সিনিয়র শিক্ষক
১৬ অক্টোবর, ২০২০ ০৬:৪৯ অপরাহ্ণ
সিনিয়র শিক্ষক
পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সাম্প্রতিক খবরে জানা যায়, করোনা দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় কৃষকদের জন্য ঘোষিত প্রণোদনা ঋণ বিতরণে আগ্রহ দেখাচ্ছে না অনেক সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক।
এমনকি প্রণোদনা ঘোষণার পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও এ প্যাকেজের অর্ধেক ঋণও বিতরণ করতে পারেনি ব্যাংকগুলো। অন্যদিকে ব্যাংকগুলো বৃহৎশিল্প ও সেবা খাত এবং রফতানিমুখী শিল্পের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ খাত সংক্রান্ত প্যাকেজগুলোর অর্থ ক্ষেত্রবিশেষে ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বিতরণ করেছে।
কৃষকদের জন্য নির্ধারিত প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ বিতরণে ব্যাংকগুলোর অনাগ্রহ কৃষক সংগঠন, কৃষি বিশেষজ্ঞসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী শিল্প ও সেবা খাতের জন্য ঘোষিত প্রণোদনা ৩৩ হাজার কোটি টাকার ৭৭ দশমিক ১৫ শতাংশ অর্থাৎ ২৫ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছে। দ্রুত অর্থছাড়করণ শিল্প ও সেবা খাতের ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
এজন্য ব্যাংগুলো নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড কৃষি খাতের (পোলট্রি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, মৌসুমভিত্তিক ফুল ও ফল চাষ) জন্য বরাদ্দকৃত প্রণোদনার অর্থ বিতরণের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘কৃষিঋণ’ বিভাগের বরাত দিয়ে ৯ অক্টোবর একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- সরকার ঘোষিত লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের মাত্র ৫ হাজার কোটি টাকা কৃষকদের জন্য। কিন্তু প্রণোদনা ঘোষণার পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও এ প্যাকেজের অর্ধেক ঋণও বিতরণ করতে পারেনি ব্যাংকগুলো।
এখন পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার ১০ শতাংশ ঋণও বিতরণ করতে পারেনি এমন ব্যাংকের সংখ্যা ১৯। আবার কৃষকদের প্যাকেজের এক টাকাও বিতরণ করতে পারেনি এমন ব্যাংক রয়েছে পাঁচটি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর শেষে সবকটি ব্যাংক মিলিয়ে কৃষকদের ১ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। সে হিসাবে এ প্যাকেজের বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৪২ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
স্বাধীনতার প্রথম দশকে জিডিপির চার ভাগের প্রায় তিন ভাগ আসত সার্বিক কৃষি খাত (শস্য, বন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সমন্বয়ে গঠিত সার্বিক কৃষি খাত) থেকে। দেশের মোট জনশক্তির ৭৫ শতাংশ কৃষি খাতে নিয়োজিত ছিল (দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা : ১৯৮০-৮৫)।
বর্তমানে কৃষিতে জিডিপির পরিমাণ ২০ শতাংশের নিচে এবং কৃষিতে নিয়োজিত কর্মক্ষম জনশক্তির সংখ্যা ৪০ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এলেও এখনও কৃষি ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান কর্মকাণ্ড এবং জীবনীশক্তি’ (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৮)।
তাছাড়া সার্বিক জিডিপিতে কৃষির রয়েছে পরোক্ষ অবদান; বিশেষ করে বৃহৎ সেবা খাতের মধ্যে পাইকারি ও খুচরা বিপণন, হোটেল ও রেস্তোরাঁ এবং পরিবহন, সংরক্ষণ ও যোগাযোগ খাতের প্রবৃদ্ধিতে এ খাতের রয়েছে মূল্যবান অবদান। কৃষিশুমারি-২০১৯ এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট পরিবারের ৪৬ দশমিক ৬১ শতাংশ পরিবার কৃষির ওপর নির্ভরশীল।
এর মধ্যে ৫৩ দশমিক ৮২ শতাংশ গ্রামে, ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ শহরে বাস করে। বিভাগভিত্তিক এ হার হচ্ছে- বরিশাল ৬৬, চট্টগ্রাম ৪৪ দশমিক ৯৪, ঢাকা ৩০ দশমিক ৭৯, খুলনা ৫৪ দশমিক ৭৮, ময়মনসিংহ ৫৫ দশমিক ৭৫, রাজশাহী ৫১ দশমিক ১১, রংপুর ৫৫ দশমিক ৪৭ এবং সিলেট ৪৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
কৃষি আমাদের সার্বিক খাদ্যের জোগান দেয়। কৃষি থেকে উৎপাদিত শর্করাজাতীয় খাদ্য চালে আমরা স্বনির্ভরতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছি এবং এটি আমাদের দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য। শর্করাজাতীয় খাদ্যের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা গম উৎপাদনে আমরা অনেক পিছিয়ে থাকলেও এটি আমাদের শর্করা খাদ্যের চাহিদা মেটাতে অবদান রাখছে।
শাকসবজি উৎপাদনে দেশ শুধু স্বনির্ভর নয়, বিশ্বে তার স্থান তৃতীয়। আমিষের প্রধান উৎস মাছে স্বনির্ভরতা অর্জনের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে দেশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার-২০১৮ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ ৩য় স্থান এবং বদ্ধজলাশয়ে চাষকৃত মাছ উৎপাদনে ৫ম স্থান অধিকার করেছে।
আমিষের আরেক উৎস ডিম উৎপাদনেও বাংলাদেশ স্বনির্ভরতা অর্জনের পথে। মৎস্য খাতের তুলনায় প্রাণিসম্পদ খাতে প্রবৃদ্ধির হার কম হলেও অর্থমন্ত্রীর ভাষায় ‘বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ বিশেষ করে গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি ইত্যাদি পালনে প্রায় সাম্প্রতিক সময়ে অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধন করেছে।
এ খাতে চলমান গবেষণা কার্যক্রম উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জনে অবদান রেখেছে’ (অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা ২০২০-২১)। মাছ ও মৎস্যজাত পণ্য রফতানির মাধ্যমে বাংলাদেশ মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে শূন্য দশমিক ৬৮ লাখ টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রফতানি করে চার হাজার ৩০৯ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে।
আমরা যেসব খাদ্যদ্রব্য যথা- গম, মাংস, ডাল, খাবার তেল, দুধ, ফলমূল, মসলা ইত্যাদি চাহিদা মোতাবেক জোগান দিতে পারছি না, সেসব পণ্য অধিক পরিমাণে উৎপাদনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কৃষক ও সরকার।
শিল্প খাতের কাঁচামাল সরবরাহে ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধিতে মূল্যবান অবদান রেখে আসছে কৃষি খাত। পাট উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ পাটের জন্মরহস্য উন্মোচন করে এর উন্নত উৎপাদন ও বহুমাত্রিক ব্যবহারের সুযোগ এনে দিয়েছে। পাটশিল্প নানা সমস্যায় ভুগলেও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্যগুলো রফতানি করে দেশ ১০২৬ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৯)।
চলমান করোনা মহামারীতে কৃষির অবদান আমরা সবচেয়ে বেশি অনুধাবন করতে পারছি। মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত দেশে লকডাউনের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে কৃষি বাদে সব খাতের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। করোনা সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে বিভিন্ন দেশ তাদের সীমানা বন্ধ করে দেয়। বন্ধ হয়ে যায় আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিমান চলাচল ব্যবস্থা।
ভেঙে পড়ে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ব্যবসা-বাণিজ্য। এ মহাদুর্যোগের সময়ে কৃষকরা করোনার ভয়কে উপেক্ষা ও কঠোর পরিশ্রম করে যে শস্য ফলিয়েছে, তা আমাদের বাঁচিয়ে রাখে এবং এখনও বাঁচিয়ে রাখছে।
শীতের আগমনের প্রাক্কালে ইউরোপের অনেক দেশে করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। সেসব দেশে করোনাভাইরাসে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বাড়তে শুরু করেছে। শীতের আক্রমণ তীব্র হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ওইসব দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে বলে অনেক রোগবিশেষজ্ঞ মতপ্রকাশ করেছেন।
আমাদের দেশেও দ্বিতীয় দফায় করোনা মহামারী দেখা দেয়ার কথা বলে দেশবাসীকে এখন থেকেই প্রত্যেকের সুরক্ষার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তার ভাষায়, ‘এখনও করোনাভাইরাসের প্রভাব আছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, আরেকবার এ ভাইরাসের প্রভাব বা প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। কারণ ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে আবার নতুন করে দেখা দিচ্ছে।’
উল্লেখ্য, বিশেষজ্ঞদের মতে এ ধরনের ভাইরাসজনিত মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ ভয়াবহ হয়। এ প্রসঙ্গে ১৯১৮-১৯ সালের স্প্যানিস ফ্লুর উদাহরণ এসে যায়। ওই ফ্লুতে প্রথম ধাপে ৩০ থেকে ৫০ লাখ মানুষের মৃত্যু হলেও দ্বিতীয় ধাপে বিশ্বজুড়ে পাঁচ কোটি মানুষ মারা যায় বলে জানা যায়।
আল্লাহ না করুন, আসন্ন শীতে ভয়াবহ রূপ নিয়ে করোনাভাইরাস দ্বিতীয় ধাপে দেশে ফেরত এলে এবং শিল্প ও সেবা খাতসহ সব খাতের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়লে কৃষকরা সব ভয় উপেক্ষা করে কৃষিপণ্য উৎপাদন করে আগের মতো আমাদের বাঁচিয়ে রাখবে।
তাছাড়া বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর প্রাদুর্ভাবে অনেক উন্নত দেশের অর্থনীতি যখন নাকানিচুবানি খাচ্ছে, তখন সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে সরকারি হিসাবে আমাদের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ঘটেছে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ। বেড়েছে জিডিপির আকার। এসবে সার্বিক কৃষি খাতের রয়েছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। বস্তুত এ থেকে বোঝা যায়, কৃষি আমাদের জীবন ও অর্থনীতিতে কত গুরুত্বপূর্ণ।
তাই ব্যাংকগুলোর উচিত হবে, কৃষি খাতকে অবহেলা না করে এ খাতের পোলট্রি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, মৌসুমভিত্তিক ফুল ও ফল চাষে পুনঃঅর্থায়ন বাবদ বরাদ্দকৃত পাঁচ হাজার কোটি টাকা বর্ধিত সময় ডিসেম্বরের মধ্যে বিতরণ সম্পন্ন করা।
সরকারের উচিত হবে, ভাইরাসজনিত মহামারীকারীন কৃষি খাতের গুরুত্ব এবং করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ আসার আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে সার্বিক কৃষি খাতে প্রণোদনার অর্থ বাড়িয়ে দেয়া; বিশেষ করে যেসব ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গা চাষী আমাদের প্রধান খাদ্য চাল উৎপাদন করে আমাদের বাঁচিয়ে রাখছেন এবং অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন, তাদের এ প্রণোদনায় অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।(Copied)