Loading..

ব্লগ

রিসেট

২১ মার্চ, ২০২৬ ০৮:৫৬ অপরাহ্ণ

দায়িত্বহীন এক আমি ( দায়িত্ব)

দায়িত্বহীন এক আমি!


আমরা তিন ভাই আর এক বোন—চারটি জীবনের চারটি আলাদা নদী, অথচ উৎস একটাই। আমি সবার বড়। এই “বড়” শব্দটার ভিতরেই ছিল একসময় আশ্রয়, দায়িত্ব, আর অদৃশ্য এক ছায়া।যার নিচে সবাইকে আগলে রাখার কথা ছিল আমারই।

আমার পর আসাদ।জীবনের সাথে লড়াই করে কোনোভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তারপর জুলি।আমাদের একমাত্র বোন, এখন অন্য এক আঙিনার মানুষ। আর সবচেয়ে ছোট শাহেদ।ঢাকার ব্যস্ততার ভিড়ে নিজেকে টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে ব্যস্ত। আমরা সবাই আছি, তবুও যেন কেউ কারও পাশে নেই। দূরত্ব শুধু মাইলের নয়, হৃদয়েরও।

বাবার ছোট্ট একটা ব্যবসা।সেই পুরোনো দিনের মতোই চলছে। অথচ বয়সের ভারে নুয়ে পড়া মানুষটা এখনো সংসারের হাল ধরে আছেন। তিন তিনটা ছেলে থাকা সত্ত্বেও তার কাঁধ থেকে বোঝা নামেনি। বাবার সাথে আমার কথা হয় খুব কম।সময়ের ফাঁকে হারিয়ে যাওয়া কিছু শব্দের মতো। মায়ের সাথেও সম্পর্কটা যেন মাসে একবারের আনুষ্ঠানিক খোঁজখবরেই আটকে গেছে।

আমি নিজে একটা এনজিওতে ভালো পদে আছি।মাইনে খারাপ না। তবুও আমার নিজের সংসারেই যেন এক অদৃশ্য শূন্যতা। অভাব শুধু টাকার নয়, অভাব সময়ের, অভাব ভালোবাসার, অভাব উপস্থিতির। আমার দুটি ছোট সন্তান।ওদের শৈশব আমার চোখের সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে, অথচ আমি যেন দর্শক মাত্র। ওদের হাসি, ওদের আবদার,সবই যেন আমার ব্যস্ততার দেয়ালে আটকে যায়।

স্ত্রী,আমার জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ হওয়ার কথা ছিল যার, তাকেও আমি দূরে ঠেলে দিয়েছি অজান্তেই। অবহেলার ধুলো জমে গেছে সম্পর্কের প্রতিটি কোণায়।

সামনে ঈদ।আনন্দের, মিলনের, ভালোবাসার উৎসব। অথচ আমি আমার স্ত্রী আর সন্তানদের পাঠিয়ে দিয়েছি তাদের নানাবাড়ি। নিজে থেকেও দূরে সরে আছি নিজের শিকড় থেকে। বাবার সাথে দেখা করার ইচ্ছেটুকুও যেন কোথাও হারিয়ে গেছে।

কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা সত্য আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।আমি তো বড়!

আমার তো দায়িত্ব ছিল!

আমি চাইলে পারতাম—এই ছড়িয়ে পড়া সম্পর্কগুলোকে আবার এক সুতোয় গাঁথতে। ঈদের দিনটাকে একটা অজুহাত বানিয়ে সবাইকে এক টেবিলে বসাতে। বাবার ক্লান্ত মুখে একটু স্বস্তি এনে দিতে। মায়ের একাকীত্ব ভাঙতে। ভাই-বোনদের সাথে হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো ফিরিয়ে আনতে।

কিন্তু আমি পারিনি।

অথবা, চেষ্টা করিনি।

আজ মনে হয়,আমি যেন এক জীবন্ত যন্ত্র। বাইরে সব ঠিকঠাক, ভেতরে শূন্য। দায়িত্ব আছে, সামর্থ্য আছে, অথচ নেই সেই মানুষটা,যে মানুষ হয়ে উঠতে পারতাম আমি।

এই অপরাধবোধই এখন আমার আয়না। সেখানে নিজের মুখটা দেখলে লজ্জা লাগে, কষ্ট হয়। তবুও কোথাও একটা ক্ষীণ আশা রয়ে গেছে।

হয়তো এখনো দেরি হয়ে যায়নি।

হয়তো এখনো আমি ফিরে আসতে পারি—আমার মানুষগুলোর কাছে, আমার নিজের কাছে।

মন্তব্য করুন

ব্লগ