Loading..

ব্লগ

রিসেট

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১০:৪৯ অপরাহ্ণ

বাংলা ভাষা: সমন্বয়ের নদী, বিভাজনের বাঁধ নয়

বাংলা ভাষা কোনো একক উৎসের সন্তান নয়; এটি সহস্র বছরের বহুস্রোতের মিলনভূমি। প্রাচীন মাগধী প্রাকৃতের ধারা, অস্ট্রো-এশিয়াটিক ও দ্রাবিড় উপাদান, সংস্কৃত ও পালির বৌদ্ধিক ঐতিহ্য, পরবর্তী সময়ে ফারসি, আরবি, তুর্কি, পর্তুগিজ ও ইংরেজি—সবাই এই ভাষার শরীরে নিজেদের ছাপ রেখেছে। বাংলা কোনো “বিশুদ্ধ” জলাধার নয়; এটি এক প্রবহমান নদী, যার শক্তি তার বহুত্বে।
ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলা শব্দভাণ্ডারের প্রায় ২৮ শতাংশ শব্দ বিদেশি উৎসজাত—যার মধ্যে ফারসি, আরবি ও উর্দু উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে। বাংলা একাডেমির অভিধান অনুসারে ফারসি উৎসের শব্দই রয়েছে প্রায় সাড়ে চার হাজার; আরবি উৎসের শব্দও কয়েক হাজার। ফলে স্পষ্ট—বাংলা ভাষার গঠন ও বিকাশে বহিরাগত প্রভাব কোনো প্রান্তিক বিষয় নয়, বরং ঐতিহাসিক বাস্তবতা।
মুসলিম শাসনামলে—বিশেষত সুলতানি ও মোগল যুগে—ফারসি ছিল দাপ্তরিক ভাষা। প্রশাসন, বিচার, বাণিজ্য ও নগরজীবনের মাধ্যমে ফারসি ও আরবি শব্দ বাংলায় গভীরভাবে প্রোথিত হয়। দরজা, জানালা, খাতা, কাগজ, দোকান, বাজার, আয়না, শহর, বাগান, পছন্দ, বিদায়—এই শব্দগুলো এতটাই স্বাভাবিক যে তাদের “বিদেশি” বলে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব। এগুলো কেবল শব্দ নয়; আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ—আমরা কলম ধরি, কিতাব পড়ি, আদালতে যাই, হুকুম মানি।
তবু বিস্ময় জাগে—কেন কেবল আরবি-ফারসি-উর্দু উৎসের শব্দে আপত্তি, অথচ ইংরেজি শব্দে নয়? আমরা অনায়াসে বলি ওকে, বাই, প্লিজ, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, টেবিল, চেয়ার—কিন্তু “ইনকিলাব” বা “ইনসাফ” উচ্চারিত হলেই অস্বস্তি কেন? যদি ভাষার বিশুদ্ধতাই লক্ষ্য হয়, তবে সব বিদেশি শব্দই সমানভাবে বর্জনীয় হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এটি বিশুদ্ধতার প্রশ্ন নয়; এটি বাছাই করা অসহিষ্ণুতা।
“আজাদী”, “জুলুম”, “মজলুম”, “ইনসাফ”—এই শব্দগুলো বাংলা সাহিত্যেও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর “বিদ্রোহী”সহ বহু কবিতায় এসব শব্দ প্রতিবাদ, ন্যায় ও মুক্তির ভাষা হয়ে উঠেছে। এগুলো বাদ দিলে তাঁর কবিতার শক্তিই খর্ব হবে।
ভাষা কোনো সংকীর্ণ অভিধান নয়; এটি ইতিহাসের অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম ও আবেগের ভাণ্ডার। ভাষা কোনো মতাদর্শের সৈনিক নয়; ভাষা সমাজের জীবন্ত দলিল। যে সমাজ বহুসাংস্কৃতিক, তার ভাষাও বহুমাত্রিক। বাংলার ইতিহাসে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও আদিবাসী—সব সম্প্রদায়ের অবদান রয়েছে। ভাষাকে একরৈখিক করতে চাওয়া মানে ইতিহাসকেই সংকুচিত করা।
ইংরেজি ভাষা আজ বৈশ্বিক প্রভাবশালী—কারণ সে ল্যাটিন, গ্রিক, ফরাসি, জার্মানসহ অসংখ্য ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করেছে। গ্রহণই তার শক্তি। বাংলার ক্ষেত্রেও সত্য একই: যে ভাষা গ্রহণে উন্মুক্ত, সেই ভাষাই টিকে থাকে।
ভাষা বেছে নয়, প্রয়োজনে শব্দ গ্রহণ করে। আমাদের ব্যক্তিগত পরিচয়ও বহুসূত্রে গঠিত—নাম, পোশাক, সংস্কৃতি—সবই বহু ঐতিহ্যের সংমিশ্রণ। তাহলে ভাষাকে কেন কৃত্রিমভাবে এক উৎসে সীমাবদ্ধ করতে চাই?
ভাষার প্রাণশক্তি তার অভিযোজন ক্ষমতায়। নদী যেমন নানা উপনদীর জল গ্রহণ করে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যায়, তেমনি ভাষাও গ্রহণের মধ্য দিয়েই বিস্তৃত হয়। আজ বিশ্বায়নের যুগে নতুন শব্দ প্রতিনিয়ত আসছে—সেলফি, গুগল, ভাইরাল—বাংলা সেগুলোকেও আত্মসাৎ করছে। এটাই তার স্বভাব, এটাই তার স্থিতিস্থাপকতা।
ভাষা যদি প্রবাহ থামায়, তবে সে স্থবির হয়; আর স্থবির ভাষা দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
বাংলা কোনো গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়; এটি সমগ্র জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। তাই এর প্রকৃত চেতনা বিভাজনে নয়, সমন্বয়ে। আমরা যদি ভাষাকে রক্ষা করতে চাই, তবে তাকে মুক্ত রাখতেই হবে—নতুন শব্দের জন্য উন্মুক্ত, ভিন্ন উৎসের প্রতি সহনশীল, ইতিহাসের প্রতি সৎ।
বাংলা ভাষা নদীর মতো—প্রবহমান, প্রসারিত, উদার। বাঁধ নয়, স্রোতই তার প্রকৃতি।
আ-মরি বাংলা ভাষা—এই উচ্চারণে আছে সমন্বয়ের গৌরব, বহুত্বের আশা।
বিভাজনের উলটো স্রোতে নয়। বাংলা থাকুক উন্মুক্ত, বৈচিত্র্যময়, অসীম। 🇧🇩

মুফিদুল আলম
শিক্ষক ও লেখক
রামু, কক্সবাজার

মন্তব্য করুন

ব্লগ