Loading..

পাঠসংশ্লিষ্ট ছবি/ইমেজ

রিসেট

২৫ জুলাই, ২০২৫ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

বর্তমান বাংলাদেশের উন্নতিতে প্রযুক্তির প্রভাব।

ডিজিটাল বাংলাদেশ: সম্ভাবনা, সাফল্য ও সংকটের যুগে প্রযুক্তির প্রভাব

 

মনিরুল হক,

বাংলাদেশে গত এক দশকে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যাপক অগ্রসরতা ও এর বহুমাত্রিক প্রভাব আমাদের সমাজ, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দৈনন্দিন জীবনকে আমূল বদলে দিয়েছে। 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' ধারণা বাস্তবায়নের পথে প্রযুক্তিনির্ভর এক নতুন বাংলাদেশ দেখছে বিশ্বতবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি কিছু তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জও স্পষ্ট হয়ে উঠছে

 

ডিজিটাল প্রযুক্তির ইতিবাচক প্রভাবঃ

কর্মসংস্থান ও অর্থনীতি

  • ই-কমার্স, ফ্রিলান্সিং ও আইটি সেবা:
    বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ২০ লাখ মানুষ তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থানে যুক্ত রয়েছেন। বিশেষত তরুণ সমাজ ফ্রিল্যান্সিং থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। ২০২৫ সালের মধ্যে প্রযুক্তি খাত থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার

  • অটোমেশন ও অফিস ব্যবস্থাপনা:
    কলকারখানার অটোমেশন, অফিসে ডেটাবেজ ম্যানেজমেন্ট, ডিজিটাল প্রশাসনএসবের মাধ্যমে দেশের উৎপাদনশীলতা ক্রমবর্ধমান

সামাজিক যোগাযোগ ও উদ্ভাবন

  • দূরত্ব কমানো ও তথ্যের প্রবাহ:
    ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রামসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষের যোগাযোগ সহজ ও গতিশীল করেছে। তরুণদের উদ্যোগ বাড়ছে, নতুন উদ্যোক্তার উন্মেষ ঘটছে

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য

  • অনলাইন শিক্ষা ও টেলিমেডিসিন:
    কভিড-১৯ সময়ে অনলাইন ক্লাস এবং ডিজিটাল লাইব্রেরি শিক্ষাকে সহজ ও সবার নাগালে নিয়ে এসেছে। পাশাপাশি টেলিমেডিসিন চালু হওয়ায় ঘরে বসেই চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে

প্রশাসনিক ও সেবা

  • ই-গভর্নেন্স:
    অনলাইনে ই-পাসপোর্ট, ট্যাক্স প্রদানসহ সরকারি অনেক সেবা মানুষ ঘরে বসেই পাচ্ছেন, যা সেবাগ্রহীতার সময় ও ভোগান্তি কমিয়েছে

ব্যবসা-বাণিজ্য

  • ডিজিটাল মার্কেটিং ও অনলাইন লেনদেন:
    দেশি ও আন্তর্জাতিক ই-কমার্স ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পণ্যবিনিময়, বিকাশ/নগদের মতো ডিজিটাল পেমেন্টে লেনদেন একদম সহজ ও দ্রুত হয়েছে

 

ডিজিটাল প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাবঃ

 

সামাজিক ও মানসিক সমস্যা

  • নেশাসম্পর্কিত আসক্তি:
    স্মার্টফোন, ল্যাপটপের অতিরিক্ত ব্যবহারে বিশেষত তরুণ ও কিশোরদের মধ্যে আসক্তি, মানসিক চাপ, উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, নিঃসঙ্গতা ও সৃজনশীলতাহীনতা বেড়েছে

  • শারীরিক স্বাস্থ্যহানি:
    দিনের বেশিরভাগ সময় বসে থাকার কারণে কমে যাচ্ছে শরীরচর্চা, বাড়ছে স্থূলতা, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা প্রভৃতি

শিশু-কিশোরদের ঝুঁকি

  • শিশুদের প্রযুক্তি আসক্তি ও অপরাধপ্রবণতা:
    শিশুদের মধ্যে বিনোদন বা গেমিংয়ের নামে প্রযুক্তি আসক্তি, অপ্রাসঙ্গিক ও ক্ষতিকর কনটেন্টে প্রবেশ, পর্নো বা জুয়াসাইটের প্রতি আকর্ষণ; এসব থেকে সামাজিক অপরাধও বাড়ছে

পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধে পরিবর্তনঃ

  • সম্পর্কে দূরত্ব:
    পরিবারে একে অপরের সঙ্গে সরাসরি মিথস্ক্রিয়া কমে যাচ্ছে; মোবাইল ডিভাইস সবার অংশ হয়ে উঠেছে, যা আত্মীয়তার বন্ধন শিথিল করছে

শিক্ষা ও দক্ষতা

  • অতিরিক্ত ইন্টারনেট ক্লাসের নেতিবাচকতা:
    অনলাইন ক্লাসে পড়াশোনার পরিবর্তে গেমিং/বিনোদন কনটেন্টে বেশি সময় ব্যয় হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের মনোযোগ-ইচ্ছা কমে যাচ্ছে

সামাজিক অপরাধ ও নিরাপত্তা

  • গোপনীয়তা–নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সাইবার অপরাধ:
    ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস, সাইবার বুলিং, ডিজিটাল ফ্রড, অনলাইন জুয়াএসবের বিস্তার সমাজে নানা সামাজিক বিপর্যয় সৃষ্টি করছে

ডিজিটাল বিভাজন

  • শহর-গ্রামের ব্যবধান:
    প্রযুক্তি ব্যবহারে শহরের চেয়ে গ্রামে এখনো পিছিয়ে পড়ে আছে। ফলে ডিজিটাল বিভাজন ব্যাপক হচ্ছে

ভবিষ্যৎ ও করণীয়

বাংলাদেশ এখন প্রযুক্তি-কেন্দ্রিক স্মার্ট বাংলাদেশের দিকে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, ব্লকচেইন, বিগডেটার ব্যবহার যেমন নতুন দিগন্ত খুলে দেবে, তেমনি এর দ্বারা আসা ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জও নানামাত্রিক হবে
তাই:

  • প্রযুক্তির প্রচলিত ও সম্ভাব্য নেতিবাচক দিক সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা

  • শহর-গ্রাম ডিজিটাল বিভাজন কমানোর লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া

  • দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন ও যুগোপযোগী শিক্ষা

  • সাইবার নিরাপত্তা, তথ্যের গোপনীয়তার প্রতি সতর্কতা নিশ্চিত করা

  • পরিবার, শিক্ষক ও সমাজকে প্রযুক্তির স্বাস্থ্যকর ব্যবহারে উদ্বুদ্ধকরণ জরুরি

 

ডিজিটাল প্রযুক্তির ইতিবাচক পথে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা সামনে নিয়ে এসেছে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত বৈপ্লবিক রূপান্তর। একই সঙ্গে বয়ে এনেছে নানা জটিলতা ও চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ যখন প্রযুক্তিতে বিশ্বে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করছে, তখন এই অগ্রগতিকে টেকসই ও নিরাপদ করতে আমাদের চাই প্রযুক্তি-সচেতন, দক্ষ, নৈতিক ও মানবিক সমাজ। ডিজিটাল প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করাই হবে আগামীর সত্যিকারের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’-এর পথ

 

মোঃ মনিরুল হক

সহকারী শিক্ষক, ইংরেজি

আমলাবাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়

খোকসা, কুষ্টিয়া।

মোবাঃ ০১৭২২ ২৭৩২৭২

মন্তব্য করুন

সম্পর্কিত পোস্ট