Loading..

ব্লগ

রিসেট

০২ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০২ অপরাহ্ণ

নিউটনের জীবন ও বিজ্ঞান

সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে অনেক বৈজ্ঞানিক ধারণা। পদার্থবিজ্ঞানে সবচেয়ে বেশি বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে যাঁর হাত দিয়ে, তাঁর নাম আইজ্যাক নিউটন। আলবার্ট আইনস্টাইন নিউটন সম্পর্কে বলেছিলেন, প্রকৃতি তাঁর হাতে স্বেচ্ছায় ধরা দিয়েছে। প্রকৃতির রহস্য নিউটনের মতো করে আর কেউ এতটা উন্মোচন করতে পারেননি। নিউটনের হাত দিয়েই আমরা পেয়েছি আলো এবং বর্ণের সম্পর্ক, মহাকর্ষ বলের গাণিতিক সূত্র ও গতির সূত্র। জ্যোতির্বিজ্ঞানে নিউটনের গতিবিদ্যা প্রয়োগ করার পর বিগত কয়েক হাজার বছরের চেয়ে বেশি অগ্রগতি হয়েছে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই। গণিতের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শাখা ক্যালকুলাসের উৎপত্তি ও বিকাশের অন্যতম নায়ক ছিলেন আইজ্যাক নিউটন। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সর্বকালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনাগুলোর একটি নিউটনের প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা, যেখান থেকে আমরা পেয়েছি চিরায়ত বলবিজ্ঞান (যাকে আমরা নিউটনীয় বলবিজ্ঞান বলি), গ্রহ-নক্ষত্রগুলোর মধ্যে মহাকর্ষ বলের সূত্র এবং মহাবিশ্বের গতির গাণিতিক অবকাঠামো।

আইজ্যাক নিউটনের জন্ম ১৬৪২ সালের ক্রিসমাসের দিন, অর্থাৎ ২৫ ডিসেম্বর ইংল্যান্ডের লিংকনশায়ার থেকে সাত মাইল দক্ষিণে কোলসটারওয়ার্থ গ্রামের ‘উলসথর্প’ নামের এক বিশাল ফার্ম হাউসে। সেই সময় ইউরোপের সব জায়গায় গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার চালু হয়ে গেলেও ইংল্যান্ডে ১৭০০ সাল পর্যন্ত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার চালু হয়নি। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের তারিখ থেকে ১০ দিন পিছিয়ে ছিল ইংল্যান্ডের জুলিয়ান ক্যালেন্ডার। সে হিসাবে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নিউটনের জন্মতারিখ হয় ৪ জানুয়ারি ১৬৪৩। তারিখের হিসাবে এই গন্ডগোল অবশ্য নিউটনের জীবনে কোনো প্রভাব ফেলেনি।কেমব্রিজ থেকে প্রায় ৬০ মাইল উত্তর-পশ্চিমের গ্রামটি তুলনামূলকভাবে নতুন। নিউটনের পূর্বপুরুষেরা এখানে এসেছিলেন ১৫০০ সালের দিকে। ‘নিউটন’ তখন কোনো নির্দিষ্ট পরিবারের পদবি ছিল না। ইংল্যান্ডের বিভিন্ন জায়গায় নতুন শহরের গোড়াপত্তন হচ্ছিল সেই সময়। নতুন শহরে এসে অনেকেই তখন ‘নিউটন’ পদবি গ্রহণ করেছিলেন। নিউটাউন থেকে নিউটন শব্দটির উৎপত্তি।

নিউটনের দাদা রবার্ট নিউটন জন্মেছিলেন আনুমানিক ১৫৭০ সালে। উত্তরাধিকারসূত্রে তিনি কিছু কৃষিজমির মালিক হয়েছিলেন। ১৬০৬ সালে রবার্ট নিউটনের ছেলে আইজ্যাক নিউটনের জন্ম হয়। পরিবারে তখনো লেখাপড়ার কোনো চল ছিল না। পিতা-পুত্র দুজনই নিরক্ষর। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে রবার্ট ক্রমে আরও অনেক জমির মালিক হন এবং ১৬২৩ সালে উলসথর্পের ‘লর্ড অব দ্য ম্যানর’ হয়ে গেলেন। জমিজমাসহ বিশাল বাড়ির মালিক এবং লর্ড হয়ে নিউটন পরিবারের অর্থনৈতিক সম্মান অনেক বেড়ে গেল। এবার রবার্ট নিউটন ঠিক করলেন, শিক্ষিত ভদ্রলোকের পরিবারে ছেলের বিয়ে দিয়ে পরিবারের সামাজিক সম্মান বাড়াবেন। ১৬৩৯ সালে জেমস আয়াসকফের কন্যা হ্যানা আয়াসকফের সঙ্গে আইজ্যাক নিউটনের বাগদান সম্পন্ন হয়।

কিন্তু রবার্ট নিউটনের শরীর ভালো যাচ্ছিল না বলে বিয়ে পিছিয়ে দিতে হয়। ১৬৪১ সালে রবার্ট মারা যান। তার মাস ছয়েক পর ১৬৪২ সালের শুরুর দিকে হ্যানা ও আইজ্যাকের বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের ছয়-সাত মাস পরেই হঠাৎ মৃত্যু হয় আইজ্যাক নিউটনের। হ্যানা তখন সন্তানসম্ভবা। ১৬৪২ সালের ২৫ ডিসেম্বর হ্যানা খুব রোগা এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। এই সন্তান তাঁর বাবাকে কোনো দিন দেখেননি। বাবার নাম অনুসারেই তাঁর নাম রাখা হয় আইজ্যাক নিউটন।সময় হওয়ার আগেই জন্ম নেওয়া রুগ্‌ণ শিশুটিকে অনেক যত্নে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনেন হ্যানা। কিন্তু তিনি খুবই বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন। তিনি জানেন, এত বড় ফার্ম তিনি একা সামলাতে পারবেন না। সব দেখাশোনা করার জন্য শক্ত অভিভাবক দরকার। ১৬৪৫ সালে হ্যানা ৬৩ বছর বয়সী প্রভাবশালী রেভারেন্ড বারনাবাস স্মিথকে বিয়ে করে নর্থ উইথামে চলে যান।

হ্যানা তাঁর তিন বছর বয়সী শিশু আইজ্যাক নিউটনকে রেখে যান তাঁর বাবা–মায়ের কাছে। নানা-নানির কাছে আদরযত্নের অভাব না থাকলেও মাতৃস্নেহের অভাবে এবং সৎবাবার প্রতি আক্রোশে খুবই বদরাগী শিশু হিসেবে বড় হতে থাকেন আইজ্যাক। তাঁর কোনো বন্ধু ছিল না। একা একা বড় হতে থাকেন তিনি।

হ্যানার ভাই উইলিয়াম কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেছিলেন। তাঁদের পরিবার শিক্ষিত। আইজ্যাক নিউটনকে লেখাপড়া শেখানোর ব্যবস্থা করা হলো। কিন্তু তা–ও বেশ দেরিতে। ১২ বছর বয়সে নিউটনকে বাড়ি থেকে সাত মাইল দূরে গ্রান্থাম গ্রামের কিং স্কুলে ভর্তি করানো হয়। ক্লার্ক নামের একজন ফার্মাসিস্টের বাড়িতে তাঁর থাকার ব্যবস্থা করা হলো। অনেকটা যন্ত্রের মতো সেখানে বাস করেন নিউটন। স্কুলেও তাঁর কোনো বন্ধু হয়নি। তিনি কারও সঙ্গেই মেশেন না। লেখাপড়া নিজে নিজেই করেন। হাতের কাজে বেশ দক্ষতা অর্জন করে ফেলেছেন ইতিমধ্যে।এদিকে ১৬৫৬ সালে নিউটনের মায়ের দ্বিতীয় স্বামীর মৃত্যু হয়। দুটি কন্যা ও একটি পুত্রসন্তান নিয়ে নিউটনের বাবার ফার্মেই ফিরে আসেন হ্যানা। দ্বিতীয় স্বামীর বিষয়সম্পত্তির মালিকও হন তিনি। ফার্ম আরও বড় হয়। তাঁর মনে হলো, বড় ছেলে নিউটনকে নিজের কাছে এনে ফার্মের কাজে লাগিয়ে দেবেন। ১৬৫৮ সালে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিউটনকে ফার্মে নিয়ে আসেন তিনি। নিউটন ফার্মের কোনো কাজই ঠিকমতো করতে পারেন না। মায়ের কাছে এলেও মায়ের প্রতি কোনো টান অনুভব করা তো দূরের কথা, বরং আক্রোশে জ্বলতে থাকেন তিনি। মামার পরামর্শে নিউটনকে আবার স্কুলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে থেকে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য তৈরি হতে থাকেন।

১৬৬১ সালে ১৯ বছর বয়সে কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে ভর্তি হন নিউটন। তাঁর সহপাঠীরা সবাই বয়সে তাঁর চেয়ে তিন–চার বছরের ছোট। ট্রিনিটি কলেজের বেতন আর হোস্টেলের ফি মেটানোর জন্য নিউটনকে একটা অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ দেওয়া হয়। তার বদলে তাঁকে সিনিয়র ছাত্রদের ফাইফরমাশ খাটতে হতো। স্কলারশিপ পেলে এ ধরনের কোনো কাজ করতে হয় না। নিউটন চেষ্টা করলেন ফার্স্ট ইয়ারের পরীক্ষায় ভালো করে সেকেন্ড ইয়ারে একটা স্কলারশিপ জোগাড় করার।

কিন্তু তিনি সিলেবাসের পড়াশোনা বাদ দিয়ে নিজের ইচ্ছেমতো পড়াশোনা করছিলেন। সে সময় ইউরোপের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও আর কেপলারের নতুন তত্ত্বগুলো পড়ানো শুরু হয়ে গেলেও কেমব্রিজের পড়াশোনা তখনো অ্যারিস্টটলের পৃথিবীকেন্দ্রিক পদার্থবিজ্ঞানেই সীমাবদ্ধ রয়ে গিয়েছিল। নিউটন নিজে নিজে নতুন তত্ত্বগুলো পড়তে শুরু করেছিলেন। ফলে ফার্স্ট ইয়ারের পরীক্ষায় জ্যামিতিতে ফেল করলেন। তখন কেমব্রিজের শিক্ষকেরা ভাবতেও পারেননি, জ্যামিতিতে ফেল করা এই ছেলেটাই কয়েক বছরের মধ্যে মহাবিশ্বের নতুন জ্যামিতি সৃষ্টি করবেন।
মন্তব্য করুন

ব্লগ