সহকারী শিক্ষক
০২ এপ্রিল, ২০২৬ ০১:৪৬ অপরাহ্ণ
পরিমিতিবোধ ও বিলাসিতা বর্জনের সার্থকতা
আধুনিক যুগের চাকচিক্য আর ভোগের প্রতিযোগিতায় আমরা অনেক সময় ভুলেই যাই যে জীবনের প্রকৃত সুখ আসলে কিসে। চারপাশের চোখ ধাঁধানানো বিজ্ঞাপন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কৃত্রিম প্রদর্শনীর ভিড়ে আমাদের চাহিদার তালিকা দিন দিন দীর্ঘতর হচ্ছে। এই সীমাহীন চাহিদাই বিলাসিতার জন্ম দেয়, যা মানুষকে কেবল আর্থিক সংকটে ফেলে না, বরং মানসিকভাবেও এক ধরনের অস্থিরতার সৃষ্টি করে। বিলাসিতা বর্জন করার অর্থ এই নয় যে নিজেকে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা কিংবা কৃচ্ছ্রসাধন করে মানবেতর জীবনযাপন করা। বরং এর মূল উদ্দেশ্য হলো প্রয়োজনের অতিরিক্ত খরচ থেকে নিজেকে বিরত রাখা এবং সম্পদের অপচয় রোধ করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও অর্থবহ জীবন গড়ে তোলা।
মানুষ যখন বিলাসিতার মোহে পড়ে যায়, তখন সে নিজের সামর্থ্যের সীমানা অতিক্রম করতে কুণ্ঠাবোধ করে না। দামী পোশাক, বিলাসবহুল গাড়ি কিংবা প্রয়োজনের অতিরিক্ত আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের নেশায় আমরা অনেক সময় আমাদের মানসিক প্রশান্তি বিসর্জন দেই। অথচ ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, জগতের শ্রেষ্ঠ মনীষীরা অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন। তারা ভোগ-বিলাসের চেয়ে জ্ঞান অর্জন এবং আর্তমানবতার সেবাকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। বিলাসিতা বর্জনের শিক্ষা আমাদের কেবল সঞ্চয়ী হতে শেখায় না, বরং এটি আমাদের চারপাশের অবহেলিত মানুষের কষ্টের কথা ভাবতে সাহায্য করে। আমাদের বাড়তি খরচের টাকা দিয়ে হয়তো কারো অন্নসংস্থান হতে পারে কিংবা কোনো সুবিধাবঞ্চিত শিশুর শিক্ষার পথ সুগম হতে পারে—এই বোধটুকুই মানুষের প্রকৃত আভিজাত্য।
অনাড়ম্বর জীবনযাপন মানুষের চারিত্রিক দৃঢ়তা বৃদ্ধি করে। যারা অল্পে তুষ্ট থাকতে শেখে, জীবনের বড় কোনো বিপর্যয়েও তারা সহজে ভেঙে পড়ে না। পক্ষান্তরে, বিলাসিতায় অভ্যস্ত মানুষ সামান্য অভাব বা প্রতিকূলতায় দিশেহারা হয়ে পড়ে। জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে সরলতার মাঝে। ঘর সাজানোর চেয়ে মন সাজানোতে বেশি গুরুত্ব দিলে মানুষের জীবন যেমন শান্তিময় হয়, তেমনি সামাজিকভাবেও এক ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। বিলাসিতা বর্জন করে যদি আমরা পরিবেশের কথা ভাবি, তবে অপচয় কমানোর মাধ্যমে আমরা পৃথিবীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষাতেও ভূমিকা রাখতে পারি। তাই আসুন, আমরা দেখানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত না হয়ে নিজের প্রয়োজনকে চিনতে শিখি এবং একটি নিরহংকারী ও মার্জিত জীবন গঠনের প্রতিজ্ঞা করি। কারণ দিনশেষে আমাদের অর্জিত সম্পদ নয়, বরং আমাদের ব্যক্তিত্ব আর মানুষের প্রতি আমাদের মমত্ববোধই আমাদের শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় বহন করবে।
৪
৪ মন্তব্য