সহকারী শিক্ষক
২৫ মার্চ, ২০২৬ ১০:০১ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
১৯৩২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি। ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির সেনেট হাউসে তখন এক অদ্ভুত থমথমে নিস্তব্ধতা। সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে উঠেছেন বাংলার গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসন। দর্শকদের ভিড়ে বসে থাকা একুশ বছরের এক তরুণীর বুকের ভেতর তখন চলছে বিপ্লবের রুদ্ধশ্বাস দোলাচল। বীণা দাস, যাঁর হাতে সেই মুহূর্তে ডিগ্রির শংসাপত্র থাকার কথা ছিল, তিনি লুকিয়ে নিয়ে এসেছেন একটি ছোট রিভলভার। গভর্নর বক্তৃতা শুরু করতেই বীণা উঠে দাঁড়ালেন এবং রিভলভারের শীতল ট্রিগারে চাপ দিলেন। পাঁচটি গুলি গর্জে উঠল সেনেট হাউসের গম্বুজ কাঁপিয়ে, যার প্রতিটি শব্দ ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত নড়িয়ে দেওয়ার এক অমোঘ হুংকার। গুলির শব্দে ঘরের বাতাস তখন বারুদের গন্ধ আর আর্তনাদে ভারি হয়ে উঠেছে।
বীণার এই সশস্ত্র বিদ্রোহ কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। ১৯১১ সালে কৃষ্ণনগরের এক আদর্শবাদী পরিবারে তাঁর জন্ম, যেখানে পিতা বেণীমাধব দাস ছিলেন স্বয়ং সুভাষচন্দ্র বসুর প্রিয় শিক্ষক। ছোটবেলা থেকেই বীণা এবং তাঁর দিদি কল্যাণী দেখেছেন মা সরলা দেবীকে নিঃস্ব মহিলাদের জন্য ‘পুণ্যশ্রম’ গড়ে তুলতে। সেই পুণ্যশ্রমের অন্ধকার গুদামঘরেই একদিন মজুত হতে শুরু করেছিল বিপ্লবীদের অস্ত্র আর বিস্ফোরক। বীণা যখন ব্রাহ্ম গার্লস স্কুল বা বেথুন কলেজে পড়ছেন, তখন শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’ উপন্যাসটি তাঁর জীবনে ধ্রুবতারা হয়ে দেখা দিয়েছিল। ইংরেজি পরীক্ষায় প্রিয় উপন্যাসের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি ব্রিটিশদের নিষিদ্ধ করা সেই বইয়ের কথাই নির্ভয়ে লিখেছিলেন, যার জন্য নম্বর কম পেলেও বিপ্লবের দীক্ষা সম্পূর্ণ হয়েছিল।
গ্রেফতারের পরদিন যখন তাঁকে আদালতে হাজির করা হলো, বীণার চোখেমুখে ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তি। বিচারে তাঁর নয় বছরের কারাদণ্ড হলো, কিন্তু শাসকরা তাঁর মুখ থেকে সহযোগীদের নাম বের করতে পারল না। আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি দরাজ কণ্ঠে বলেছিলেন, বাংলার গভর্নর এমন এক ব্যবস্থার প্রতিনিধি যা তাঁর দেশবাসীকে দাসত্বের নিগড়ে বেঁধে রেখেছে। এই লড়াই কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং এক অত্যাচারী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যেখানে মৃত্যুও তাঁর কাছে ছিল পরম অর্থবহ। সেই দিনগুলিতে সহ-বিপ্লবীদের সাথে কষ্ট সহ্যের পরীক্ষা নিতেন তিনি বিষাক্ত পিঁপড়ের বাসায় পা রেখে অথবা আগুনের শিখায় নিজের আঙুল সেঁকে।
কারাবাস শেষ করে ফেরার পর তাঁর জীবনে শুরু হলো এক অন্য লড়াই। ১৯৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দেওয়ার অপরাধে তাঁকে পুনরায় তিন বছরের জন্য গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর যতীশ ভৌমিকের সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার পর তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্যও হয়েছিলেন। কিন্তু বীণা ছিলেন সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন, যাঁরা ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে যাননি। নোয়াখালির দাঙ্গার পর মহাত্মা গান্ধীর সাথে ত্রাণকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তিনি। স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতে যখন অনেকেই সুযোগ-সুবিধার জন্য ব্যস্ত, বীণা তখন দৃপ্ত ভঙ্গিতে সরকারি পেনশন প্রত্যাখ্যান করে শিক্ষকতাকেই জীবিকা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।
জীবনের শেষ লগ্নে এই অগ্নিকন্যার ভাগ্য এক চরম বিদ্রুপের মুখোমুখি হয়েছিল। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি কলকাতা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন হৃষিকেশে, একাকী নিভৃত আশ্রমে। দক্ষিণ কলকাতার এক স্কুল থেকে অবসর নেওয়ার দশ বছর পরেও সরকারি দপ্তরে তাঁকে ঘুরতে হতো তাঁর প্রাপ্য পেনশনের জন্য। দপ্তরের সেই হলুদ হয়ে যাওয়া নথিপত্রের সোঁদা গন্ধ আর ফ্যান চলার একঘেয়ে শব্দ বীণাকে মনে করিয়ে দিত এক অন্য পরাধীনতার কথা। আমলাদের কাছে তিনি তখন ছিলেন স্রেফ এক বৃদ্ধা তদ্বিরকারী, যাঁর বি.এ. পাসের শংসাপত্রটি ছিল সেই ১৯৩২-এর ঘটনার পর বাতিল করে দেওয়া এক কাগজ।
বিপ্লবী বীণা দাস তাঁর আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতাশালীদের দোরে দোরে ভিক্ষা করতে যাননি। যে জাতি তাঁকে বীরের সম্মান দিতে ভুলে গিয়েছিল, তাদের কাছে তিনি কোনো অভিযোগও করেননি। ১৯৮৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর, হৃষিকেশের এক কনকনে শীতের রাতে পথের ধারে পড়ে ছিল এক বৃদ্ধার খণ্ডিত নিথর দেহ। পুলিশ প্রায় এক মাস তদন্ত করার পর যখন পরিচয় নিশ্চিত করল, তখন গোটা ভারত শিউরে উঠেছিল এই অগ্নিকন্যার করুণ পরিণতি দেখে। যে হাতের ট্রিগারে একদিন গর্জে উঠেছিল বিদ্রোহ, সেই হাত দুটি তখন পড়ে ছিল রাস্তার ধুলোয়, সম্পূর্ণ অনাদরে।
আজকের ভারতবর্ষ হয়তো বীণা দাসের সেই নিঃশব্দ আত্মত্যাগের কথা বইয়ের পাতায় খুঁজে পায় না। কিন্তু ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে তাঁর সেই শান্ত বীরত্ব আর অদম্য জেদ আজও মিশে আছে গঙ্গার তীরে ঋষিকেশের বাতাসে। তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে সত্যিকারের দেশপ্রেমিকরা কেবল যুদ্ধজয়েই সীমাবদ্ধ থাকেন না, তাঁরা জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে আত্মসম্মানের পতাকা আঁকড়ে ধরেন। বীণা দাসের জীবনের শেষ দিনগুলো আমাদের এক গভীর অপরাধবোধের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। যে স্বাধীনতার জন্য তিনি সর্বস্ব বিসর্জন দিলেন, সেই স্বাধীন দেশ তাঁকে তাঁর যোগ্য মর্যাদা দিতে পারেনি, তবু তিনি চিরকাল ভারতের বীরত্বগাথার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়েই থাকবেন।
SOURCES:
১. Prohor : "স্বাধীনতার পর, সরকারের দেওয়া পেনশন নিতেও অস্বীকার করেন বীণা" ২. Wikipedia : "বীণা দাস" (উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ) ৩. Anandabazar Patrika/History Archives : "The Revolutionary Bina Das and the convocation incident" ৪. Flashback: Bina Das- Reborn by Professor Satyabrata G
১
১ মন্তব্য