সহকারী শিক্ষক
১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
ধরনঃ সাধারণ শিক্ষা
শ্রেণিঃ একাদশ
বিষয়ঃ বাংলা সহপাঠ
অধ্যায়ঃ বাংলা ভাষা ও ব্যকরণ
## বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ: একটি সাহিত্যিক ও মনস্তাত্ত্বিক পর্যালোচনা
মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের অমর সৃষ্টি 'মেঘনাদবধ কাব্য'-এর ষষ্ঠ সর্গ বা 'বধ' অংশের একটি অত্যন্ত নাটকীয় ও ভাবগম্ভীর অংশ হলো ‘বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ’। এটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যসংঘাত ও চরিত্রচিত্রণের এক অনন্য নিদর্শন।
লঙ্কাপুরীতে যখন রাম ও লক্ষ্মণের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলছে, তখন বীরবাহুর মৃত্যুর পর লঙ্কার শেষ ভরসা ছিলেন ইন্দ্রজিৎ বা বীর মেঘনাদ। যুদ্ধজয়ের দেবতাগ্নির আরাধনার জন্য তিনি নিকুমভিলা যজ্ঞাগারে ইষ্টদেবী পুজায় ব্রতী হন। কিন্তু অত্যন্ত গোপনীয় এই যজ্ঞাগারের পথ লঙ্কারই এক ঘরের মানুষ—মেঘনাদের আপন চাচা বিভীষণ—শত্রু পক্ষের হাতে উন্মুক্ত করে দেন। লক্ষ্মণ অস্ত্রহীন অবস্থায় মেঘনাদকে আক্রমণ করতে উদ্যত হলে মেঘনাদ যজ্ঞাগার থেকে বেরিয়ে এসে চাচা বিভীষণকে দেখতে পান এবং চরম বিস্ময় ও ক্ষোভে ফেটে পড়েন।
এই অংশে মূলত দুটি বিপরীত আদর্শ ও নৈতিকতার সংঘর্ষ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে:
দেশপ্রেম বনাম বংশদ্রোহিতা: মেঘনাদের কাছে লঙ্কা কেবল একটি ভৌগোলিক রাজ্য নয়, তাঁর জন্মভূমি, মাতৃভূমি ও অস্তিত্বের প্রতীক। অন্যদিকে, বিভীষণ ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বা তথাকথিত ধর্মযুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার আশায় শত্রুর পক্ষাবলম্বন করেছেন।
মেঘনাদের ক্ষোভ ও অভিমান: মেঘনাদ তীব্র ভাষায় বিভীষণকে স্মরণ করিয়ে দেন যে যিনি নিজের মাতৃভূমি ও ভ্রাতৃপুত্রকে শত্রুর হাতে সঁপে দেন, তাঁর চেয়ে বড় কলঙ্কিত চরিত্র আর কেউ হতে পারে না। তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয় স্বজাতির প্রতি অগাধ ভক্তি ও বিশ্বাসঘাতকের প্রতি ঘৃণা।
অমিত্রাক্ষর ছন্দ (Blank Verse): মধুসূদন দত্তের প্রবর্তিত এই ছন্দে পঙক্তির শেষে মিলের বাধ্যবাধকতা না থাকায় ভাবের প্রকাশ পেয়েছে নাটকীয় ও গতিশীল।
চরিত্রের মহত্ত্ব: লঙ্কার পক্ষে মেঘনাদ খলনায়ক নন, বরং এ কাব্যে তিনি এক ট্র্যাজিক নায়ক—যিনি ধর্ম, নীতি ও মাতৃভূমির টানে বীরের মতো লড়াই করে প্রাণ বিসর্জন দেন।
"উত্তর করিলা কহিত রাক্ষসরাজার অনুজ—" — এই পুরো অংশে পারিবারিক বন্ধন, নৈতিকতার অবক্ষয় এবং দেশপ্রেমের যে দ্বান্দ্বিক রূপ ফুটে উঠেছে, তা বাংলা কাব্য সাহিত্যে চিরভাস্বর হয়ে আছে।