প্রভাষক
১৮ মে, ২০২৬ ০৯:২১ অপরাহ্ণ
প্রভাষক
ধরনঃ সাধারণ শিক্ষা
শ্রেণিঃ একাদশ
বিষয়ঃ সাহিত্য পাঠ
অধ্যায়ঃ পদ্য
পাঠঃ সোনার তরী - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপক ও দর্শনধর্মী কবিতা। ১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দে (১৩০১ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন মাসে) তিনি যখন পদ্মাবেষ্টিত শিলাইদহ ও পতিসরের জমিদারির দায়িত্ব দেখভাল করছিলেন, তখন সেখানকার বর্ষাকালের প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং তাঁর ভেতরের এক গভীর জীবনোপলব্ধি থেকে এই কবিতাটি রচনা করেন।
নিচে ‘সোনার তরী’ কবিতার মূল প্রেক্ষাপট ও অন্তর্নিহিত দর্শন সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
কবিতাটির পটভূমি গড়ে উঠেছে বর্ষাকালের বাংলার এক চিরচেনা নদীর কূলকে কেন্দ্র করে।
বর্ষার নদী: আকাশে ঘন মেঘ, অবিরাম বৃষ্টি এবং নদীর চারপাশের ক্ষুরধারা স্রোত মিলে এক থমথমে ও প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।
অসহায় কৃষক: নদীর তীরে একটি ছোট ক্ষেতে কৃষক একা বসে আছেন। তাঁর চারদিকের জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে (তীরে তরী লেগে থাকা ছবিটির মতোই)। তিনি পরম যত্নে যে সোনার ধান ফলিয়েছিলেন, তা কেটে নদীর কূলে স্তূপ করে রেখেছেন।
অচেনা মাঝি: এমন সময় নদীতে একটি পাল তোলা নৌকা নিয়ে এক অজানা মাঝি গান গেয়ে এগিয়ে আসে। কৃষক তাকে ডেকে তাঁর সমস্ত ধান নৌকায় তুলে দেন। কিন্তু ধান তোলা শেষ হলে দেখা যায় নৌকায় আর বিন্দুমাত্র জায়গা নেই। ফলে ধান নিয়ে নৌকা চলে যায়, আর শূন্য নদীর তীরে কৃষক একা পড়ে থাকেন।
মহাকালের প্রেক্ষাপটে মানুষের জীবন ও সৃষ্টির সম্পর্ককে এই কবিতার মাধ্যমে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এখানে প্রতিটি চরিত্র ও উপাদান এক একটি গভীর রূপক:
কৃষক ও সোনার ধান: এখানে 'কৃষক' হলেন স্বয়ং কবি বা জগতের সাধারণ মানুষ। আর 'সোনার ধান' হলো মানুষের সারাজীবনের সাধনা, কর্ম বা সৃষ্টি।
মাঝি ও সোনার তরী: 'মাঝি' হলো নিষ্ঠুর ও নির্মম মহাকাল, আর 'তরী' বা নৌকাটি হলো মহাকালের চিরন্তন স্রোত।
মহাকালের শূন্য তীর: মহাকাল মানুষের সৃষ্টিকে বা তার ভালো কর্মকে সাদরে গ্রহণ করে ঠিকই, কিন্তু রক্তমাংসের নশ্বর মানুষকে মনে রাখে না। সৃষ্টির স্থান মহাকালের সোনার তরীতে হলেও, স্রষ্টার সেখানে কোনো জায়গা হয় না।
সংক্ষেপে মূল কথা: মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু তার সৃষ্টি বা কর্ম অমর। প্রকৃতির এই অমোঘ সত্য এবং স্রষ্টার নিঃসঙ্গতার করুণ আকূতিই ‘সোনার তরী’ কবিতার মূল চালিকাশক্তি ও প্রেক্ষাপট।