সহকারী শিক্ষক
২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ ০৫:৩৮ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
আউটসোর্সিং(Outsourcing) একটি ইংরেজি শব্দ। আউটসোর্সিং এর ধারণাটি এসেছে অ্যামেরিকান শব্দ outside resourcing থেকে। প্রায় ৩০ বছর পূর্ব থেকেই Outsourcing বা Outsourc শব্দটি ব্যবহার হয়ে আসছে।
আউটসোর্সিং হল এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কোন কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান তাদের কাজ সম্পাদনের জন্য সরাসরি কর্মী নিয়োগ না দিয়ে বাইরের কর্মীর মাধ্যমে চুক্তিভিত্তিক কাজ সম্পাদন করে থাকে। একটু পরিষ্কার করে বোঝাতে গেলে, কোন প্রতিষ্ঠান যখন তাদের কোন নির্দিষ্ট কাজ করার জন্য চুক্তিভিত্তিক কাউকে হায়ার করে শুধু ঐ কাজটি সমাপদন করে থাকে। বিনিময়ে তাকে চুক্তি অইনুযায়ী শুধু ঐ কাজের জন্য পাওনা পরিশোধ করে থেকে। এবং যে কর্মী ঐ প্রতিষ্ঠানের নিজের কর্মচারী না।
Investopedia.com এর দেওয়া সংজ্ঞায় বলা হয়, “Outsourcing is the business practice of hiring a party outside a company to perform services and create goods that traditionally were performed in-house by the company's own employees and staff. Outsourcing is a practice usually undertaken by companies as a cost-cutting measure.”
একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টা আরো স্বচ্ছ হয়ে যাবে। আমরা যখন আমাদের ফোনের কোন সমস্যায় কল সেন্টারে ফোন দিয়ে থাকি, তখন ফোনের মাধ্যমে আমাদের যে কর্মীরা সমধান দিয়ে থাকে তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তৃতীয় পক্ষ কোন কোম্পানির লোক হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে ঐ ফোন কোম্পানি আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে অন্য কোম্পানির কর্মী দিয়ে কাজগুলি করিয়ে নিচ্ছে।
সতরাং এটাই প্রমাণিত হল যে, কোন কোম্পানির কাজ বাইরেরে কাউকে দিয়ে চুক্তিভিত্তিক সম্পন্ন করার পদ্ধতিই হল আউটসোর্সিং। যার মাধ্যমে দূরবর্তী কোন স্থানের চুক্তিভিত্তিক কর্মীর কাজ করিয়ে নেওয়া হয়।
ফ্রিল্যান্সিং (Freelancing) একটি ইংরেজি শব্দ। যার অর্থ মুক্তপেশা। ১৮১৯ সালে প্রথম freelancer শব্দটি Walter Scoot এর বইতে প্রকাশিত হয়। ফ্রিল্যান্সিং হল এমন একটি পেশা যার মাধ্যমে কোন ব্যক্তি নির্দিষ্ট কোন কোম্পানি বা প্রতিষ্টানের চাকুরী না করে চুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন কোম্পানির কাজ করে থাকে। একজন ফ্রিল্যান্সার একই সাথে একাধিক কোম্পানির কাজ করতে পারে বা করে থাকেন। এতে করে নির্দিষ্ট বা ধরা বাধা সময় নিয়ে অফিসে যাওয়া এবং ধরা বাধা সময় নিয়ে অফিস ডিউটি করতে হয় না।
বিশ্বব্যাপী ফ্রিল্যান্সিং শুরু হিয়েছিল ১৯৯৮ সালের দিকে। ১৯৯৯ সালেই প্রথম ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস খোলা হয়েছিল। বর্তমানে সারা বিশ্বে প্রায় ১০০০ এর উপর ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস আছে। আরো মজার বিষয় হল এত্ বড় সংখ্যক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস থাকা সত্ত্বেও সব ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসেই ফ্রিল্যান্সার ও আউটসোর্সিং কোম্পানি দুটিই বিদ্যমান। বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস হলঃ upwork.com, fiverr.com, 99designs.com, freelancer.com, guru.com, peopleperhour.com ইত্যাদি।
কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ২০০০ সালের দিকে ফ্রিল্যান্সিং শুরু সম্ভব হয় নাই ইন্টারনেটের দুষ্প্রাপ্যতার কারনে। ২০০৪/৫ সালের দিকে বাংলাদেশে মোটামোটিভাবে ফ্রিল্যান্সিং এর সূচনা হয়। অতঃপর দিন দিন ফ্রিল্যান্সিং পেশা বেশ জনপ্রিয় হতে শুরু হয়। এরপর ২০১০ সালের শেষের দিকে বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিং শব্দটি আরো বিস্তার লাভ করে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলতে গেলে, ২০১১ সালের মার্চ মাসে মাত্র ৫ ডলারের একটি কাজের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল odesk.com এ কাজ শুরু। যেটি এখন upwork.com নামে পরিবর্তিত হয়েছে।
পরবর্তীতে সরকারের বিভিন্ন সহযোগিতামূলক প্রকল্পের মাধ্যমে দিন দিন তরুণ তরুণীদের মধ্যে ফ্রিল্যান্সিং এর বিষয়ে আগ্রহ বাড়ানোর জন্য কাজ করা হয়। এবং এই সকল প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীদের মধ্যে ফ্রিল্যান্সিং এর বিভিন্ন ট্রেইনিং ও ইন্টারনির ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। যার মাধ্যমে একদিকে যেমন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয় অন্যদিকে আসতে থাকে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা।
২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে, দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি টাকার উপরে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয় ফ্রিল্যান্সিং পেশার মাধ্যমে। অর্থাৎ বছরে সেখানে প্রায় ৩৭০ কোটি টাকা অর্জন করেন ফ্রিল্যান্সারা।
কিন্তু বর্তমানে এই উপার্জন কততে দাঁড়িয়েছে? নিশ্চই এই প্রশ্নটি এখন মাথেয় ঘুর পাক খাচ্ছে? বাংলাদেশ আইসিটি ডিভিশনের দেওয়া সবশেষ তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রায় ৫০০,০০০ ফ্রিল্যান্সার আছে এবং এদের বাৎসরিক উপার্জন প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ এসোসিয়েশিন অফ সফটওয়ার এণ্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস(ব্যাসিস) এবং সরকারের উদ্যেগে ফ্রিল্যান্সিং এ্যাওয়ার্ড ও চাকুরী মেলা নামে মেলার আয়োজন করা হয়। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রতি বছর এই মেলার আয়োজন করার ফলে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ছাত্রছাত্রীরা ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পারে এবং আগ্রহ বাড়তেই থাকে। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও এই মেলা থেকে ফ্রিল্যান্সিং এর বিষয়ে বিশদ জানতে পারছিলাম। এবং এই সকল উৎসাহমূলক প্রোগ্রামের মাধ্যমে আমার মত অনেকই ফ্রিল্যান্সার হতে পেরেছেন বা হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পেরেছেন।
২০১৪ সালের পর থেকে সরকার ফ্রিল্যান্সিং এর উপর আরো গুরুত্ব দিতে থাকে এবং বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে বেকারত্ব নিরসনে কাজ করেন। সংবাদপত্র, টেলিভিশন চ্যানেল ও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে দিন দিন ফ্রিল্যান্সিংকে বাংলাদেশের সর্বত্র পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ শুরু করেন।
কভিড-১৯ এর প্রেক্ষাপটে ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস ও ফ্রিল্যান্সেরদের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাব হয়ে গেলেও আস্তে আস্তে পরিস্থিতি পরিবর্তনের সাথে সাথেই দুঃসময় কাটিয়ে আবার ভালো অবস্থায় চলে আসছে প্রায়।
সবশেষে ফ্রিল্যান্সিং এর বাংলাদেশের ভবিষ্যত বলতে গেলে, একটি কথা স্পষ্ট করেই বলা যায় বাংলাদেশের পরবর্তী অন্যতম আর্থিক খাত হবে ফ্রিল্যান্সিং।
ফ্রিল্যান্সিং এর নিয়মিত বিভিন্ন কাজ শিখতে আমার ইউটিউব চ্যানেল দেখে আসতে পারেন। https://www.youtube.com/@E2SoftSolution
এস এম হাসিবুল ইসলাম
সহকারী শিক্ষক (আইসিটি)
আলিকদম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ