প্রভাষক
২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ
"বেসরকারি শিক্ষকদের কল্যাণ তহবিল আসলেই কি কল্যাণ বয়ে আনে!!"
"বেসরকারি শিক্ষকদের কল্যাণ তহবিল আসলেই কি কল্যাণ বয়ে আনে!!"
মোহাম্মদ মনির হোসেন
প্রভাষক, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, মেহের ডিগ্রি কলেজ, শাহরাস্তি, চাঁদপুর। +8801811656353, [email protected]
এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ইতিকথা
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের জীবন বরাবরই এক মিশ্র অভিজ্ঞতার নাম। একদিকে জ্ঞান বিতরণের মহান ব্রত, অন্যদিকে জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণে সীমাহীন সংগ্রাম। সরকারি শিক্ষকদের মতো পূর্ণাঙ্গ পেনশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত এই শিক্ষকদের জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ড (সাধারণত এটি অবসর সুবিধা বোর্ড দ্বারা পরিচালিত হয়) এবং কল্যাণ তহবিল যেন কর্মজীবনের শেষ প্রান্তে এক টুকরো আশার আলো। এই তহবিলগুলো তৈরি হয়েছিল শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর পরবর্তী আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে। তবে "বেসরকারি শিক্ষকদের কল্যাণ তহবিল আসলেই কি কল্যাণ বয়ে আনে!!" এই শিরোনামে প্রশ্নটি আজ হাজারো অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের হৃদয়ের আর্তি। দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রতিমাসে বাধ্যতামূলকভাবে যে অর্থ কর্তন করা হয়েছে, অবসরের পর সেই অর্থ পেতে গিয়ে তাদের যে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়, তা কি সত্যিই "কল্যাণ" শব্দের প্রতি সুবিচার করে? এই লেখায় বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড ও কল্যাণ তহবিলের কর্তন হার, অতিরিক্ত কর্তনের প্রেক্ষাপট, প্রত্যাশিত সুবিধা, হয়রানি ও প্রশাসনের ভূমিকা এবং হয়রানি রোধে প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা তুলে ধরবো।
কর্তনকৃত টাকার হার: অতীত ও বর্তমানের ফারাক
বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতন থেকে প্রতি মাসে প্রভিডেন্ট ফান্ড (অবসর সুবিধা বোর্ড) এবং কল্যাণ তহবিলে একটি নির্দিষ্ট অংশ বাধ্যতামূলকভাবে কেটে নেওয়া হয়।
পূর্বের কর্তন হার: প্রাথমিকভাবে, শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের একটি অংশ (সাধারণত ৬%) অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
বর্তমানে কর্তনকৃত টাকার হার (অতিরিক্ত কর্তন): বর্তমানে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের মোট ১০% অর্থ বাধ্যতামূলকভাবে কর্তন করা হয়। এর মধ্যে ৬% যায় বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডে এবং ৪% যায় বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টে। এই অতিরিক্ত ৪% কর্তন শুরু হয় সরকারের পক্ষ থেকে, যা নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে প্রবল অসন্তোষ ছিল এবং এখনও বিদ্যমান। শিক্ষকদের দাবি ছিল, অতিরিক্ত এই কর্তনের বিপরীতে যেন পর্যাপ্ত সুবিধা নিশ্চিত করা হয়, যা এখনও উপেক্ষিত। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও প্রতি বছর অবসর ও কল্যাণ তহবিলের জন্য চাঁদা হিসেবে অর্থ (যেমন, প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ১০০ টাকা, যার ৭০ টাকা অবসর ও ৩০ টাকা কল্যাণের জন্য) আদায় করা হয়।
অতিরিক্ত কর্তনকৃত টাকা হতে কি সুবিধা পাওয়া যায়: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব
শিক্ষক-কর্মচারীরা দীর্ঘ চাকরি জীবনে তাদের মূল বেতনের একটি মোটা অংশ এই তহবিলে জমা রাখেন এই আশায় যে, অবসরের পর তারা দ্রুত ও নির্বিঘ্নে সেই অর্থ হাতে পাবেন। অতিরিক্ত ৪% কর্তনের উদ্দেশ্য ছিল তহবিল দুটিকে আরও শক্তিশালী করা, যাতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা সময়মতো তাদের প্রাপ্য সুবিধা পেতে পারেন এবং অপেক্ষার সময় কমে আসে। অবসর গ্রহণের পর একজন শিক্ষক বা কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ (যেমন: ২৫ বছর বা তদূর্ধ্ব চাকরির জন্য ৭৫ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অবসর ভাতা এবং চাকরির সময়কালের ওপর ভিত্তি করে কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে এককালীন কল্যাণ সুবিধা) পেয়ে থাকেন। এই অর্থ তাদের অবসর পরবর্তী চিকিৎসা, কন্যাদায় কিংবা অন্য কোনো জরুরি প্রয়োজনে বড় সহায়ক হওয়ার কথা। বাস্তবে দেখা যায়, তহবিলের এই বর্ধিত চাঁদা বা সরকারি থোক বরাদ্দ (যেমন, সম্প্রতি অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য একত্রে ২২০০ কোটি টাকার মতো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে) সত্ত্বেও, শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ও কল্যাণ সুবিধার টাকা পেতে দীর্ঘ ৪ থেকে ৫ বছর বা তারও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়। এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে বহু শিক্ষক বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা ও অর্থাভাবে মানবেতর জীবন যাপন করেন, এমনকি চিকিৎসা না পেয়ে মারাও যান। অতিরিক্ত কর্তন সত্ত্বেও সুবিধা দ্রুত না মেলায় শিক্ষকদের মনে প্রশ্ন জাগে, এই অতিরিক্ত চাঁদা আসলে কাদের কল্যাণ বয়ে আনছে?
ভবিষ্যৎ-কল্যাণ তহবিলের টাকা উত্তোলনে হয়রানি: দুর্বিষহ অপেক্ষা
টাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে হয়রানি বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জীবনের এক চরম বাস্তবতা। এই হয়রানি বহুস্তরীয়:
দীর্ঘসূত্রতা ও আর্থিক সংকট: অবসর গ্রহণের পর প্রাপ্য টাকা পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। বর্তমানে প্রায় ৮৫ হাজারেরও বেশি শিক্ষক-কর্মচারীর আবেদন অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে আছে, যার বিপরীতে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে। আর্থিক সংকটকেই বিলম্বের প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হয়।
অফিসের দাপ্তরিক জটিলতা: টাকা উত্তোলনের আবেদন জমা দেওয়ার পর বারবার অফিসে ধরনা দিতে হয়। সামান্য ভুল বা ত্রুটির অজুহাতে আবেদন আটকে রাখা হয়।
আমলাতান্ত্রিক জট: বিভিন্ন পর্যায়ে ফাইল আটকে থাকা, অডিট প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে দেরি হওয়া, এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা হয়রানির মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। বৃদ্ধ ও অসুস্থ শিক্ষকদের পক্ষে এই হয়রানি মোকাবিলা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ফান্ডের অর্থের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন: শিক্ষকদের জমানো এই টাকা কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সে সম্পর্কে তারা প্রায়শই অবগত থাকেন না। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষকদের জমানো টাকা থেকেই কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর সুবিধা বোর্ডের কর্মরতদের বেতন-ভাতা, গাড়ি-বাড়ির খরচ ইত্যাদি মেটানো হয়। এই অপব্যবহারের কারণে শিক্ষকরা সময়মতো তাদের প্রাপ্য টাকা পান না।
প্রশাসনের ভূমিকা: উদাসীনতা ও জবাবদিহিতার অভাব
কল্যাণ তহবিল এবং অবসর সুবিধা বোর্ডের পরিচালনায় নিয়োজিত প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে।
ঘাটতি মেটাতে ব্যর্থতা: দীর্ঘদিন ধরে তহবিলে বিশাল ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে থোক বরাদ্দ দেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
স্বচ্ছতার অভাব: তহবিল পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব সুস্পষ্ট। শিক্ষকদের জমানো টাকার হিসাব, বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত সুদ এবং ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ তথ্য শিক্ষকরা জানতে পারেন না।
কর্মকর্তাদের উদাসীনতা: অনেক সময় বোর্ডের কর্মকর্তাদের আচরণে সেবা দেওয়ার চেয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বাড়ানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের প্রতি মানবিকতার অভাব স্পষ্ট। প্রশাসনের মূল দায়িত্ব হলো অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের প্রাপ্য সুবিধা দ্রুত ও হয়রানিমুক্তভাবে নিশ্চিত করা। অথচ, দেখা যাচ্ছে প্রশাসন এই মৌলিক দায়িত্ব পালনে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।
হয়রানি রোদে সুপারিশমালা: আলোর পথে যাত্রা
বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে এবং অবসরকালীন হয়রানি বন্ধে নিম্নলিখিত সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা যেতে পারে:
তহবিলের ঘাটতি দ্রুত পূরণ: সরকারকে অবিলম্বে শিক্ষক-কর্মচারীদের জমে থাকা পাওনা মেটাতে বড় আকারের 'স্থায়ী তহবিল' বা 'বন্ড' আকারে অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে এবং এই তহবিলের অর্থ শুধুমাত্র লাভজনক ও নিরাপদ খাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা: তহবিলের আয়-ব্যয়, বিনিয়োগ এবং বকেয়া টাকার পরিমাণ সম্পর্কে নিয়মিত (মাসিক/ত্রৈমাসিক) অনলাইন প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। শিক্ষকদের জন্য একটি অনলাইন পোর্টাল চালু করতে হবে, যেখানে তারা তাদের কর্তনকৃত টাকার হিসাব, আবেদনের অবস্থা এবং আনুমানিক টাকা পাওয়ার সময় সম্পর্কে জানতে পারবেন।
কর্তনকৃত ৪% টাকার সুবিধা নিশ্চিত করা: অতিরিক্ত ৪% কর্তনের রায় বা উদ্দেশ্য অনুযায়ী, অবসর গ্রহণের ৬ মাসের মধ্যে টাকা প্রদানের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করতে হবে। এর অন্যথা হলে প্রশাসনিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রশাসনিক সংস্কার: বোর্ডের পরিচালন কাঠামোকে আরও শিক্ষকবান্ধব করতে হবে। প্রয়োজনে দক্ষ ও স্বচ্ছ ব্যক্তিদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। হয়রানিমুক্ত সেবা প্রদানের জন্য সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে।
স্থায়ী সমাধান: জাতীয়করণ: বেসরকারি শিক্ষকদের দুর্দশার স্থায়ী সমাধান হলো এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতীয়করণ করা। এতে শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারি শিক্ষকদের মতো পেনশন ও পূর্ণাঙ্গ সরকারি সুবিধা পাবেন এবং কল্যাণ তহবিল ও অবসর সুবিধা বোর্ডের ওপর চাপ কমবে।
আবেদন প্রক্রিয়া সহজীকরণ: আবেদন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণরূপে ডিজিটাল ও সহজ করতে হবে, যাতে বয়স্ক শিক্ষকদের বারবার ঢাকায় আসতে না হয়। একটি 'ওয়ান-স্টপ সার্ভিস' বা আঞ্চলিক কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে।
আপদকালীন বিশেষ ব্যবস্থা: গুরুতর অসুস্থ বা অতি দরিদ্র শিক্ষকদের জন্য একটি 'জরুরি তহবিল' বা 'ফাস্ট-ট্র্যাক' সুবিধা চালু করা যেতে পারে, যাতে তারা চিকিৎসার মতো অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজনে দ্রুত অর্থ পেতে পারেন।
'কল্যাণ' নামের আড়ালে লুকানো বঞ্চনা
"বেসরকারি শিক্ষকদের কল্যাণ তহবিল আসলেই কি কল্যাণ বয়ে আনে!!" প্রশ্নটি আসলে একটি দীর্ঘশ্বাস। এই তহবিল শিক্ষকদের নিজস্ব জমানো টাকা এবং এর উদ্দেশ্য অবশ্যই কল্যাণকর। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অবসর পরবর্তী জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও একজন শিক্ষক যখন তাঁর ন্যায্য পাওনা পেতে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে বাধ্য হন, তখন সেই 'কল্যাণ' শব্দটি এক ধরনের ব্যঙ্গ হিসেবে প্রতিভাত হয়। জাতি গড়ার কারিগরদের জীবনের শেষ দিনগুলো যাতে আর্থিক দুশ্চিন্তা ও হয়রানিমুক্ত হয়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। সময় এসেছে, আমলাতান্ত্রিক জট, আর্থিক অসচ্ছলতা এবং প্রশাসনিক উদাসীনতা কাটিয়ে এই তহবিলকে প্রকৃত অর্থেই 'কল্যাণ' ট্রাস্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার। অন্যথায়, এই শিক্ষক সমাজ কেবল আশা নিয়েই নয়, বঞ্চনা নিয়েই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করবেন।
৪
৪ মন্তব্য