কথাশিল্পী মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘মাসি-পিসি’ গল্পটি গ্রামীণ সমাজের শোষণের বিপরীতে দুই নারীর অস্তিত্ব রক্ষা, আত্মত্যাগ এবং মানবিক প্রতিরোধের এক অনন্য দলিল [১, ২]। গল্পটিতে পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার নির্মমতা এবং তার বিরুদ্ধে দুই সাধারণ নারীর একতাবদ্ধ হয়ে লড়াই করার গল্প ফুটে উঠেছে।
নিচে গল্পটির মূল বক্তব্য ও গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো আলোচনা করা হলো:
১. নারী জাগরণ ও স্বাবলম্বিতা
গল্পের মূল চরিত্র মাসি এবং পিসি—উভয়ই বিধবা এবং নিঃসন্তান। গ্রামীণ সমাজে অসহায় এই দুই নারী লোকলজ্জা এবং সামাজিক বাধা উপেক্ষা করে বেঁচে থাকার জন্য কঠোর পরিশ্রম শুরু করেন। তারা আল্লাদির (তাদের ভাগনি) দায়িত্ব নেন এবং নিজেদের উপার্জনের জন্য শালতি (ছোট নৌকা) চালিয়ে সবজি বিক্রি করার মতো কঠিন পেশা বেছে নেন। লেখক দেখিয়েছেন যে, নারীরা কেবল অন্যের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং পরিস্থিতি এলে তারা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সংসার চালাতে পারে।
২. অবদমিত নারীর নিরাপত্তা ও মাতৃত্বের বন্ধন
আল্লাদি তার অত্যাচারী স্বামী জহ্লাদ ও শ্বশুরবাড়ির নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে মাসি-পিসির আশ্রয় পায়। মাসি-পিসি নিজেরা অভাবের মধ্যে থাকলেও আল্লাদিকে পরম মমতায় আগলে রাখেন। এটি কেবল ভাগনির প্রতি দায়িত্ব ছিল না, বরং তা ছিল এক অবদমিত নারীর প্রতি অন্য দুই নারীর শাশ্বত মাতৃত্ব ও সহমর্মিতার বন্ধন।
৩. পিতৃতান্ত্রিক ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের শোষণ
গল্পে জহ্লাদ (আল্লাদির স্বামী), কানাই চৌকিদার এবং গ্রামের প্রভাবশালী গোকুল—এরা সবাই মিলেই গ্রামীণ শোষক ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার প্রতীক। জহ্লাদ আল্লাদিকে ভালোবাসে না, সে কেবল আল্লাদির মাধ্যমে মাসি-পিসির উপার্জনের টাকা এবং সম্পত্তি গ্রাস করতে চায়। অন্যদিকে, গোকুল কুৎসিত লালসা নিয়ে আল্লাদিকে অপহরণ করার চেষ্টা করে। সমাজ যেখানে এই অসহায় মেয়েটিকে রক্ষা করার কথা, সেখানে সমাজই তাকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়।