সিনিয়র শিক্ষক
৩১ মার্চ, ২০২৬ ০৭:৩৮ পূর্বাহ্ণ
গভর্নিং বা ম্যানেজিং নয়, নাম হোক ‘স্কুল কল্যাণ কমিটি’
কবি নজরুল তাঁর কবিতায় লিখেছেন, "সবার উপরে মানুষ সত্য, তার উপরে নাই।" সভ্য জগতে তথা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে আদিম যুগের কৃতদাস প্রথার মতো প্রভু থাকতে পারেনা।
বাংলাদেশের সংবিধানে সচিব থেকে সর্বনিম্ন স্তরের জনবল, সবাই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। তবে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে কর্মকর্তা বা অফিসার পদবি দেখা যায়। আবার কর্মকর্তাদের যখন শাস্তি হয় সেটা আবার হয় গণকর্মচারী আইনে। এসব কর্মকর্তা পদবি সাংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক কিনা বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার। থানা/উপজেলা, জেলা বা বিভাগীয় অফিসার পদবি বাতিল করে পরিচালক নামকরণ করা হলে অফিসারের মাঝে অহমিকা বা প্রভুত্বমূলক মানসিকতা কিছুটা হলেও হতে পারে। সফল ও কার্যকর রাষ্ট্র গড়ে তোলার জন্য জনপ্রতিনিধি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সচিব, মহাপরিচালক, শিক্ষক, সর্বনিম্ন স্তরের জনবলসহ সকলের জবাবদিহিতা সমভাবে প্রযোজ্য।অথচ আমাদের দেশে "যত দোষ নন্দ ঘোষ" প্রবাদের মত, নিচের দিকে গড়ায়। সচিব, মহাপরিচালক, উপদেষ্টা, মন্ত্রী সবাই যেন ধোঁয়া তুলসি পাতার মতো পাক পবিত্র, জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে।
শিক্ষকতা মহান ও সর্ব শ্রেষ্ঠ পেশা। এ পেশায় সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় প্রভু থাকা কাম্য নয়। ম্যানেজিং কমিটি শুধু বিদ্যালয়ের কল্যাণমূলক কাজ করবে, খবরদারী বা প্রভুত্বমূলক কাজ থেকে বিরত থাকবে। তবে সরকারি বিধি মোতাবেক শিক্ষক, কর্মচারী সকলের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না হলে প্রতিষ্ঠানের সুনাম, শৃঙ্খলা লঙ্ঘিত হবে।
এ বিষয়ে কার্যক্রম গ্রহণের জন্য কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরছি:
প্রথমত, বিদ্যালয় পরিচালনা বা ম্যানেজিং কমিটির নাম পরিবর্তন করে বিদ্যালয় কল্যাণ কমিটি নামকরণ করা প্রয়োজন। এর ফলে প্রভুত্ব বা পরিচালনা করার মানসিকতা থেকে গভনিং বডি অনেকটা দূরে থাকবে।
দ্বিতীয়ত, আমাদের বর্তমান বাঙালি জাতির মানসিকতায় বাইরের দেখভাল বা পরিদর্শন ছাড়া প্রতিষ্ঠান কীভাবে চলবে বা জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে বিষয়টি বোধগম্য হচ্ছেনা। শিক্ষক, কর্মচারী তথা সার্বিক ব্যবস্থাপনার জন্য থাকবে সব পর্যায়ের স্টেক হোল্ডারের সমন্বয়ে গঠিত বিদ্যালয় কল্যাণ সমিতি।
এ কমিটির আহ্বায়ক হবেন প্রধান শিক্ষক এবং সব শিক্ষক, চতুর্থ শ্রেণির সব কর্মচারী, সব শ্রেণিওয়ারী একজন করে নির্বাচিত অভিভাবক সদস্য ও জমিদাতা সদস্য। এ কমিটির অভ্যন্তরে নিয়মিত কাজ দেখভাল করার জন্য থাকবে প্রধান শিক্ষকের নেতৃত্বে সহযোগী সব স্টেকহোল্ডার একজন প্রতিনিধি সমন্বয়ে ক্ষুদ্র আকারে নির্বাহী কল্যাণ কমিটি। মূল কমিটি বছরে ২/৩টি মিটিংয়ের মাধ্যমে সার্বিক উন্নয়ন বা কাজ পর্যালোচনা করে নির্বাহী কল্যাণ কমিটির কাজ অনুমোদন করবে। সরকারি নিয়ম নীতিমালার মধ্যে কমিটির সর্বাধিক ভোটে সব বিষয়ে অনুমোদন পাবে। যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে যেকোনো সদস্য সরকারি দপ্তরে আপিল করতে পারবেন। এতে তার পেশাগত বিষয় অক্ষুণ্ণ থাকবে। সব সদস্যের প্রস্তাব বিধিসম্মত না হলেও রেজুলেশন খাতায় লিপিবদ্ধ থাকবে। যেহেতু বিদ্যালয়ের সাথে সব শিক্ষক, কর্মচারী সার্বক্ষণিক জড়িত, সেহেতু সকল শিক্ষক কর্মচারী মূল কল্যাণ কমিটির সদস্য, শ্রেণি প্রতি একজন নির্বাচিত অভিভাবক সদস্য থাকবেন।
নির্বাহী কমিটিতে সব শ্রেণির নির্বাচিত অভিভাবক সদস্য থেকে ১ জন অভিভাবক, সব শিক্ষকের থেকে ১ জন নির্বাচিত শিক্ষক, অনুরূপভাবে একজন নির্বাচিত কর্মচারী এবং সব কমিটিতে জমিদাতা থাকবেন। প্রধান শিক্ষক সব কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। শিক্ষাদান ও কর্মচারী পরিচালনা বিষয়টি সরকারি বিধি মোতাবেক প্রধান শিক্ষকের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীর পাঠদানের গাফিলতি, অগ্রগতি বিষয়টি সরকারি বিধি মোতাবেক প্রধান শিক্ষক কঠোর জবাবদিহিতার মাধ্যমে দেখভাল করবেন। এর ব্যত্যয় হলে সরকারি বিধি মোতাবেক প্রধান শিক্ষককে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
শুধু শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন তথা পাঠদানের অগ্রগতি নিশ্চিত করার জন্য পরিদর্শন ব্যবস্থা জোরদারসহ জবাবদিহিতা সর্বস্তরে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে ম্যানেজিং কমিটির অহেতুক প্রভুত্বমূলক কাজ থেকে শিক্ষক তথা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মুক্ত হবে। সর্বস্তরে জবাবদিহিতার পাশাপাশি শিক্ষকের মর্যাদা সমুন্নত হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত না থেকেও জমিদারি প্রথার মতো আদিকাল থেকে চেয়ারম্যানের বংশধর বা রাজনৈতিক ব্যক্তি বিদ্যালয়ে অবস্থান করবে—এ অবস্থার অবসান হওয়া উচিত। সরকারি বিধি মোতাবেক জবাবদিহিতা গড়ে উঠুক।
সংগৃহিত: দৈনিক শিক্ষা
২
২ মন্তব্য