Loading..

ব্লগ

রিসেট

০২ মার্চ, ২০২৬ ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ

সূর্যগ্রহণ (প্রাকৃতিক এক অপূর্ব নিয়ম)



সূর্যগ্রহণ

প্রাকৃতিক ঘটনা যেখানে সূর্য চাঁদ দ্বারা অস্পষ্ট হয়...


যখন চাঁদ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করার সময়ে ঠিক সূর্য ও পৃথিবীর মাঝামাঝি এসে পড়ে তখন সেটি সূর্যের আলোকে পৃথিবীতে আসতে বাধা দেয়-অর্থাৎ চাঁদের ছায়া পৃথিবীর কিছু অংশের উপরে পড়ে। এ ঘটনাকে সূর্যগ্রহণ বলে। এ সময় সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী একই সরলরেখায় অবস্থান করে। সূর্যগ্রহণ বিভিন্ন রকম হতে পারে; যেমন-আংশিক, পূর্ণগ্রাস, বলয় এবং হাইব্রিড সূর্যগ্রহণ। তোমাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, সূর্যের ব্যাস চাঁদের ব্যাস থেকে 400 গুণ বড়ো, তারপরেও চাঁদ কীভাবে সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলতে পারে? কারণটি সহজ, চাঁদ সূর্যের তুলনায় ছোট হলেও এটি পৃথিবীর 400 গুণ কাছে অবস্থান করে সেজন্য পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে চাঁদ ও সূর্যকে প্রায় একই আকারে দেখা যায়। চাঁদের কক্ষপথ খানিকটা উপবৃত্তাকার, এটি যখন পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে আসে তখন পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব হয় 3.63 লক্ষ কিমি, যখন পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে থাকে তখন পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব হয় 4.05 লক্ষ কিমি। চাঁদ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব সবচাইতে বেশি হলে তাকে বলে অপভূ (apogee) এবং চাঁদ ও পৃথিবীর দূরত্ব সবচাইতে কম হলে তাকে বলে অনুভূ (perigee)।


• আংশিক সূর্যগ্রহণ*

পৃথিবী ও সূর্যের মাঝামাঝি অবস্থানকালে চাঁদ যদি সূর্যের খানিকটা অংশ ঢেকে ফেলে তবে আংশিক সূর্যগ্রহণ সংঘটিত হয়। এক্ষেত্রে যে স্থানে আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখা যায় সেখানে সূর্যকে চাঁদ দ্বারা আংশিক ঢাকা অবস্থায় দেখা যায়। আংশিক সূর্যগ্রহণের সময় মূলত উপচ্ছায়ার প্রাধান্য বেশি থাকে। একে খণ্ডগ্ৰাস সূর্যগ্ৰহণ নামে অভিহিত করা হয়।


• পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ*.

গ্রহণের সময় সূর্য যদি চাঁদের দ্বারা সম্পূর্ণ ঢেকে যায় তবে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ সংঘটিত হয়। আমরা জানি, চাঁদ পৃথিবীকে উপবৃত্তাকার পথে পরিভ্রমণ করে। ফলে কখনো কখনো চাঁদ পৃথিবীর কাছাকাছি অবস্থান করে (অনুভূ) তখন চাঁদকে তুলনামূলকভাবে বড়ো দেখা যায়। চাঁদ অনুভূ অবস্থানে থাকার সময় যদি সূর্যগ্রহণ হয় তবে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ হয়ে থাকে। এরকম সময়ে যে সকল স্থানে প্রচ্ছায়া পড়ে সেই সকল স্থান থেকে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যায়। পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণের সময় সূর্যের চারপাশে তার করোনা দেখা যায়। শুধু এই সময়েই খালি চোখে সূর্যের করোনা দেখা সম্ভব হয় যেটি অন্য কখনো দেখার সৌভাগ্য হয় প্রচ্ছায়া খুব সামান্য অংশ জুড়ে থাকে, আবার পৃথিবীও তার নিজ অক্ষে ঘুরতে থাকে। তার ফলে প্রচ্ছায়া একটি নির্দিষ্ট স্থানে স্থির থাকে না, এটি পৃথিবীপৃষ্ঠে একটি রেখাপথ (একে আমরা পূর্ণগ্রাস গ্রহণরেখা বলতে পারি) বরাবর সরতে থাকে। এই রেখাপথ ভূপৃষ্ঠের যে সকল স্থানে পড়ে সে সকল স্থানে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখতে পাওয়া যায়। পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের ঠিক শুরুর মুহূর্তে যখন পুরো সূর্যটা ঢেকে গিয়ে শুধু একটি ক্ষুদ্র অংশ ঢেকে যাওয়া বাকী থাকে এবং শেষ হওয়ার পরের মুহূর্তে যখন পুরোটা ঢেকে যাওয়ার পর ক্ষুদ্র একটা অংশ বের হয়ে আসে তখন সেই অংশে সূর্যের তীব্র আলো দৃশ্যমান হয় এবং সেটি দেখতে অনেকটা হীরার আংটির মতো দেখা যায় বলে তাকে ডায়মন্ড রিং বলে।


• বলয়গ্ৰাস সূর্যগ্রহণ*

অনেক সময় উপবৃত্তাকার পথে ভ্রমণ কালে চাঁদ এমন অবস্থানে থাকে যে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় সেটি সম্পূর্ণ সূর্যকে ঢেকে রাখতে পারে না। তখন চাঁদের চারপাশে সূর্যকে আংটির মতো দেখা যায়। এই ধরনের বলয় আকৃতির সূর্যগ্রহণকে বলয়গ্ৰাস সূর্যগ্রহণ বলে।


• সূর্যগ্রহণের প্রভাব ও গুরুত্ব*

সূর্যগ্রহণের সময় পরিবেশের উপর সাময়িক প্রভাব পড়ে। আংশিক গ্রহণ অনেকটা সময় জুড়ে চলতে পারে কিন্তু পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ এর সময় সূর্য মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য সম্পূর্ণ ঢেকে যেতে পারে। পূর্ণগ্রাস গ্রহণকালীন সময়ে হঠাৎ চারদিক অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় পশুপাখিরা হতচকিত হয়ে যায়। অসময়ে অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় অনেক পাখি ভয় পেয়ে ডাকাডাকি বন্ধ করে দেয়, ঝিঁঝিঁ পোকা শব্দ করা শুরু করতে পারে, উদ্ভিদে ফুল বুজে যাওয়া শুরু হতে পারে। কিছু কিছু স্থানে বায়ুর তাপমাত্রাও সামান্য কমে যেতে পারে। তবে সূর্যগ্রহণ সূর্য সংক্রান্ত গবেষণার কিছু দুর্লভ সুযোগ সৃষ্টি করে। যেমন সূর্যের করোনা নিয়ে তথ্য সংগ্রহের সবচেয়ে ভালো সুযোগ সূর্যগ্রহণের সময় আসে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে অবস্থিত হওয়ায় এবং চাঁদ দ্বারা সূর্য ঢেকে যাওয়ার ফলে তখন সূর্যের করোনা পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকেই পর্যবেক্ষণ করা যায়। গ্রহণের সময় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল বিশেষ করে বায়ুমণ্ডলের উপরের অংশে কী ধরনের পরিবর্তন হয় তা পর্যবেক্ষণ করা যায়। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরের অংশে সূর্যের তেজস্ক্রিয় বিকিরণের ফলে বিভিন্ন ধরনের চার্জযুক্ত কণা তৈরি হয়। এই অংশে পৃথিবীর অনেক কৃত্রিম উপগ্রহ অবস্থান করায় তা পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


• সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ ও সতর্কতা*

একটি বিষয় সবসময় মনে রাখতে হবে যে সূর্য থেকে অনেক ক্ষতিকর রশ্মি পৃথিবীতে আসে, যার একটি হচ্ছে অতিবেগুনি রশ্মি। আমরা যেহেতু অতিবেগুনি রশ্মি দেখতে পাই না, তাই না জেনে তার দিকে তাকিয়ে চোখের ভয়াবহ ক্ষতি করতে পারি। সরাসরি সূর্যের দিকে তাকালে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে চোখের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। সূর্যগ্রহণের সময় সরাসরি সূর্যের দিকে না তাকিয়ে, কোথাও সূর্যের প্রতিচ্ছবি ফেলে সেটা দেখা সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি। পিনহোল ব্যবহার করে সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করা সহজ, একটি শক্ত কাগজে ছোট একটি ছিদ্র করে তার মধ্যে গ্রহণের সময় সূর্যের আলো অপর একটি পর্দায় ফেললে সেখানে সূর্যগ্রহণ দেখা যায়।

মন্তব্য করুন

ব্লগ