সিনিয়র শিক্ষক
০৬ মার্চ, ২০২৬ ০৫:৫০ অপরাহ্ণ
ইরানে বিষণ্ন রমজান ও অনিশ্চিত ঈদ
রমজান মুসলমানের জীবনে আনন্দ ও আনুগত্যের বার্তা নিয়ে আসে। মুসলিম জাতি রমজান মাসে মহান আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের আশায় ইবাদত ও আধ্যাত্মিকতায় মগ্ন হয়। কিন্তু এবারের রমজান ইরানিদের জন্য বয়ে এনেছে গভীর শোক ও বিষণ্নতার বার্তা। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা ও ধর্মীয় রাহবার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন।
তিনি ইরান রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। তাঁর মৃত্যুর শোক গভীরভাবে আচ্ছন্ন করেছে ইরানি জনগণকে। তাঁর মৃত্যুতেই থেমে যায়নি সংঘাত। মুহুর্মুহু হামলায় কেঁপে উঠছে ইরানের শহরগুলো এবং ইরানিদের অন্তর।পবিত্র এই মাসে যখন তাদের ইবাদতে মগ্ন থাকার কথা ছিল তখন তারা ডুবে আছে নিজেদের ও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে।দীর্ঘদিনের পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে আগে থেকেই ইরানি অর্থনীতির ভঙ্গুর অবস্থা চলছিল। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানি মুদ্রার ব্যাপক দরপতনের কারণে দেশটিতে ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিয়েছিল, যা ক্ষুব্ধ করেছিল ইরানি জনগণকে। ইরানে চলমান যৌথ সামরিক হামলা ইরানিদের জীবন-জীবিকার দুশ্চিন্তাকে আরো প্রকট করেছে।
মানুষ চরম অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। অনেক মানুষ বাসস্থান ছেড়ে নিরাপদ মনে করা অঞ্চলে পালাতে চেষ্টা করছে, আবার অনেকে ঘরবাড়িতে আটকে আছে। বিশেষ করে ইন্টারনেট ও যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় তারা স্বজনদের খোঁজখবরও পাচ্ছে না। আশঙ্কা রয়েছে, যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে জীবন-জীবিকার এই সংকট আরো তীব্র রূপ নেবে।রমজান মাসে সাধারণত ইরানিরা সমাজসেবা, পারিবারিক সম্পর্ক দৃঢ়করণ ও জনকল্যাণমূলক কাজ করতে পছন্দ করে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি তাদের রমজানের চিরায়ত রীতি ও সংস্কৃতি থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির অনাহার আর রমজানের সিয়াম সাধনা একাকার হয়ে যাচ্ছে। আসন্ন ঈদের আনন্দ যেন তাদের দুশ্চিন্তা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী ঈদ ইরানিদের কাছে একাকিত্ব ও দুঃখের প্রতিফলন হয়ে আসছে। যুদ্ধ স্থায়ী হলে অনেক মানুষ স্বজনহারা হয়ে ঈদ উদযাপন করবে। ঈদ হবে তাদের কাছে আনন্দের পরিবর্তে দুঃখের মার্সিয়া।তেহরানে রমজানের এই অনিশ্চিত সময়ে আগে থেকে চলা পানির সংকট নতুন করে নাগরিক দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দীর্ঘস্থায়ী খরা ও জলাধারের স্তর নেমে যাওয়ার কারণে রাজধানীর বহু এলাকায় নিয়মিত পানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। অনেক পরিবার সাহরি ও ইফতারের সময় প্রয়োজনীয় পানিও সংরক্ষণ করে ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। এই সম্মিলিত সংকট ইরানিদের মানসিক চাপ আরো বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। এমন অবস্থায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংঘাতের অবসান ও কূটনৈতিক সমাধানের পথ সুগম করার উদ্যোগ নেওয়া আবশ্যক, যাতে ইরানসহ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের জীবন থেকে শঙ্কা ও অনিশ্চয়তা দূর হয়। আর রমজানের ইবাদত ও ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে।
সব মিলিয়ে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইরানে রমজান শুধু রোজা ও ইবাদতের নামই নয়, বরং ভয়, অনিশ্চয়তা ও মানবিক সংকটের সঙ্গে লড়াইয়ের এক কঠিন পরীক্ষা। যুদ্ধের ছাই মাখা পরিবেশ ঈদের আনন্দকে শ্রাবণের কালো মেঘের মতো ঢেকে রেখেছে কেবল হতাশা ও বিষণ্নতার ম্লান ছায়া।
১
১ মন্তব্য