
তবে সেই উন্নয়ন কি সত্যিই উন্নয়ন রয়?
মানুষ জন্মায় নিরপেক্ষ সত্তা নিয়ে—
তার ভেতরে থাকে না কোনো ভেদাভেদ,
না থাকে শ্রেণি, না থাকে অহংকার।
সমাজই তাকে শেখায় বিভাজন—
নাম, বংশ, ধর্ম, অর্থ, ক্ষমতা—
এই সবই পরবর্তীকালের আরোপ।
অর্থাৎ—
বিভেদ মানুষের স্বভাব নয়, শেখানো অভ্যাস।
কোথায় সেই দিন, সহজ সরল সকাল,
যেখানে মানুষ মানুষে মিলত অবিচল?
চোখে চোখে ফুটত শুধু সম্মানেরই ভাষা,
নেই কোনো বিভাজন, নেই দূরত্বের আশা।
এখন দেখি বিশ্বজুড়ে একই চিত্রখানি,
শক্তিশালী শাসন গড়ে আধিপত্যের বাণী।
দুর্বলরা নত হয়ে সহ্য করে ক্ষয়,
ন্যায়ের বুলি শোনা যায়, ন্যায় কিন্তু ক্ষয়।
অর্থনীতির চাকা ঘোরে বৈষম্যের সুরে,
কেউ পায় অতিরিক্ত, কেউ পড়ে অনাহারে।
এক পাশে উৎসব, অপচয়ের ঢল,
অন্য পাশে ক্ষুধা—নিঃশব্দ আকুল কল।
রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সমতা ও ন্যায়—
কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্র অনেক সময়
ক্ষমতাবানদের রক্ষাকবচ হয়ে ওঠে।
অর্থনীতি যখন মানবিকতার নিয়ন্ত্রণ হারায়,
তখন সৃষ্টি হয় বৈষম্য—
যা শুধু সম্পদের নয়, সম্মানেরও।
অর্থাৎ—
অন্যায় কাঠামো মানুষকে অন্যায় হতে শেখায়।
একটি শিশু আসে পৃথিবীতে, শূন্য হাতে,
তার চোখে নেই বিভেদ কোনো, নেই কোনো প্রাতে।
সে জানে শুধু ভালোবাসা, উষ্ণতার ভাষা,
তার হাসিতে লুকিয়ে থাকে মানবতার আশা।
তাহলে আমরা কেন শেখাই বিভেদের জ্ঞান?
কেন গড়ে তুলি কৃত্রিম সব দেয়াল ও মান?
কেন মানুষ মানুষকে করে ছোট প্রতিক্ষণ?
কেন ভেঙে যায় সহজ সেই মানবিক বন্ধন?
ইতিহাস বলে—সব দেয়াল একদিন ভাঙে,
অহংকারের শিখর শেষে ধুলোর মাঝে ঢাকে।
তবুও মানুষ বারবার ভুলে যায় সেই কথা,
আবার গড়ে নতুন বিভেদ, নতুন ব্যথা।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—
ক্ষমতা ও অহংকার চিরস্থায়ী নয়।
প্রতিটি সভ্যতা, প্রতিটি শাসন,
যদি মানবতাকে ভুলে যায়—
তবে তার পতন অনিবার্য।
অর্থাৎ—
মানবতা ছাড়া কোনো স্থায়িত্ব নেই।
তবুও অন্তরে জ্বলে এক ক্ষীণ আলোর রেখা,
যা নিভে যায় না কখনো, যতই অন্ধকার দেখা।
সেই আলোই জাগাবে একদিন নতুন ভোর,
মানুষ বুঝবে—মানুষই আসল পরিচয় ঘোর।
সেদিন ফোন কাটা পড়বে না পরিচয়ের দোষে,
কণ্ঠ থামবে না আর কোনো অযৌক্তিক রোষে।
সেদিন কেউ বলবে না—“তুমি নিচু, দূরে যাও”,
বরং বলবে—“এসো পাশে, একসাথে পথ চলো।”
সেদিন সিট হবে না আর ক্ষমতার মান,
হৃদয়ের স্থান হবে সবচেয়ে বড় স্থান।
একটু জায়গা ভাগ করে নেওয়া হবে গৌরব,
মানুষ হবে মানুষেরই চূড়ান্ত পরিচয় সব।
মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে—**
সে নিজেকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করে তার উপর।
যদি পরিচয় হয় বিভাজনের ভিত্তিতে—
তবে সংঘাত চলবে।
যদি পরিচয় হয় মানবতার ভিত্তিতে—
তবে সৃষ্টি হবে ঐক্য।
অর্থাৎ—
মানুষের মুক্তি মানুষের মধ্যেই নিহিত।
রাষ্ট্র বদলাবে, সমাজ গড়বে নতুন করে,
আইন দাঁড়াবে ন্যায়ের পথে, সত্যেরই তরে।
শিক্ষা শেখাবে শুধু জ্ঞান নয়—মানবতার আলো,
বিশ্ব হবে এক পরিবার—সহজ, নির্মল, ভালো।
ধনী-গরীব শব্দ দুটি হারাবে অর্থ,
থাকবে শুধু মানুষ—এই এক সত্য।
দূরত্ব ভেঙে গড়ে উঠবে সম্পর্কের সেতু,
মানুষ ফিরে পাবে নিজেকে, মুছে যাবে ক্ষত।
আমি সেই দিনের অপেক্ষায়, অটল বিশ্বাসে,
এই অন্ধকার কেটে যাবে আলোরই উচ্ছ্বাসে।
যতদিন না আসে সে ভোর, ততদিন এ গান,
মানুষের তরে মানুষ হবার অনন্ত আহ্বান।
প্রতিটি শব্দ জাগুক শক্তি, প্রতিটি ছন্দ ডাক,
ভেঙে যাক বিভেদের প্রাচীর, মুছে যাক সব ফাঁক।
মানুষ ফিরে পাক নিজেকে হৃদয়ের টানে,
মানবতার জয় হোক—বিশ্বের প্রতিটি প্রাণে।
৪
৪ মন্তব্য