সিনিয়র শিক্ষক
১১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০২ অপরাহ্ণ
কৃষির পরিধি ও পরিসর
ধরনঃ সাধারণ শিক্ষা
শ্রেণিঃ ষষ্ঠ
বিষয়ঃ কৃষি শিক্ষা
অধ্যায়ঃ অধ্যায়-১
বাংলাদেশের কৃষির পরিধি ও পরিসর
ভূমিকা
বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশের মানুষের জীবনযাত্রা, খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, শিল্পের কাঁচামাল এবং গ্রামীণ অর্থনীতি কৃষির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ, উর্বর পলিমাটি, নদ-নদী, মৌসুমি বৃষ্টিপাত ও অনুকূল জলবায়ু কৃষি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কৃষির পরিধি বলতে কৃষির অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন কাজ ও শাখাকে বোঝায়। অন্যদিকে কৃষির পরিসর বলতে কৃষির বিস্তার, উৎপাদনের ক্ষেত্র, অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং মানুষের জীবনে এর প্রভাবকে বোঝায়।
১. বাংলাদেশের কৃষির পরিধি
বাংলাদেশের কৃষির পরিধি ব্যাপক। এটি শুধু ধান বা অন্যান্য ফসল উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
১. শস্য উৎপাদন
ধান, গম, ভুট্টা, পাট, আলু, ডাল, তৈলবীজ, আখ ও বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি উৎপাদন বাংলাদেশের কৃষির প্রধান অংশ।
২. মৎস্য চাষ
পুকুর, নদী, বিল, হাওর, ঘের ও উপকূলীয় জলাশয়ে মাছ চাষ এবং মৎস্যসম্পদ আহরণ করা হয়।
৩. পশুপালন ও পোলট্রি
গরু, ছাগল, ভেড়া, হাঁস ও মুরগি পালন করে দুধ, মাংস, ডিম, চামড়া এবং অন্যান্য পণ্য উৎপাদন করা হয়।
৪. উদ্যান ও ফল চাষ
আম, কাঁঠাল, লিচু, কলা, পেয়ারা, পেঁপে, লেবু, ফুল এবং বিভিন্ন মসলা চাষ করা হয়।
৫. বনায়ন ও কৃষি বনায়ন
বৃক্ষরোপণ, বাঁশ চাষ, কাঠ উৎপাদন এবং ফসলের সঙ্গে উপযোগী গাছ লাগানোর মাধ্যমে পরিবেশ ও জীবিকার উন্নয়ন করা হয়।
৬. কৃষি-সহায়ক কার্যক্রম
বীজ উৎপাদন, সেচ, সার ও বালাই ব্যবস্থাপনা, কৃষিযন্ত্র ব্যবহার, ফসল সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কৃষিপণ্য বিপণনও কৃষির পরিধির অন্তর্ভুক্ত।
২. বাংলাদেশের কৃষির পরিসর
বাংলাদেশের কৃষির পরিসর বোঝার জন্য কৃষিজমি, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও কৃষিপণ্যের বাজার সম্পর্কে আলোচনা করা প্রয়োজন।
ক. কৃষিজমি ও ভূমির ব্যবহার
বাংলাদেশে ধান, গম, পাট, আলু, শাকসবজি, ডাল ও তৈলবীজসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করা হয়। একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে জমির ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব।
বাংলাদেশ কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯–২০২০ সালের ভূমি ব্যবহার জরিপে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৮.২৯ লক্ষ হেক্টর। এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের পরিসংখ্যান, বর্তমান জমির পরিমাণ নয়।
খ. খাদ্য উৎপাদনে কৃষির ভূমিকা
বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য হলো ধান। আউশ, আমন ও বোরো—এই তিন মৌসুমে ধান চাষ হয়। পাশাপাশি গম, ভুট্টা, আলু, ডাল, শাকসবজি ও ফল উৎপাদিত হয়।
কৃষি দেশের মানুষের খাদ্য সরবরাহ করে এবং খাদ্যনিরাপত্তা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
গ. কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র
কৃষি বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবিকার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। কৃষক, কৃষিশ্রমিক, মৎস্যচাষি, পশুপালক, বীজ উৎপাদনকারী, কৃষিপণ্য পরিবহনকারী এবং ব্যবসায়ীরা এই খাতের সঙ্গে যুক্ত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪–২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাব অনুসারে ওই অর্থবছরে কৃষি খাতের জিডিপিতে অবদান ছিল ১০.৯৪ শতাংশ। একই প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, দেশের মোট কর্মশক্তির ৪৬ শতাংশ সরাসরি কৃষিতে নিয়োজিত ছিল।
ঘ. জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষির ভূমিকা
কৃষি দেশের অর্থনীতিতে বিভিন্নভাবে অবদান রাখে:
খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করে।
পাট, চামড়া, আখ ও অন্যান্য শিল্পের কাঁচামাল জোগায়।
কৃষিপণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়তা করে।
গ্রামীণ বাজার ও ব্যবসার প্রসার ঘটায়।
দারিদ্র্য হ্রাস ও গ্রামীণ জীবনযাত্রার উন্নয়নে ভূমিকা রাখে।
ঙ. মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের বিস্তার
বাংলাদেশের কৃষির পরিসরে মাছ, দুধ, মাংস ও ডিম উৎপাদনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। পুকুরে মাছ চাষ, গরু-ছাগল পালন এবং হাঁস-মুরগির খামার খাদ্য সরবরাহ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। এসব কার্যক্রম কৃষকের আয়ের বিকল্প ও পরিপূরক উৎস হিসেবেও কাজ করে।
চ. কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার
বর্তমানে কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন:
1. উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার।
2. কৃষিযন্ত্রের মাধ্যমে জমি চাষ ও ফসল কাটা।
3. আধুনিক সেচব্যবস্থা ও পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি।
4. মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করে সার প্রয়োগ।
5. রোগবালাই শনাক্তকরণ ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা।
6. আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও ডিজিটাল কৃষি পরামর্শ গ্রহণ।
এসব প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার উৎপাদন ব্যয় কমাতে, ফসলের ক্ষতি হ্রাস করতে এবং কৃষকের আয় বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
৩. বাংলাদেশের কৃষির প্রধান সমস্যা
বাংলাদেশের কৃষির পরিসর ব্যাপক হলেও এই খাতের কিছু উল্লেখযোগ্য সমস্যা রয়েছে।
কৃষিজমি কমে যাওয়া ও জমির খণ্ডায়ন।
বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততার প্রভাব।
সার, বীজ, জ্বালানি ও সেচের ব্যয় বৃদ্ধি।
কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য পেতে অসুবিধা।
ফসল সংরক্ষণ ও পরিবহনে সীমাবদ্ধতা।
কৃষিশ্রমিকের সংকট এবং দক্ষতার অভাব।
কৃষিপণ্যের বাজারদরের ওঠানামা।
৪. বাংলাদেশের কৃষির উন্নয়নে করণীয়
1. কৃষিজমি সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার নিশ্চিত করা।
2. জলবায়ু সহনশীল ফসলের জাত ও আধুনিক কৃষিপদ্ধতি সম্প্রসারণ করা।
3. কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ ও কৃষি পরামর্শ দেওয়া।
4. কৃষিপণ্যের সংরক্ষণাগার ও হিমাগার উন্নত করা।
5. কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে বাজারসংযোগ বাড়ানো।
6. মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং সারের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করা।
7. কৃষি গবেষণা, যান্ত্রিকীকরণ ও ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ করা।
উপসংহার
বাংলাদেশের কৃষির পরিধি ফসল উৎপাদন থেকে শুরু করে মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, বনায়ন, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণন পর্যন্ত বিস্তৃত। আর কৃষির পরিসর দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, জাতীয় অর্থনীতি ও গ্রামীণ উন্নয়নে এর ব্যাপক প্রভাবকে নির্দেশ করে। কৃষির বিদ্যমান সমস্যা মোকাবিলা করে আধুনিক, টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশের কৃষি আরও সমৃদ্ধ হবে।