প্রভাষক
০৩ এপ্রিল, ২০২৬ ১০:০৪ অপরাহ্ণ
এক ঘণ্টায় ৬০ মিনিট হয় কেন
এক ঘণ্টা কেন ৬০ মিনিটে হয়, তার ইতিহাস বেশ প্রাচীন এবং চমকপ্রদ। এর পেছনে গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং প্রাচীন সভ্যতার জীবনযাত্রার গভীর প্রভাব রয়েছে। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. সুমেরীয় ও ব্যাবিলনীয়দের অবদান
আজ থেকে প্রায় ৫০০০ বছর আগে মেসোপটেমীয় সভ্যতায় (বর্তমান ইরাক অঞ্চল) সংখ্যা গণনার জন্য ৬০-ভিত্তিক (Sexagesimal) পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো। আমরা যেমন এখন ১০-ভিত্তিক বা দশমিক পদ্ধতি (১০, ১০০, ১০০০) ব্যবহার করি, তারা সব বড় হিসাব ৬০-এর এককে করত।
২. কেন তারা ৬০ সংখ্যাটি বেছে নিয়েছিল?
৬০ সংখ্যাটিকে গণিতের ভাষায় 'হাইলি কম্পোজিট নম্বর' (Highly Composite Number) বলা হয়। এর বিশেষত্ব হলো:
৬০-কে ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ১০, ১২, ১৫, ২০ এবং ৩০—এই সবকটি সংখ্যা দিয়ে ভাগ করা যায়।
সেই সময়ে দশমিক বা ভগ্নাংশের হিসাব অনেক কঠিন ছিল। ৬০-কে ভিত্তি ধরায় সময়কে খুব সহজে অর্ধেক (৩০ মিনিট), এক-তৃতীয়াংশ (২০ মিনিট) বা এক-চতুর্থাংশ (১৫ মিনিট) হিসেবে নিখুঁতভাবে ভাগ করা যেত, যাতে কোনো দশমিক আসত না।
৩. হাতের আঙুলে গণনা
প্রাচীনকালে মানুষ আঙুলের কড় গুনে হিসাব করত। এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে বাকি চার আঙুলের তিনটি করে কড় গুনলে মোট ১২ পাওয়া যায়। এভাবে অন্য হাতের ৫টি আঙুল ব্যবহার করে ৫ বার ১২ গুণলে (১২ × ৫) মোট ৬০ হয়। এই সহজ হিসাবের কারণেই ৬০ সংখ্যাটি তাদের কাছে জনপ্রিয় ছিল।
৪. বৃত্ত এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান
প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছিলেন যে, সূর্য দিগন্তের এক পাশ থেকে অন্য পাশে যেতে যে পথ অতিক্রম করে, তা একটি বৃত্তের মতো। তারা পৃথিবীকে সূর্যের চারদিকে ঘুরতে প্রায় ৩৬০ দিন লাগে বলে ধরে নিয়েছিলেন (যা আসলে ৩৬৫ দিন)। এই ৩৬০ ডিগ্রিকে তারা ৬টি ভাগে ভাগ করেন, যার প্রতিটি ভাগ ছিল ৬০ ডিগ্রির। সময়ের হিসাবকে এই জ্যামিতিক বৃত্তের সাথে মিলিয়ে তারা ১ ঘণ্টাকে ৬০ ভাগে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেন।
৫. আধুনিক সময়ে টিকে থাকা
পরবর্তীতে গ্রীক জ্যোতির্বিদ যেমন হিপ্পার্কাস এবং টলেমি এই পদ্ধতিকে আরও উন্নত করেন। তারা পৃথিবীকে অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশে ভাগ করার সময়ও এই ৬০-ভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহার করেন। মধ্যযুগে যখন যান্ত্রিক ঘড়ি আবিষ্কার হয়, তখন এই প্রাচীন ব্যাবিলনীয় পদ্ধতিটিকেই আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা হয় কারণ এটি ততদিনে পৃথিবীজুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল।
সহজ কথায়, আপনার হাতের আঙুলের গঠন এবং প্রাচীন মানুষের গণিতের সুবিধাই আজকের ঘড়ির কাঁটার হিসাব নির্ধারণ করে দিয়েছে।
৪
৪ মন্তব্য