সহকারী শিক্ষক
০২ এপ্রিল, ২০২৬ ০১:০৭ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
একটা সময় ছিল, যখন গাইড মানে ছিল পথপ্রদর্শক। পাহাড়ে ওঠার সময় যার হাত ধরে এগোতে হয়, অন্ধকার রাস্তায় যার কণ্ঠস্বর শুনতে হয়। আর এখন গাইড মানে এক ডজন প্রশ্নের উত্তর, পরীক্ষার আগের রাতের ভরসা, আর হাতে-কলমে শিক্ষার দারুণ এক প্রতীক—যার গায়ের দাম বেশি, কাগজের মান নিম্নমাধ্যমিক, আর বিষয়বস্তু 'হুবহু পরীক্ষায় কমন পড়বে' এমন এক অলৌকিক শক্তিতে বলিয়ান।
আমার আজ আলোচনার বিষয়, সেই গাইড-রাজ্যের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি। বিদ্যালয়-মাঠে এখন নতুন এক সমীকরণ দাঁড়িয়েছে—গাইড কোম্পানি, বিদ্যালয় প্রশাসন, আর একদম তলায় থাকা অসহায় অভিভাবক-শিক্ষার্থীরা। বিষয়টা অতি সিরিয়াস, কিন্তু আমি আজ সেটাকে রম্যর চশমা পরিয়ে দেখাতে চাই। কারণ, বাস্তবটা এতই হাস্যকর যে সেটাকে হাসি ছাড়া সহ্য করার মতো উপায় আর নেই।
## ১. ‘শিক্ষার সৌজন্যে’ নামক এক নতুন বাণিজ্য
আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা একটি পবিত্র স্থান। বিদ্যালয় তার মন্দির, শিক্ষক তার পুরোহিত, আর বই তার ধর্মগ্রন্থ। কিন্তু এখন সেই মন্দিরের সামনে বসেছে গাইডের দোকান, আর পুরোহিত মহাশয় নিজেই মাইকে ঘোষণা করছেন—"শ্রীযুক্ত বসাক অ্যান্ড কোং-এর ‘পরীক্ষা-সহায়িকা’ ব্যতীত কেউ পরীক্ষার হলে যেতে পারবে না। এটা আমাদের বিদ্যালয়ের নিজস্ব সিদ্ধান্ত।"
অভিভাবক সভার দিন সেই দৃশ্য দেখার মতো। প্রধান শিক্ষক মঞ্চে বসে গাম্ভীর্যের সাথে বলছেন, "আমরা চাই মানসম্মত শিক্ষা। তাই নির্দিষ্ট গাইড কিনতে হবে।" আর মঞ্চের পেছনে গাইড কোম্পানির সেলসম্যান বসে হাত গুনে দেখছে, আজ কতটা কমিশন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে। শিক্ষার পবিত্রতা তখন দুই পক্ষের মধ্যে ভাগাভাগি হওয়া এক ‘স্পনসরশিপ’-এ রূপ নেয়।
শিক্ষকেরা যদি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বার্তা পাঠান—"অমুক গাইডের অমুক সংস্করণ ছাড়া কোনো বিকল্প চলবে না"—তাহলে বুঝতে হবে, গাইড কোম্পানি বিদ্যালয়ের চেয়ার-টেবিল থেকে শুরু করে বার্ষিক সংবর্ধনা পর্যন্ত স্পনসর করেছে। একে বলে ‘শিক্ষার সহায়ক উপকরণ’। আর সহায়ক শব্দটির ব্যুৎপত্তি এখন দাঁড়িয়েছে—‘সহ’ মানে টাকা, ‘আয়ক’ মানে লাভ।
## ২. ‘নিম্নমানের’ শব্দটির সচিত্র ব্যাখ্যা
আমাদের এখানে গাইড মানে সাধারণত হলুদচে পৃষ্ঠা, কালিতে ছাপা অক্ষর যেন বর্ষার নদীতে ভেসে যাওয়া নৌকা—কোথাও দাগ, কোথাও মাজা, কোথাও অর্ধেক ছাপা। প্রশ্নের উত্তরে লেখা থাকে এমন সব বাক্য যা পড়ে শিক্ষার্থী আরও বেশি বিভ্রান্ত হয়। তবে একটি জিনিস থাকে ঠিক—সূচিপত্রের শুরুতে ‘পরীক্ষার সর্বশেষ সাজেশন’ অংশটা। সেখানে ১৫০টি প্রশ্নের মধ্যে ১৪৯টি ‘অবশ্যই আসবে’ বলে ঘোষণা দেওয়া থাকে। একটিও না এলে তারা বলে, "স্যার, সেটা তো আগের সংস্করণে ছিল, আপনি নতুনটা কেনেননি।"
অভিভাবক যখন দোকানে গিয়ে দাম শোনেন, চোখ কপালে ওঠে। কিন্তু বাধ্য। কারণ গতকাল বিদ্যালয়ে শিক্ষক বলেছেন, "যার গাইড নেই, সে যেন কাল ক্লাসে না আসে।" শিক্ষকের এই বাণী শুনে অভিভাবকের মনে হয়, যেন গাইড না থাকলে সন্তান পাসের বদলে জেল খাটবে।
## ৩. গাইড-নির্ভর শিক্ষার মহাভারত
এই গাইড কেনার পর শিক্ষার্থীর অবস্থা হয় কী? সে তখন আর বিদ্যালয়ের মূল বই পড়ে না। কারণ শিক্ষক ক্লাসে এসে বলেন, "পৃষ্ঠা ৩৫-এর প্রশ্ন নং ৭-এর উত্তরটা গাইডে আছে, সেটা মুখস্থ করো।" মূল বই তখন ধুলো জমে পড়ে থাকে। গাইড হয়ে ওঠে একমাত্র গ্রন্থ। শিক্ষার্থী মনে করে, মহাভারতের যুদ্ধে অর্জুন যেমন শ্রীকৃষ্ণের গীতার শরণাপন্ন হয়েছিল, তেমনি পরীক্ষায় পাস করতে হলে শুধু এই গাইডই গতি।
শিক্ষকেরাও একটু স্বস্তি পান। কারণ গাইডের প্রশ্নগুলো একেবারে ‘প্যাটার্ন অনুযায়ী’। সেগুলো যদি শিক্ষার্থীরা মুখস্থ করে, তাহলে পরীক্ষার খাতায় সুন্দর ‘কমন’ পড়বে। আর ফলাফল ভালো হলে বিদ্যালয়ের নাম ওঠে, শিক্ষকের নাম ওঠে। কিন্তু সেই ফলাফল কি শিক্ষার্থীর প্রকৃত অর্জন? নাকি ‘প্রকাশনী-বিদ্যালয় জোট’-এর সফল বিপণন কৌশল?
## ৪. শিক্ষার মন্দিরে বাণিজ্যের আরতি
একবার একটি বিদ্যালয়ের বার্ষিক অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। দেখলাম, গেটে গাইড কোম্পানির বড় বড় ব্যানার। বিদ্যালয়ের ভেতরে স্টল সাজানো। ছাত্র-ছাত্রীদের গাইড কেনার জন্য লাইন দিতে দেখা গেল। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে মঞ্চে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সেই গাইড কোম্পানির কর্ণধারকে সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে। আর পুরস্কার পেয়ে তিনি হাসছেন, এই ভেবে যে আরও পাঁচটি বিদ্যালয়ে এভাবে এন্ট্রি দেওয়া গেলে এবারের লাভের হিসেবটা মোটামুটি বসানো যাবে।
আমি অবাক হয়ে এক শিক্ষককে জিজ্ঞেস করলাম, "এত আয়োজন কেন?" তিনি বললেন, "ওরা তো বিদ্যালয়ের উন্নয়নে সাহায্য করে। ভাবেন তো, আমাদের ফ্যান, টিউবলাইট, মাইক সব ওদের দেওয়া।"
আমি বললাম, "স্যার, শিক্ষা তো ব্যবসা নয়।"
উনি হেসে বললেন, "বাবা, তুমি এখনো বুঝো না। আজকাল শিক্ষাও ব্যবসা, আর ব্যবসাও শিক্ষা।"
## ৫. অভিভাবকের করুণ কাহিনী
অভিভাবক সভায় একজন অভিভাবক সাহস করে বললেন, "স্যার, গত বছরও আমরা অমুক গাইড কিনেছিলাম। দাম ছিল বেশি, কাগজ খারাপ, আর তার ওপরে অর্ধেক প্রশ্ন বাইরে থেকে এসেছিল। এবার কেন একই কোম্পানির গাইড কিনব?"
শিক্ষক জবাব দিলেন, "আপনার সন্তান কি পাস করেছে আগের বার?"
অভিভাবক বললেন, "পাস করেছে।"
শিক্ষক বললেন, "তাহলে সমস্যা কোথায়?"
অভিভাবক কিছু বলতে গিয়ে থামলেন। কারণ তিনি বুঝলেন, যুক্তির অস্ত্র নিয়ে যেখানে বাণিজ্যের ঢাল আছে, সেখানে শিক্ষকের সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই।
অভিভাবক পরে বাসায় ফিরে স্ত্রীকে বললেন, "শিক্ষক বলেছেন, এবারের গাইডটা কিনতেই হবে। আগেরবার পাস করেছে দেখে তিনি বুঝেছেন, গাইডটা কাজের ছিল।"
স্ত্রী বললেন, "আগেরবার তো সন্তান পড়াশোনা করে পাস করেছিল, গাইডের দরকার হয়নি।"
অভিভাবক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "এখন সেটা বলার কেউ নেই।"
## ৬. শিক্ষার্থীদের জীবন-শৈলী
শিক্ষার্থীরা এখন গাইড ছাড়া থাকতে পারে না। গাইডের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় তাদের হাতের লেখা। গাইডের শেষ পৃষ্ঠায় ‘উত্তরমালা’ অংশটা কেউ কেটে ফেলে দেয়, কেউ টেপ দিয়ে আটকে রাখে, যাতে ‘কমনের’ সময় না দেখে ফেলে। কিন্তু প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের পরিবর্তে তারা রোবটের মতো উত্তরগুলো মুখস্থ করতে থাকে।
এক ছাত্রী বলল, "গাইড না থাকলে বুঝতামই না যে উত্তর কোথায় পাব।"
আমি বললাম, "মূল বই পড়লে তো পেতে।"
সে অবাক হয়ে বলল, "মূল বই? ওটা তো শিক্ষক ক্লাসে খোলেন না।"
## ৭. শেষ কথা: হাসি আর ক্ষোভের সংমিশ্রণ
এই রম্য প্রবন্ধ পড়ে আপনারা হয়তো হাসছেন। কিন্তু হাসির আড়ালে একটা কঠিন সত্য লুকিয়ে আছে। বিদ্যালয় আর কলেজের প্রশাসন যখন গাইড কোম্পানির সঙ্গে হাত মেলায়, তখন শিক্ষার্থীরা আসলে একধরনের ‘নির্ভরশীলতা’ শেখে—নির্ভরতা গাইডের ওপর, মুখস্থ বিদ্যার ওপর, আর অসাধু ব্যবসায়ীদের ওপর। অথচ শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত স্বাধীনভাবে চিন্তার ক্ষমতা তৈরি করা, প্রশ্ন করার সাহস দেওয়া।
গাইড কোম্পানিগুলো যদি সত্যিই মানসম্মত সহায়ক বই প্রকাশ করত, যদি বিদ্যালয় প্রশাসন কেবল শিক্ষার্থীর স্বার্থ দেখত, তাহলে এত ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের প্রয়োজন হতো না। কিন্তু যেদিন শিক্ষক মাইকে বলবেন, "কোনো গাইড কেনা বাধ্যতামূলক নয়, তোমরা মূল বই পড়ো", সেদিন হয়তো সত্যিকারের শিক্ষা শুরু হবে।
ততদিন আমাদের হাসতে হবে। কিন্তু হাসি দিয়ে অন্তত বুকের বোঝা হালকা করা যায়। আর যাঁরা এই গাইড-ব্যবসার মালিক অথবা বিদ্যালয় প্রশাসনের অংশ, তাঁদের বলব—শিক্ষাকে পণ্য করবেন না। কারণ যে জাতি তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পণ্যের তকমা দেয়, সে জাতির ভবিষ্যৎ হয় অন্ধকার।
আর আমরা অভিভাবকরা, একটু সাহস করি। বলি, “না। এই গাইড নয়। আমার সন্তান পড়বে মূল বই, জানবে মূল কথা, বুঝবে জীবনটাকে। গাইড নয়, গাইডলাইন চাই।”
তবে সেটা বলতে গেলে হয়তো আরেকটা রম্য প্রবন্ধ লিখতে হবে—‘অভিভাবক সভায় কীভাবে শিক্ষক-মাফিয়া মোকাবিলা করবেন’। সেটা অন্য দিন।
ততদিন এই গাইড-বাণিজ্যের হাস্যকর নাটক চলতে থাকুক। আর আমরা দর্শক হয়ে হাসতে হাসতে কান্না চেপে রাখি।
২
২ মন্তব্য