সহকারী শিক্ষক
২৫ মার্চ, ২০২৬ ০১:৪১ অপরাহ্ণ
স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি: নতুন নীতিমালা কি ভাঙতে পারবে পুরোনো চক্র?
স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি: নতুন নীতিমালা কি ভাঙতে পারবে পুরোনো চক্র?
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটি (SMC) গঠন এবং এর দায়িত্ব-কর্তব্য নির্ধারণ বিষয়ে একটি নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, যা দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। ১৬ মার্চ, ২০২৬ তারিখে জারি করা এই নীতিমালায় পূর্বের সকল আদেশ বাতিল করে একটি নতুন, স্বচ্ছ এবং কার্যকর কমিটি গঠনের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো, কমিটির গঠনতন্ত্রে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তির একটি স্পষ্ট প্রয়াস এবং সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা ন্যূনতম স্নাতক নির্ধারণ করা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কাগজে-কলমে এই আলোর ঝলকানি মাঠ পর্যায়ের দীর্ঘদিনের অনিয়ম আর রাজনৈতিক প্রভাবের আঁধার কি সত্যিই কাটাতে পারবে?
নতুন নীতিমালার আশার আলো
নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি হবে সভাপতিসহ মোট ১২ সদস্যের। এই কমিটির কাঠামোতে একাধিক ইতিবাচক দিক রয়েছে যা একে আগের চেয়ে অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ ও কার্যকর করে তোলার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
শিক্ষানুরাগী প্রতিনিধিত্ব: কমিটিতে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবকদের মধ্য থেকে ন্যূনতম এসএসসি পাস করা একজন বিদ্যোৎসাহী পুরুষ ও একজন মহিলা অভিভাবক মনোনীত করার বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়াও নির্বাচিত আরও দুজন পুরুষ ও দুজন মহিলা অভিভাবক থাকবেন। এটি নিশ্চিত করবে যে, যারা সরাসরি স্কুলের ভালো-মন্দের সঙ্গে জড়িত, তাদের কণ্ঠস্বর কমিটিতে জোরালো হবে।
শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রাধান্য: কমিটির সভাপতিকে ন্যূনতম স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রিধারী হতে হবে, যা একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এর ফলে একজন শিক্ষিত ও যোগ্য ব্যক্তি স্কুল পরিচালনায় নেতৃত্ব দেবেন, যিনি শিক্ষার গুরুত্ব বোঝেন এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে পরিচিত। যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের বিধানও রাখা হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কমিটি: নতুন নীতিমালায় সংসদ সদস্য (এমপি) বা অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতার সরাসরি মনোনয়নে সভাপতি বা সদস্য হওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। ইউনিয়ন পরিষদের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড সদস্য বা পৌর/সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর পদাধিকারবলে সদস্য হিসেবে থাকলেও, পুরো কমিটি গঠনে এখন স্থানীয় শিক্ষানুরাগী, অভিভাবক এবং শিক্ষকদের ভূমিকাই প্রধান।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা: কমিটির সদস্য-সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন পদাধিকারবলে প্রধান শিক্ষক। এছাড়া কমিটিতে একজন শিক্ষক প্রতিনিধি, নিকটবর্তী মাধ্যমিক বিদ্যালয় বা মাদ্রাসার একজন শিক্ষক এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বা সরকারি কর্মকর্তার মতো সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি এর কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে সাহায্য করবে।
এই নীতিমালা নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী ও শিক্ষাবান্ধব স্কুল ব্যবস্থাপনার ভিত্তি তৈরি করার লক্ষ্যেই প্রণীত হয়েছে। এর উদ্দেশ্য মহৎ—স্কুলের সার্বিক উন্নয়নে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা, ঝরে পড়া রোধ করা এবং প্রতিটি শিশুর জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা।
বাস্তবতার কঠিন জমিন
নীতিমালা যত সুন্দরই হোক, এর সাফল্য নির্ভর করে তার সঠিক বাস্তবায়নের ওপর। আর এখানেই তৈরি হয় বড় সংশয়। আমাদের দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে, রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার দাপট এর নির্লজ্য বাস্তবতা। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, স্থানীয় রাজনৈতিক দলের পাতি নেতারা বা সুবিধাবাদীরা নিজেদের প্রভাব বিস্তারের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো জায়গাগুলোকে বেছে নেন। তারা নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করেন না, কারণ তাদের ধারণা—দল ক্ষমতায়, সুতরাং এলাকাও তাদের নিয়ন্ত্রণে।
এই ধরনের নেতারা স্কুলের উন্নয়ন বলতে বোঝেন নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শন আর ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি। তাদের কাছে স্নাতক ডিগ্রিধারী সভাপতি বা এসএসসি পাস করা বিদ্যোৎসাহী অভিভাবকের চেয়ে দলের প্রতি অনুগত কর্মী অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তারা যখন বলেন, "আমরাই ঠিক করব কমিটিতে কে থাকবে, আমরাই স্কুলের উন্নয়ন করব," তখন তাদের অতীত কর্মকাণ্ড সেই দাবির অসারতা প্রমাণ করে। যদি প্রশ্ন করা হয়, বিগত দিনে তারা স্কুলের জন্য নিজের শ্রম, মেধা বা অর্থ দিয়ে কী করেছেন, তার কোনো সদুত্তর মেলে না।
একটি রূঢ় উদাহরণ
ধরা যাক, কোনো একটি স্কুলে কয়েকটি বড় গাছ বিক্রির প্রয়োজন হলো। নিয়ম অনুযায়ী টেন্ডারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে গাছগুলো বিক্রি হওয়ার কথা। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা কমিটিতে অনৈতিকভাবে ঢুকে পড়লেন। তার প্রথম চেষ্টা থাকে টেন্ডার ছাড়াই নামমাত্র মূল্যে নিজের পছন্দের লোকের কাছে গাছগুলো বিক্রি করে দেওয়া, যাতে পুরোটাই পকেটে ভরা যায়। যদি সেই চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে ট্যাগারের আয়োজন করতে বাধ্যও হন, তখন তিনি অন্য কৌশল নেন। টেন্ডারে অংশগ্রহণকারী অন্যদের সঙ্গে মিলে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেন। ৫ লক্ষ টাকার গাছ তখন ১ লক্ষ টাকায় বিক্রি দেখানো হয়। সরকারি কোষাগারের ক্ষতি হয় ৪ লক্ষ টাকা। এই সিন্ডিকেটের নেতা হিসেবে তিনি একটি বড় অংশ নেন, টেন্ডারে অংশগ্রহণকারী অন্যরাও কিছু ভাগ পায়, আর স্কুল পায় শুধুই লোকসানের হিসাব। এটাই হলো তাদের "স্কুলের উন্নয়ন" করার নমুনা। এই ধরনের ব্যক্তিরা যখন কমিটিতে আসতে চায়, তখন তাদের মূল উদ্দেশ্য থাকে স্কুলের সম্পদ ভোগ করা, শিক্ষকদের ওপর কর্তৃত্ব খাটানো এবং নিজের সামাজিক প্রভাব বাড়ানো, শিক্ষার মানোন্নয়ন নয়।
কিছু প্রতিষ্ঠান প্রধানের আপসকামী ভূমিকা
এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে কিছু প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের আপসকামী বা সুবিধাবাদী ভূমিকা। অনেক প্রধান শিক্ষক স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ঝামেলায় জড়াতে চান না। তারা নিজেদের নিরাপদ রাখতে এবং চাপ এড়াতে অনেক সময় নীতিমালা লঙ্ঘন করে হলেও প্রভাবশালীদের পছন্দের লোকদের নিয়ে কমিটি গঠন করতে সায় দেন। যখন একজন প্রধান শিক্ষক এমন অনৈতিক কাজ করেন, তখন তা অন্য স্কুলগুলোর জন্য একটি বাজে উদাহরণ তৈরি করে। যে সকল প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়ম মেনে কমিটি করতে চান, তখন সুবিধাবাদীরা ঐসব অনিয়ম করে গঠিত কমিটির "রেফারেন্স" টেনে এনে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে।
শেষ কথা: উত্তরণের পথ কোথায়?
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই নতুন নীতিমালাটি একটি সাহসী এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এটি একটি আইনি ঢাল, যা ব্যবহার করে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিরা স্কুল ব্যবস্থাপনায় এগিয়ে আসতে পারেন। তবে এই আইনকে সফল করতে হলে প্রয়োজন একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
১. শিক্ষা কর্মকর্তাদের দৃঢ়তা: উপজেলা ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের অত্যন্ত কঠোর ও নির্ভীক ভূমিকা পালন করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই নীতিমালার বাইরে গিয়ে কমিটি অনুমোদনের সুযোগ দেওয়া যাবে না।
২. সচেতন অভিভাবক ও শিক্ষকদের ঐক্য: অভিভাবকদের বুঝতে হবে যে, স্কুলটি তাদের সন্তানদের এবং এর ভালো-মন্দ তাদের ওপরই নির্ভরশীল। তাদের সংগঠিত হয়ে রাজনৈতিক চাপকে প্রতিহত করতে হবে। সৎ ও সাহসী প্রধান শিক্ষকদের পাশে দাঁড়াতে হবে।
৩. সামাজিক প্রতিরোধ: স্থানীয় শিক্ষানুরাগী, সমাজকর্মী এবং সচেতন নাগরিকদের এই প্রক্রিয়ায় নজরদারি বাড়াতে হবে। অনিয়ম দেখলে সোচ্চার হতে হবে এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
২
২ মন্তব্য