Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৩:৪৫ অপরাহ্ণ

সূরা আদ-দুহা'র সম্পর্কে আলোচনা

ইসলাম শিক্ষা। নবম- দশম শ্রেণি

অধ্যায়-২  পাঠ ৭


সূরাঅধ্যায়-২  পাঠ ৭


সূরা আদ-দুহা سُورَةُ الضُّحى


দুহা অর্থ- সকাল প্রভাত। দিন প্রকাশ। উজ্জ্বল প্রভা। পূর্বাহ্ন। দিনের প্রথম ভাগ। forenoon.  Morning light.  Radiant Morning.  Early daylight. Sunrise time.


১। সূরা আদ-দুহা আল-কুরআনের ৯৩তম সূরা। 

২। সূরা দুহার আয়াত সংখ্যা ১১। 

৩। সূরা দুহা পবিত্র মক্কা নগরীতে নাজিল হয়। 

৪। সূরাটির প্রথম শব্দ দুহা থেকে এ সূরার নামকরণ করা হয়েছে আদ-দুহা।


শানে নুযুল


হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে যে, একবার রাসুলুল্লাহ (স.) অসুস্থ থাকার কারণে দুই-তিন রাত তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করতে পারেননি। এ সময় জিবরাইল (আ.) আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তাঁর নিকট ওহি নিয়ে আগমন করেননি। এতে মক্কার কাফির-মুশরিকরা বলতে লাগল যে, মুহাম্মদ (স.)-কে তাঁর প্রতিপালক পরিত্যাগ করেছে এবং তাঁর প্রতি বিরূপ হয়েছে।


অন্যদিকে আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিল মহানবি (স.)-এর নিকট এসে বলতে লাগল, "হে মুহাম্মদ! আমার মনে হয় তোমার নিকট যে শয়তান আসত সে তোমাকে পরিত্যাগ করে চলে গেছে। দুই-তিন রাত যাবৎ আমি তাকে তোমার নিকট আসতে দেখছি না।" কাফিরদের এসব কথায় ও ঠাট্টা-বিদ্রূপে মহানবি (স.) মর্মাহত হন। তখন আল্লাহ তায়ালা প্রিয়নবি (স.)-কে সান্ত্বনা প্রদান করে এ সূরা নাজিল করেন। এ সূরার মাধ্যমে কাফিরদের প্রচারিত গুজবের প্রতিবাদও জানানো হয়।


অনুবাদ


পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে।


১. শপথ পূর্বাহ্ণের। দিনের প্রথম ভাগ


২. শপথ রাতের, যখন তা নিঝুম হয়/ অন্ধকার


৩. আপনার প্রতিপালক আপনাকে পরিত্যাগ করেননি এবং আপনার প্রতি বিরূপও হননি।


৪. নিশ্চয়ই আপনার জন্য পরকাল ইহকাল অপেক্ষা শ্রেয়।


৫. অচিরেই আপনার প্রতিপালক আপনাকে অনুগ্রহ দান করবেন, আর আপনি সন্তুষ্ট হবেন।


৬. তিনি কি আপনাকে ইয়াতীম অবস্থায় পাননি? অতঃপর তিনি আপনাকে আশ্রয় দান করেছেন।


৭. তিনি আপনাকে পথ সম্পর্কে অনবহিত পেয়েছেন, তারপর তিনি পথের নির্দেশ দিয়েছেন।


৮. তিনি আপনাকে পেয়েছেন নিঃস্ব অবস্থায়, অতঃপর তিনি অভাবমুক্ত করেছেন।


৯. সুতরাং আপনি ইয়াতীমের প্রতি কঠোর হবেন না।


১০. এবং যাচনাকারীকে ধমক দেবেন না।


১১. আর আপনি আপনার প্রতিপালকের নিয়ামতের কথা প্রকাশ করুন।




রাসূলের (সাঃ) প্রতি আল্লাহ সুবহানাহুর দেয়া কতিপয় নি'আমাত


অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নি'আমাতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন : أَلَمْ يَجِدْكَ يَتِيمًا فَآوَى হে নাবী! তুমি ইয়াতীম থাকা অবস্থায় আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করেছেন, হিফাযাত করেছেন, প্রতিপালন করেছেন এবং আশ্রয় দিয়েছেন।


 নাবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম লাভের পূর্বেই তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেছিলেন। ছয় বছর বয়সে তাঁর স্নেহময়ী মা মারা যান। তারপর তিনি তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিবের আশ্রয়ে বড় হতে থাকেন। তাঁর বয়স যখন আট বছর তাঁর দাদাও পরপারে চলে যান। অতঃপর তিনি তাঁর চাচা আবু তালিবের নিকট প্রতিপালিত হতে থাকেন। আবু তালিব তাঁকে সর্বাত্মক দেখাশুনা এবং সাহায্য করেন। তিনি তাঁর স্নেহের ভ্রাতুস্পুত্রকে খুবই সম্মান করতেন, মর্যাদা দিতেন এবং স্বজাতির বিরোধিতার মুকাবিলা করতেন। নিজেকে তিনি ঢাল হিসাবে উপস্থাপন করতেন। চল্লিশ বছর বয়সের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাবুওয়াত লাভ করেন। কুরাইশরা তখন তাঁর ভীষণ বিরোধী এমনকি প্রাণের দুশমন হয়ে গেল। আবূ তালিব মুশরিক মূর্তিপূজক হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সহায়তা দান করতেন এবং তাঁর বিরুদ্ধবাদীদের সাথে লড়াই করতেন। এই সুব্যবস্থা আল্লাহপাকের ইচ্ছা ও ইঙ্গিতেই হয়েছিল। হিজরাতের কিছুদিন পূর্বে আবু তালিবও ইন্তেকাল করেন। এবার কাফির মুশরিকরা কঠিনভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। আল্লাহ তা'আলা তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মাদীনায় হিজরাত করার অনুমতি দেন এবং মাদীনার আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়কে তাঁর সাহায্যকারী বানিয়ে দেন। ঐ দয়ালু আনসার ব্যক্তিবর্গ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এবং তাঁরসাহাবীগণকে (রাঃ) আশ্রয় দিয়েছেন, জায়গা দিয়েছেন, সাহায্য করেছেন এবং তাঁদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন। আর শত্রুদের মুকাবিলায় বীরের মত সামনে অগ্রসর হয়ে যুদ্ধ করেছেন। আল্লাহ তাঁদের সবারই প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন! এ সবই আল্লাহর মেহেরবানী, অনুগ্রহ এবং রহম ও করমের ফলেই সম্ভব হয়েছিল।


এরপর মহান আল্লাহ স্বীয় নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেন : وَوَجَدَكَ ضَالًّا فَهَدَى তোমাকে আল্লাহ তা'আলা পথহারা থেকে নিরাপত্তা প্রদান করে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। যেমন অন্যত্র রয়েছে:


وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِّنْ أَمْرِنَا مَا كُنتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا


الْإِيمَانُ وَلَكِن جَعَلْنَاهُ نُورًا نَّهْدِي بِهِ مَن نَّشَاءُ مِنْ عِبَادِنَا


এভাবে আমি তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ করেছি রূহ তথা আমার নির্দেশ; তুমি তো জানতেনা কিতাব কি ও ঈমান কি! পক্ষান্তরে আমি একে করেছি আলো যা দ্বারা আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা পথ-নির্দেশ করি। (সূরা শুরা, ৪২: ৫২) আল্লাহ তা'আলা এরপর বলেন:


وَوَجَدَكَ عَائِلًا فَأَغْنَى হে নাবী! তিনি (আল্লাহ) তোমাকে পেলেন নিঃস্ব অবস্থায়, অতঃপর তিনি তোমাকে অভাবমুক্ত করলেন। ফলে ধৈর্যধারণকারী দরিদ্র এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী ধনীর মর্যাদা তুমি লাভ করেছ। আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রতি দুরুদ ও সালাম বর্ষণ করুন!




আল্লাহর দেয়া নি'আমাতের কিভাবে শোকর আদায় করতে হবে


মহান আল্লাহ স্বীয় নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে বলেন : فَأَمَّا الْيَتِيمَ فَلَا تَقْهَرْ 


১।  ইয়াতীমের  প্রতি কঠোর হওয়া যাবে না । 

 আল্লাহ যেমন তোমাকে ইয়াতীম অবস্থায় আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছেন, তুমিও তেমনি ইয়াতীমকে ধমক দিওনা এবং তার সাথে দুর্ব্যবহার করনা, বরং তার সাথে সদ্ব্যবহার কর এবং নিজের ইয়াতীম হওয়ার কথা ভুলে যেওনা।


২। অভাবীকে ধমক দেয়া যাবে না 

আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আরো বলেন : وَأَمَّا السَّائِلَ فَلَا تَنْهَرْ যাঞ্চাকারীকে ভর্ৎসনা করনা। তুমি যেমন পথহারা ছিলে, আল্লাহ তোমাকে হিদায়াত বা পথের দিশা দিয়েছেন, তেমনি কেহ তোমাকে জ্ঞানের কথা জিজ্ঞেস করলে তাকে রূঢ় ব্যবহার দ্বারা সরিয়ে দিওনা। গরীব, মিসকীন, এবং দুর্বল লোকদের প্রতি অহংকার প্রদর্শন করনা। তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করনা। তাদেরকে কড়া কথা বলনা। ইয়াতীম মিসকীনদেরকে যদি কিছু না দিতে পার তাহলে ভাল ও নরম কথা বলে তাদেরকে বিদায় কর এবং ভালভাবে তাদের প্রশ্নের জবাব দাও।


৩। নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। 

 আল্লাহ তা'আলা বলেন : وَأَمَّا بِنِعْمَةٍ رَبِّكَ فَحَدِّتْ নিজের রবের নি'আমাতসমূহ বর্ণনা করতে থাক। অর্থাৎ যেমন আমি তোমার দারিদ্রতাকে ঐশ্বর্যে পরিবর্তিত করেছি, তেমনই তুমিও আমার এ সব নি'আমাতের কথা বর্ণনা করতে থাক।

 রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: 'যারা মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেনা তারা আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেনা।'


কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও প্রচার করার দায়িত্ব প্রদান করেন।


শিক্ষা


এ সূরা থেকে আমরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের শিক্ষা লাভ করি। যেমন।


১. আল্লাহ তার প্রিয় বান্দাদের কখনোই পরিত্যাগ করেন না।


২. তিনিই তাদের সকল বিপদাপদ থেকে রক্ষা করেন।


৩. পরকালে তিনি তাদের কল্যাণময় জীবন দান করবেন।


৪. ধনী ও সচ্ছল ব্যক্তিদের উচিত গরিব-দুঃখী, ইয়াতীম ও ভিক্ষুকদের কল্যাণ করা।


৫. অভাবী, সাহায্যপ্রার্থী, ইয়াতীমদের প্রতি কঠোর হওয়া যাবে না, তাদের গালমন্দ কিংবা মারধর করা যাবে না এবং তাঁদের ধমকও দেওয়া যাবে না। বরং তাদের সাথে সদাচরণ করতে হবে।


৬. দুনিয়ার সকল কল্যাণ ও নিয়ামত আল্লাহ তায়ালার দান। এসব নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা সকলের কর্তব্য। যেমন আল্লাহ তায়ালা আমাদের ইমান, কুরআন, ধন-দৌলত, জান-বুদ্ধি ইত্যাদি নিয়ামত দান করেছেন। সুতরাং এসবের জন্য আল্লাহ তায়ালার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে। এসব নিয়ামতের কথা মানুষের মাঝে প্রচার করতে হবে।

৭।কষ্টের পরই আসে স্বস্তি

দুঃখ ও সংকট সাময়িক; ধৈর্য ধরলে আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দেন।

৮।আখিরাত দুনিয়ার চেয়ে উত্তম

দুনিয়ার সাময়িক কষ্টের চেয়ে পরকালের জীবন অনেক শ্রেষ্ঠ।

৯।হতাশ না হওয়া

নবী ﷺ কঠিন সময় পার করেছেন, তবুও আল্লাহ তাঁকে সান্ত্বনা দিয়েছেন—এটি আমাদের জন্য আশার বার্তা।

১০।  মানবসেবাই কৃতজ্ঞতার প্রকাশ

এতিম ও অভাবীদের সাহায্য করা আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের একটি মাধ্যম।

১১। আল্লাহর উপর ভরসা রাখা (তাওয়াক্কুল)

সংকটে ধৈর্য ও আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রাখা ঈমানের অংশ। আদ-দুহা سُورَةُ الضُّحى


দুহা অর্থ- সকাল প্রভাত। দিন প্রকাশ। উজ্জ্বল প্রভা। পূর্বাহ্ন। দিনের প্রথম ভাগ। forenoon.  Morning light.  Radiant Morning.  Early daylight. Sunrise time.


১। সূরা আদ-দুহা আল-কুরআনের ৯৩তম সূরা। 

২। সূরা দুহার আয়াত সংখ্যা ১১। 

৩। সূরা দুহা পবিত্র মক্কা নগরীতে নাজিল হয়। 

৪। সূরাটির প্রথম শব্দ দুহা থেকে এ সূরার নামকরণ করা হয়েছে আদ-দুহা।


শানে নুযুল


হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে যে, একবার রাসুলুল্লাহ (স.) অসুস্থ থাকার কারণে দুই-তিন রাত তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করতে পারেননি। এ সময় জিবরাইল (আ.) আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তাঁর নিকট ওহি নিয়ে আগমন করেননি। এতে মক্কার কাফির-মুশরিকরা বলতে লাগল যে, মুহাম্মদ (স.)-কে তাঁর প্রতিপালক পরিত্যাগ করেছে এবং তাঁর প্রতি বিরূপ হয়েছে।


অন্যদিকে আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিল মহানবি (স.)-এর নিকট এসে বলতে লাগল, "হে মুহাম্মদ! আমার মনে হয় তোমার নিকট যে শয়তান আসত সে তোমাকে পরিত্যাগ করে চলে গেছে। দুই-তিন রাত যাবৎ আমি তাকে তোমার নিকট আসতে দেখছি না।" কাফিরদের এসব কথায় ও ঠাট্টা-বিদ্রূপে মহানবি (স.) মর্মাহত হন। তখন আল্লাহ তায়ালা প্রিয়নবি (স.)-কে সান্ত্বনা প্রদান করে এ সূরা নাজিল করেন। এ সূরার মাধ্যমে কাফিরদের প্রচারিত গুজবের প্রতিবাদও জানানো হয়।


অনুবাদ


পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে।


১. শপথ পূর্বাহ্ণের। দিনের প্রথম ভাগ


২. শপথ রাতের, যখন তা নিঝুম হয়/ অন্ধকার


৩. আপনার প্রতিপালক আপনাকে পরিত্যাগ করেননি এবং আপনার প্রতি বিরূপও হননি।


৪. নিশ্চয়ই আপনার জন্য পরকাল ইহকাল অপেক্ষা শ্রেয়।


৫. অচিরেই আপনার প্রতিপালক আপনাকে অনুগ্রহ দান করবেন, আর আপনি সন্তুষ্ট হবেন।


৬. তিনি কি আপনাকে ইয়াতীম অবস্থায় পাননি? অতঃপর তিনি আপনাকে আশ্রয় দান করেছেন।


৭. তিনি আপনাকে পথ সম্পর্কে অনবহিত পেয়েছেন, তারপর তিনি পথের নির্দেশ দিয়েছেন।


৮. তিনি আপনাকে পেয়েছেন নিঃস্ব অবস্থায়, অতঃপর তিনি অভাবমুক্ত করেছেন।


৯. সুতরাং আপনি ইয়াতীমের প্রতি কঠোর হবেন না।


১০. এবং যাচনাকারীকে ধমক দেবেন না।


১১. আর আপনি আপনার প্রতিপালকের নিয়ামতের কথা প্রকাশ করুন।




রাসূলের (সাঃ) প্রতি আল্লাহ সুবহানাহুর দেয়া কতিপয় নি'আমাত


অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নি'আমাতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন : أَلَمْ يَجِدْكَ يَتِيمًا فَآوَى হে নাবী! তুমি ইয়াতীম থাকা অবস্থায় আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করেছেন, হিফাযাত করেছেন, প্রতিপালন করেছেন এবং আশ্রয় দিয়েছেন।


 নাবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম লাভের পূর্বেই তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেছিলেন। ছয় বছর বয়সে তাঁর স্নেহময়ী মা মারা যান। তারপর তিনি তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিবের আশ্রয়ে বড় হতে থাকেন। তাঁর বয়স যখন আট বছর তাঁর দাদাও পরপারে চলে যান। অতঃপর তিনি তাঁর চাচা আবু তালিবের নিকট প্রতিপালিত হতে থাকেন। আবু তালিব তাঁকে সর্বাত্মক দেখাশুনা এবং সাহায্য করেন। তিনি তাঁর স্নেহের ভ্রাতুস্পুত্রকে খুবই সম্মান করতেন, মর্যাদা দিতেন এবং স্বজাতির বিরোধিতার মুকাবিলা করতেন। নিজেকে তিনি ঢাল হিসাবে উপস্থাপন করতেন। চল্লিশ বছর বয়সের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাবুওয়াত লাভ করেন। কুরাইশরা তখন তাঁর ভীষণ বিরোধী এমনকি প্রাণের দুশমন হয়ে গেল। আবূ তালিব মুশরিক মূর্তিপূজক হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সহায়তা দান করতেন এবং তাঁর বিরুদ্ধবাদীদের সাথে লড়াই করতেন। এই সুব্যবস্থা আল্লাহপাকের ইচ্ছা ও ইঙ্গিতেই হয়েছিল। হিজরাতের কিছুদিন পূর্বে আবু তালিবও ইন্তেকাল করেন। এবার কাফির মুশরিকরা কঠিনভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। আল্লাহ তা'আলা তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মাদীনায় হিজরাত করার অনুমতি দেন এবং মাদীনার আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়কে তাঁর সাহায্যকারী বানিয়ে দেন। ঐ দয়ালু আনসার ব্যক্তিবর্গ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এবং তাঁরসাহাবীগণকে (রাঃ) আশ্রয় দিয়েছেন, জায়গা দিয়েছেন, সাহায্য করেছেন এবং তাঁদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন। আর শত্রুদের মুকাবিলায় বীরের মত সামনে অগ্রসর হয়ে যুদ্ধ করেছেন। আল্লাহ তাঁদের সবারই প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন! এ সবই আল্লাহর মেহেরবানী, অনুগ্রহ এবং রহম ও করমের ফলেই সম্ভব হয়েছিল।


এরপর মহান আল্লাহ স্বীয় নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেন : وَوَجَدَكَ ضَالًّا فَهَدَى তোমাকে আল্লাহ তা'আলা পথহারা থেকে নিরাপত্তা প্রদান করে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। যেমন অন্যত্র রয়েছে:


وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِّنْ أَمْرِنَا مَا كُنتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا


الْإِيمَانُ وَلَكِن جَعَلْنَاهُ نُورًا نَّهْدِي بِهِ مَن نَّشَاءُ مِنْ عِبَادِنَا


এভাবে আমি তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ করেছি রূহ তথা আমার নির্দেশ; তুমি তো জানতেনা কিতাব কি ও ঈমান কি! পক্ষান্তরে আমি একে করেছি আলো যা দ্বারা আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা পথ-নির্দেশ করি। (সূরা শুরা, ৪২: ৫২) আল্লাহ তা'আলা এরপর বলেন:


وَوَجَدَكَ عَائِلًا فَأَغْنَى হে নাবী! তিনি (আল্লাহ) তোমাকে পেলেন নিঃস্ব অবস্থায়, অতঃপর তিনি তোমাকে অভাবমুক্ত করলেন। ফলে ধৈর্যধারণকারী দরিদ্র এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী ধনীর মর্যাদা তুমি লাভ করেছ। আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রতি দুরুদ ও সালাম বর্ষণ করুন!




আল্লাহর দেয়া নি'আমাতের কিভাবে শোকর আদায় করতে হবে


মহান আল্লাহ স্বীয় নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে বলেন : فَأَمَّا الْيَتِيمَ فَلَا تَقْهَرْ 


১।  ইয়াতীমের  প্রতি কঠোর হওয়া যাবে না । 

 আল্লাহ যেমন তোমাকে ইয়াতীম অবস্থায় আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছেন, তুমিও তেমনি ইয়াতীমকে ধমক দিওনা এবং তার সাথে দুর্ব্যবহার করনা, বরং তার সাথে সদ্ব্যবহার কর এবং নিজের ইয়াতীম হওয়ার কথা ভুলে যেওনা।


২। অভাবীকে ধমক দেয়া যাবে না 

আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আরো বলেন : وَأَمَّا السَّائِلَ فَلَا تَنْهَرْ যাঞ্চাকারীকে ভর্ৎসনা করনা। তুমি যেমন পথহারা ছিলে, আল্লাহ তোমাকে হিদায়াত বা পথের দিশা দিয়েছেন, তেমনি কেহ তোমাকে জ্ঞানের কথা জিজ্ঞেস করলে তাকে রূঢ় ব্যবহার দ্বারা সরিয়ে দিওনা। গরীব, মিসকীন, এবং দুর্বল লোকদের প্রতি অহংকার প্রদর্শন করনা। তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করনা। তাদেরকে কড়া কথা বলনা। ইয়াতীম মিসকীনদেরকে যদি কিছু না দিতে পার তাহলে ভাল ও নরম কথা বলে তাদেরকে বিদায় কর এবং ভালভাবে তাদের প্রশ্নের জবাব দাও।


৩। নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। 

 আল্লাহ তা'আলা বলেন : وَأَمَّا بِنِعْمَةٍ رَبِّكَ فَحَدِّتْ নিজের রবের নি'আমাতসমূহ বর্ণনা করতে থাক। অর্থাৎ যেমন আমি তোমার দারিদ্রতাকে ঐশ্বর্যে পরিবর্তিত করেছি, তেমনই তুমিও আমার এ সব নি'আমাতের কথা বর্ণনা করতে থাক।

 রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: 'যারা মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেনা তারা আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেনা।'


কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও প্রচার করার দায়িত্ব প্রদান করেন।


শিক্ষা


এ সূরা থেকে আমরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের শিক্ষা লাভ করি। যেমন।


১. আল্লাহ তার প্রিয় বান্দাদের কখনোই পরিত্যাগ করেন না।


২. তিনিই তাদের সকল বিপদাপদ থেকে রক্ষা করেন।


৩. পরকালে তিনি তাদের কল্যাণময় জীবন দান করবেন।


৪. ধনী ও সচ্ছল ব্যক্তিদের উচিত গরিব-দুঃখী, ইয়াতীম ও ভিক্ষুকদের কল্যাণ করা।


৫. অভাবী, সাহায্যপ্রার্থী, ইয়াতীমদের প্রতি কঠোর হওয়া যাবে না, তাদের গালমন্দ কিংবা মারধর করা যাবে না এবং তাঁদের ধমকও দেওয়া যাবে না। বরং তাদের সাথে সদাচরণ করতে হবে।


৬. দুনিয়ার সকল কল্যাণ ও নিয়ামত আল্লাহ তায়ালার দান। এসব নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা সকলের কর্তব্য। যেমন আল্লাহ তায়ালা আমাদের ইমান, কুরআন, ধন-দৌলত, জান-বুদ্ধি ইত্যাদি নিয়ামত দান করেছেন। সুতরাং এসবের জন্য আল্লাহ তায়ালার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে। এসব নিয়ামতের কথা মানুষের মাঝে প্রচার করতে হবে।

৭।কষ্টের পরই আসে স্বস্তি

দুঃখ ও সংকট সাময়িক; ধৈর্য ধরলে আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দেন।

৮।আখিরাত দুনিয়ার চেয়ে উত্তম

দুনিয়ার সাময়িক কষ্টের চেয়ে পরকালের জীবন অনেক শ্রেষ্ঠ।

৯।হতাশ না হওয়া

নবী ﷺ কঠিন সময় পার করেছেন, তবুও আল্লাহ তাঁকে সান্ত্বনা দিয়েছেন—এটি আমাদের জন্য আশার বার্তা।

১০।  মানবসেবাই কৃতজ্ঞতার প্রকাশ

এতিম ও অভাবীদের সাহায্য করা আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের একটি মাধ্যম।

১১। আল্লাহর উপর ভরসা রাখা (তাওয়াক্কুল)

সংকটে ধৈর্য ও আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রাখা ঈমানের অংশ।

মন্তব্য করুন

ব্লগ