সহকারী শিক্ষক
২১ মার্চ, ২০২৬ ০১:৪৮ অপরাহ্ণ
সঞ্চিতা ও একাকীত্বের ঈদ
সঞ্চিতা ও একাকীত্বের ঈদ!
রূপম,নামটা শুনলেই এলাকার মানুষের চোখে একরকম বিরক্তি ভেসে ওঠে।
কেউ বলে, “ছেলেটা একেবারে নষ্ট।”
কেউ বলে, “ওর কাছে যাস না, ঝামেলায় পড়বি।”
ছোটবেলা থেকেই রূপম যেন সমাজের বাইরের মানুষ। বাবা-মায়ের সংসারে সে ছিল এক অপ্রয়োজনীয় বোঝা। বাবা বলতেন,
“এই ছেলেটার ভবিষ্যৎ অন্ধকার!”
মা কখনো কিছু বলতেন না, শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন।
ধীরে ধীরে বাড়িটা তার জন্য সংকীর্ণ হয়ে গেল। একদিন কোনো বড় ঝগড়ার পর সে নিজেই বেরিয়ে গেল। কেউ তাকে আটকায়নি।
এরপর শুরু হলো তার অন্য জীবন।
দিনে সে মানুষের ছোটখাটো কাজ করে।কখনো দোকানে মাল ওঠায়, কখনো রিকশাওয়ালার পাশে বসে সাহায্য করে, কখনো বাজারে ব্যাগ বয়ে দেয়।
রাতে স্টেশন,এক টুকরো পলিথিন, একটা পুরোনো কম্বল, আর আকাশটাই তার ছাদ।
তার একটা অদ্ভুত বিশ্বাস ছিল—
“খারাপ মানুষের সুখ থাকতে নেই।”
তাই ভালো কিছু পেলেই সে যেন অস্বস্তি বোধ করত।
এই একঘেয়ে জীবনের মাঝেই সে পছন্দ করে সঞ্চিতাকে।
সকালের স্কুলে যাওয়ার পথে, সাদা শাড়ি, হালকা নীল পাড়, কাঁধে ব্যাগ,একটা শান্ত মুখ।
এটাই সঞ্চিতার রোজকার দৃশ্য। রূপম দূরথেকে সঞ্চিতাকে দেখত।
কখনো রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে, কখনো চায়ের দোকানের আড়াল থেকে।
একদিন সাহস করে একটু কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সঞ্চিতা কপাল কুঁচকে বলেছিল
“এই! এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন? যাও!”
রূপম চুপচাপ সরে গিয়েছিল।
সেদিন রাতে স্টেশনে শুয়ে সে নিজেকেই বলেছিল,
“তুই কে রে? তোর ভালোবাসা? হাস্যকর!”
তার মনে আরও গেঁথে গেল,
“খারাপ মানুষের ভালোবাসার অধিকার নেই।”
সময় কেটে যাচ্ছিল।
হঠাৎ একদিন শহরে একটা দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ল।
স্কুল শিক্ষিকা সঞ্চিতার মায়ের ভয়াবহ এক্সিডেন্ট।
রূপম খবরটা শুনেই ছুটে গেল হাসপাতালে।
হাসপাতালের করিডোরে সঞ্চিতা বসে আছে—চোখ লাল, চুল এলোমেলো।
ডাক্তার বললেন,
“দুটি চোখই নষ্ট হয়ে গেছে...”
সঞ্চিতা ভেঙে পড়ল।
রূপম দূর থেকে সব দেখছিল।
তার বুকটা কেমন চেপে আসছিল।
সে প্রথমবার নিজের ভিতরের কষ্টটা স্পষ্টভাবে অনুভব করল।
সেই রাতটা তার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ রাত।
স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বসে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।
মনে হচ্ছিল, তার ভিতরে কেউ কাঁদছে।
হঠাৎ সে উঠে দাঁড়াল।
পরদিন হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তারকে বলল,
“আমি চোখ দিতে চাই।”
ডাক্তার অবাক হয়ে তাকালেন।
“তুমি বুঝে বলছ?”
রূপম হালকা হাসল।
“আমার মতো মানুষের এই পৃথিবী দেখার দরকার নেই, স্যার।”
সব প্রক্রিয়া শেষে, রূপম তার একটি চোখ দান করল।
অপারেশনের পর কয়েকদিন সে হাসপাতালে ছিল।
কেউ তাকে চিনত না, কেউ জানতে চায়নি সে কে।
শুধু একদিন, দূর থেকে সঞ্চিতাকে দেখে সে নিঃশব্দে তাকিয়ে ছিল।
তার চোখে তখন এক অদ্ভুত শান্তি।
অন্যদিকে, অপারেশন সফল হলো।
সঞ্চিতার মা আবার আলো দেখতে পেলেন।
যেদিন জানতে পারল—এই চোখটা রূপমের,
সেদিন সঞ্চিতা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
তার মাথায় ঘুরছিল সেই দৃশ্যগুলো,
রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা,
তার তাচ্ছিল্য,
তার অবহেলা।
সে নিজেকে খুব ছোট মনে করল।
কিন্তু তখন আর রূপম নেই।
হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার আগেই সে চলে গেছে।
কেউ জানে না কোথায়।
স্টেশনে গিয়ে খোঁজ নিল সঞ্চিতা।
লোকজন বলল,
“ও? কদিন হলো দেখা যায় না...”
রাতের বেলা, সঞ্চিতা একা দাঁড়িয়ে ছিল সেই স্টেশনে।
যেখানে রূপম একসময় ঘুমাত।
তার চোখে জল।
সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“একবার ফিরে আসো...”
কিন্তু কোনো উত্তর এল না।
বছর কেটে গেল।
সঞ্চিতা মাঝে মাঝে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মায়ের চোখের দিকে তাকায়।
মনে হয়—ওখানে এখনো রূপম বেঁচে আছে।
কখনো কখনো, সমাজ যাদের ঘৃণা করে,
তাদের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে নির্মল মানুষটি।
আর কিছু মানুষ,
ভালোবাসতে জানে, কিন্তু দাবি করতে জানে না।
এরপর আরও অনেকটা বছর কেটে গেল। বিয়ের পিড়িতে বসা হয়নি সঞ্চিতার!
৪
৪ মন্তব্য