প্রভাষক
০৩ জুলাই, ২০২৬ ১০:১৪ পূর্বাহ্ণ
প্রভাষক
ধরনঃ সাধারণ শিক্ষা
শ্রেণিঃ দশম
বিষয়ঃ ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং
অধ্যায়ঃ অধ্যায় ১১
v ব্যাংক হিসাবের প্রকারভেদ (Types of Bank Account):
ব্যাংক একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান যার প্রধান কাজ হলো সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের (যেমন: চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী) কাছ থেকে উদ্বৃত্ত অর্থ ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে সংগ্রহ করা। আর এ কাজটি সঠিকভাবে করার জন্য ব্যাংক বিভিন্ন ধরনের হিসাবের ব্যবস্থা রাখে। নিচে ব্যাংক হিসাবের প্রকারভেদ আলোচনা করা হলো-
(ক) চলতি হিসাব (Current account): যে হিসাবে যতবার খুশি অর্থ জমা ও উত্তোলন করা যায় তাকে চলতি হিসাব বলে। এ হিসাবে টাকা জমা রাখা বাবদ আমানতকারিগণ ব্যাংক থেকে কোনো সুদ পায় না।
১. সাধারণ চলতি হিসাব (General current account): চলতি হিসাব বলতে সাধারণ চলতি হিসাবকে বোঝায়। ব্যাংক চলাকালীন এ হিসাবে যতবার প্রয়োজন অর্থ জমা ও উত্তোলন করা যায়। এ ধরনের হিসাবে কোনো সুদ প্রদান করা হয় না বরং ব্যাংক গ্রাহক থেকে বিভিন্ন চার্জ আদায় করে থাকে।
২. বিশেষ চলতি হিসাব (Special current account): যে সকল গ্রাহক ব্যাংকে চলতি হিসাব খুললেও প্রায়শইব্যাংকে বড় অংকের অর্থ জমা থাকে সেক্ষেত্রে ব্যাংক অর্থ উত্তোলন করা হয়নি এরূপ দিন বা সপ্তাহকে স্বল্পকালীন আমানত হিসেবে গণ্য করে তার ওপর সুদ বা মুনাফা দিতে পারে। এরূপ হিসাধকে বিশেষ চলতি হিসাব বাল। ক্ষেত্রবিশেষ এরূপ হিসাব স্বল্পমেয়াদি আমানত হিসাব বা স্বল্প বিজ্ঞপ্তির আমানত হিসাব নামে পরিচিত।
(খ) সঞ্চয়ী হিসাব (Savings account): যে হিসাবে যাতবার খুশি অর্থ জমা রাখা যায় কিন্তু সপ্তাহে শুধু দুইধার বা নিয়মানুযায়ী অর্থ উত্তোলন করা যায় তাকে সঞ্চয়ী হিসার বলে। সঞ্চয়ী হিসাবের আমানতকারিগণ ব্যাংক থেকে স্বল্পহারে সুদ পেয়ে থাকে। সঞ্চয়ী হিসাবের আমানতকারিগণ সাধারণত ব্যাংক থেকে ঋণের সুবিধা পায় না।
১. গৃহ সঞ্চয়ী হিসাব (Home savings account): যে হিসাবের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের ভেতর সঞ্চয়ের আগ্রহ সৃষ্টি করা হয়ে থাকে, তাকে গৃহ সঞ্চয়ী হিসাব বলা হয় গৃহ সঞ্চয়ী হিসাবে টাকা জমা রাখার জন্য ব্যাংক আমানতকারীর গৃহে সিল করা বাক্স অথবা সিল করা কৌটা সরবরাহ করে থাকে। নির্দিধায় সময় অন্তর ব্যাংক কর্মচারী বাক্স খুলে জমাকৃত অর্থ আমানতকারীর হিসাবে জমা করে থাকে। এ হিসাবের জন্য ব্যাংক স্বল্পহারে সুদ দিয়ে থাকে।
২. স্কুল সঞ্চয়ী হিসাব (School savings account): স্কুলের শিক্ষার্থীদের সঞ্চয়ের প্রবণতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ব্যাংক যে বিশেষ হিসাব খোলার সুযোগ দেয় তাকে স্কুল সঞ্চয়ী হিসাব বলে ছাত্রছাত্রীরা দৈনিক হাত খরচ ও টিফিন বাবদ যে টাকা পেয়ে থাকে তা থেকে সঞ্চয় করে সঞ্চয়সমূহ ব্যাংকে জমা রাখে। এ হিসাবের জন্য ব্যাংক স্বপ্নহারে সুদ দিয়ে থাকে।
৩. শ্রমিক সঞ্চয়ী হিসাব (Labourers savings account): যে হিসাবের মাধ্যমে শিল্পায়লের শ্রমিকদের ভেতর সঞ্চয়ের আগ্রহ সৃষ্টি করা হয়ে থাকে, তাকে শ্রমিক সন্যয়ী হিসাব বলা হয়। শ্রমিক সঞ্চয়ী হিসাবের মাধ্যমে শ্রমিকগণ তাদের ক্ষুদ্র সঞ্চয়সমূহ ব্যাংকে জমা রাখে। এ হিসাবের জন্য ব্যাংক স্বল্পহারে সুদ দিয়ে থাকে।
৪. মহিলা সঞ্চয়ী হিসাব (Female customers savings account): যে হিসাবের মাধ্যমে ব্যাংক শুধু মহিলাদের সঞ্চয়ের সুযোগ প্রদান করে তাকে মহিলা সঞ্চয়ী হিসাব বলে। এরূপ হিসাবের মাধ্যমে সমাজের মহিলাদের বিশেষত পর্দানশিন মহিলাদের ভেতর সঞ্চয়ের আগ্রহ সৃষ্টি করা হয়ে থাকে। মহিলাদের সঞ্চয়ে ও ব্যাংকিং লেনদেনে অভ্যস্থ করার জন্য ব্যাংক এ ধরনের হিসাব খোলার সুযোগ দেয়।
৫. পেনশন সঞ্চয়ী হিসাব (Pension savings account): প্রতিমাসে নির্দিধ্য পরিমাণ টাকা জমা দিয়ে মেয়াদ পর্যন্ত সঞ্চয়ের সূযোগ এবং মেয়াদ শেষে চুক্তি অনুযায়ী তা উত্তোলনের সুযোগ দিয়ে যে বিশেষ ধরনের হিসার খোলা হয়, তাকে পেনশন সঞ্চয়ী হিসাব বলে। নির্ধারিত সময় পর্যন্ত নির্ধারিত পরিমাণ টাকা এ হিসাবে প্রতিমাসে জমা দিতে হয়।
৬. বিমা সঞ্চয়ী হিসাব (Insurance savings account): যে হিসাবে সঞ্চয়ী হিসাবের সুযোগ সুবিধা ছাড়াও জীবন বিমার সুবিধা পাওয়া যায়, তাকে বিমা সঞ্চয়ী হিসাব বলে। এ হিসাবের মালিক নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা সবসময় ব্যাংকে জমা রাখে। উক্ত জমার বিপরীতে প্রাপ্ত সুদ বা মুনাফার কিছু অংশ হতে প্রিমিয়াম বাদ দেওয়ার পর আমানতকারীর নামে জীবন বিমা করা হয় এবং গ্রাহক উক্ত বিমার সুবিধা পায়।
৭. ডাকঘর সঞ্চয়ী হিসাব (Post-office savings account): ডাকঘরে মাত্র দুই টাকা জমা দিয়ে এ জাতীয় হিসাব খোলা যায়। আমাদের দেশে প্রতিটি ডাকঘরে এ জাতীয় হিসাব খোলা যেত। বর্তমানে এ ধরনের হিসাব নেই বললেই চলে।
(গ) স্থায়ী হিসাব (Fixed Account): যে হিসাবে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য টাকা জমা রাখা হয় এবং উক্ত সময়ের মধ্যে সাধারণত টাকা উত্তোলন করা যায় না, তাকে স্থায়ী হিসাব বলে। স্থায়ী হিসাব খোলার সময় একজন আমানতকারীকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে তিনি কত সময়ের জন্য হিসাব খুলবেন। নির্দিষ্ট সময়ের বা মেয়াদের জন্য এ হিসাব খোলা হয় বলে একে মেয়াদি হিসাবও বলা হয়। এ হিসাবে ব্যাংক আমানতকারীকে একটি স্থায়ী আমানতের রসিদ (F.D.R.-Fixed Deposit Receipt) সরবরাহ করে। এ রসিদে আমানতকারীর হিসাব নম্বর, জমাকৃত টাকার পরিমাণ সুদের হার উল্লেখ থাকে। আমানতের মেয়াদ শেষে আমানতকারী উক্ত রসিদ ব্যাংকের কাছে জমা দিয়ে সুদসহ আমানতের সব টাকা তুলতে পারেন। এ হিসাবে সুদ পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদে টাকা জমা রাখা হয় এবং ব্যাংক এর বিপক্ষে কোনে চেক বই সরবরাহ করে না এবং আমানতের মেয়াদ তাই আমরা বলতে পারি, স্থায়ী আমানত হচ্ছে এমন এক ধরনের ব্যাংক হিসাব, যা এককালীন টাকা জমা দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য খোলা হয়।
১. সাধারণ স্থায়ী হিসাব (General fixed account): যে স্থায়ী হিসাবের মেয়াদ ন্যূনতম ১ মাস থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে, তাকে সাধারণ স্থায়ী হিসাব বলে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক আমানতকারীকে একটি স্থায়ী আমানতের রসিদ দিয়ে থাকে। আমানতকারী মেয়াদপূর্তিতে এ রসিদের মাধ্যমে আমানত রাখা টাকা সুদসহ ওঠাতে পারেন। এ হিসাবে সুদের হার সবচেয়ে বেশি।
২. বিশেষ মেয়াদি স্থায়ী হিসাব (Special term fixed account): যে স্থায়ী হিসাব থেকে ৭ দিন বা অন্য কোনে নির্দিষ্ট সময়ের নোটিশের মাধ্যমে জমা রাখা টাকা ওঠানো যায়, তাকে বিশেষ ধরনের স্থায়ী হিসাব বলে। এ ধরনের হিসাবের ক্ষেত্রে ব্যাংক নির্দিষ্ট হারে সুদ দেয়।
(ঘ) বিবিধ হিসাব (Others account): উল্লিখিত হিসাবগুলো ছাড়াও ব্যাংক মক্কেলদের চাহিদা অনুসারে নিম্নোক্ত হিসাবগুলো পরিচালনা করে থাকে-
১ . ঋণ আমানত হিসাব (Loan account): ঋণ প্রদানের সময় ব্যাংক যে হিসাবে মঞ্জুরীকৃত ঋণের অর্থ ক্রেডিট জমা করে তাকে ঋণ আমানতি হিসাব বলে। এ প্রক্রিয়ায় ব্যাংক মক্কেলকে সরাসরি নগদ অর্থ প্রদান না করে মক্কেলদের নামে একটি হিসাব খুলে সে হিসাবে ঋণের অর্থ ক্রেডিট বা জমা করে এবং মক্কেল চেকের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অর্থ উত্তোলন করে।
২. বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব (Foreign currency account): বিদেশে কর্মরত কোনো ব্যক্তি যে হিসাবের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে তার নামে জমা রাখতে পারে তাকে বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব বলে। এরূপ হিসাবকে বৈদেশিক মুদ্র অনিবাসী হিসাবও বলা যায়। এরূপ হিসাব খোলার ক্ষেত্রে বিদেশে অর্থ উপার্জনের বৈধ কাগজপত্র প্রদর্শন করতে হয়।
৩. বৈদেশিক মুদ্রা মেয়াদি হিসাব (Term foreign currency account): বিদেশে কর্মরত কোনো ব্যক্তি যে হিসাবের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা নির্দিষ্ট মেয়াদে জমা রাখতে পারে, তাকে বৈদেশিক মুদ্রা মেয়াদি হিসাব এ হিসাবের আমানতকারিগণ ব্যাংক থেকে সুদ বা মুনাফা প্রাপ্ত হন।
৪. পৌনঃপুনিক হিসাব (Recurring account): যে হিসাবের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বারবার অর্থ জম দেওয়া যায় এবং চুক্তির শর্ত মোতাবেক মেয়াদ শেষে একবারে বা কিস্তিতে অর্থ উঠাতে পারে, তাকে পৌনঃপুনিক হিসাব বলে। এ হিসাবের গ্রাহক মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বে অর্থ উত্তোলন করে না বিধায় সঞ্চয়ী হিসাবের তুলনায় সুদ বেশি পায়।
সর্বোপরি বলা যায়, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের চাহিদা ও প্রয়োজনের আলোকে ব্যাংকগুলো উপরিউর বিভিন্ন ধরনের হিসাবের ব্যবস্থা করেছে। বিভিন্ন রকমের হিসাবের ক্ষেত্রে আমানতকারীদের প্রাপ্য সুযোগ সুবিধাও বিক্রি ধরনের হয়ে থাকে। যার ফলে মক্কেলগণ যেমন ব্যাংকিং সুবিধা পায় তেমনি ব্যাংকের আমানতও বাড়ে।