সহকারী প্রধান শিক্ষক
১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ
সহকারী প্রধান শিক্ষক
সংগ্রাম অনলাইন ডেস্ক: সৃষ্টি জগতে পশু-পাখির মতো মানুষের স্বভাবের মধ্যেও একটি পাশবিক সত্তা রয়েছে এবং মানব-প্রকৃতির এই পাশবিক সত্তার বিকাশ পশু-পাখি ও জীব-জানোয়ারের মতই প্রাকৃতিক নিয়মে আপনা-আপনি হয়ে থাকে। পশু প্রবৃত্তি অর্জন করার জন্য কাউকেই কোন কষ্ট করতে হয় না; পশুত্ব বিনা পরিশ্রমেই অর্জন করা যায়। কিন্তু মানব শিশুকে যথার্থ ‘মানুষে’ পরিণত হতে হলে শিক্ষা গ্রহণ করতে হয় এবং এজন্য তাকে রীতিমত অনেক চেষ্টা-সাধনা করতে হয়।
মানুষ কোন পশুর নাম নয়। অন্যান্য জীব-জানোয়ার ও পশু-পাখির তুলনায় সৃষ্টিকর্তা মানুষকে বিশেষত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। বলাবাহুল্য সৃষ্টি জগতের অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় মানুষের বিশেষত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব হল তার মনুষ্যত্বের কারণে। আর মানব শিশুকে এই মনুষ্যত্ব রীতিমত অর্জন করতে হয়। মনুষ্যত্ব হচ্ছে মানব-প্রকৃতিতে সুপ্তাবস্থায় বিদ্যমান মৌলিক মানবীয় ও সৎ গুণাবলী, তার বিবেকবোধ ও জীবনবোধ এবং তার সুকুমারবৃত্তি ও সৃজনশীলতা। এ সবের যথার্থ বিকাশের উপরই মানব সন্তানের মুনষ্যত্ব অর্জন নির্ভর করে।
আমরা দেখি মানব সন্তানকে তার জীবিকা অর্জন বা রুটি-রুজির জন্যও ব্যাপক কর্মমুখী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হয়, যার দৃষ্টান্ত পশুদের মধ্যে দেখা যায় না। একজন মানুষ তার জীবিকা নির্বাহের জন্য কোন্ ধরনের পেশাকে বেছে নিবে তা তার জীবনের কৈশোর কাল থেকেই নির্ধারণ করে নিতে হয় এবং সে অনুযায়ীই তাকে পড়া-শোনা ও অধ্যয়ন করতে হয় এবং হাতে-কলমে শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়। এই দৃষ্টান্ত পশুদের মধ্যে দেখা যায় না। পশুরা বনে-বাদারে ঘুরে-ফিরে কিংবা অন্যের কাছ থেকে কেড়ে-কুড়ে, নিজের হিংস্র নখ ও দাঁত দিয়ে অপরকে হত্যা করে নিজেদের উদর পূর্তি করে থাকে। কিন্তু জীবিকা নির্বাহের এই পন্থা মানুষের জন্য শোভনীয় নয়; কেননা তাতে মনুষ্যত্বের অবমাননা হয়। অবশ্য মানুষের মধ্যেও কিছু কিছু মানুষকে দেখা যায়, যারা পশুদের মতই জোর করে অন্যের সম্পদ কেড়ে নেয়, চুরি-ডাকাতি, খুন-খারাবি করে কিংবা অন্য কোন অসৎ উপায়ে অন্যের সম্পদ কেড়ে নিয়ে নিজের উদর পূর্তি করে কিংবা সম্পদের পাহাড় গড়ে থাকে। কিন্তু এ ধরনের মানুষকে মানব সমাজের অন্য সকল মানুষই ঘৃণা করে থাকে এবং মনুষ্য সমাজে তারা ইতর বা মানুষরূপী পশু হিসেবেই পরিগণিত হয়।
সৃষ্টিকুলের মধ্যে মানুষের রয়েছে বিশেষ মর্যাদা। মানুষের থাকা, খাওয়া, জীবন-যাপণ সবই পশুদের তুলনায় উন্নত ও মর্যাদা সম্পন্ন। এ কারণেই পশু-পাখিকে খাদ্য সংগ্রহ ও জীবীকা সংগ্রহের জন্য বিশেষ কোন শিক্ষা-দীক্ষা ও মূল্যবোধের প্রয়োজন না হলেও মানুষকে তার জীবিকা অর্জনের ক্ষেত্রে তার মনুষ্যত্বের মর্যাদা ও আভিজাত্য বজায় রাখতে হয় এবং এজন্য বিশেষ ভাবে শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়।
আবার মানুষ শুধু খেয়ে-পড়েই সন্তুষ্ট থাকতে পারে না, সে জীবন ও জগৎ সম্পর্কে নানা কৌতুহল বোধ করে, তার মনের মধ্যে নানা প্রশ্ন এসে ভীড় করে। কারণ মানুষ একটি বুদ্ধিমান সত্তা। এ কারণে জীবন ও জগতের রহস্য সে উন্মোচন করতে চায়, জানতে চায়, বুঝতে চায়। এসব কারণে শুধুমাত্র কর্মমুখী শিক্ষাতেও মানুষ সন্তুষ্ট নয়, জগতের নানা বিষয়ের জ্ঞান-বিজ্ঞানও তাকে আয়ত্বে করতে হয়।
আবার মানুষ কেবলমাত্র বুদ্ধিমান প্রাণীই নয়, তার একটি নৈতিক ও সামাজিক সত্তাও রয়েছে। সে সমাজবদ্ধ হয়ে বাস করতে ভালোবাসে এবং সমাজ ও মানুষের প্রতি একটি দায়বদ্ধতাও সে অনুভব করে। এ কারণে মানব সন্তানকে তার নিজস্ব সমাজ, সংস্কৃতি ও ধর্ম সম্পর্কেও জানতে হয় এবং নিজ সমাজ ও রাষ্ট্রের একজন আদর্শ, সৎ ও যোগ্য সদস্য ও নাগরিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার একটি তাড়নাও সে অনুভব করে।
এভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে মানব শিশুকে যথার্থ মানুষ হয়ে উঠতে হলে তাকে অনেক কিছু জানতে ও বুঝতে হয় এবং নিজের ভবিষ্যত জীবনকে সুন্দর করার লক্ষে জীবনের একটি বিরাট সময় পর্যন্ত তাকে জ্ঞান অর্জন ও আত্মগঠনের কঠোর সাধনা ও অধ্যবসায়ে নিয়োজিত থাকতে হয়। বলাবাহুল্য, এই কঠোর অধ্যবসায় ও সাধনার মাধ্যমে সত্যিকার মানুষ হয়ে ওঠার মধ্যেই মানব সত্তার শ্রেষ্ঠত্ব এবং তার বিশেষত্ব ও সার্থকতা নিহিত।
শিক্ষা তাৎপর্য সম্পর্কে মনীষীদের বাণী:
সক্রেটিস বলেন- ‘মিথ্যার অপনোদন ও সত্যের আবিষ্কারই হলো শিক্ষা।’
এরিস্টটলের ভাষায়-‘দেহ-মনের সুষম ও পরিপূর্ণ বিকাশের মাধ্যমে ব্যক্তিজীবনের প্রকৃত মাধুর্য ও চরম সত্যে উপনীত হওয়ার কৌশলই হল শিক্ষা।’
প্লেটোর মতে, ‘শিশুর দেহ-মনের পরিপূর্ণ ও সার্বিক বিকাশ সাধনই হলো শিক্ষা।’
এফ. ফ্রয়েবল বলেন-‘সুন্দর, বিশ^স্ত ও পবিত্র জীবনের উপলব্ধিই হলো শিক্ষা।
হোয়াইটহেড এর মতে-‘জ্ঞান অর্জন ও অভিজ্ঞতার সুষ্ঠু ব্যবহারের কলাকৌশল আয়ত্ত করার নামই হলো শিক্ষা।’
ফেডারিক হার্বাট বলেন-‘শিক্ষা হলো মানুষের বহুমুখি প্রতিভা ও অনুরাগের সুষম প্রকাশ এবং নৈতিক চরিত্রের পরিপূর্ণ গঠন।’
হার্বাট স্পেন্সাররের মতে, ‘পরিপূর্ণ জীবন বিকাশই হলো শিক্ষা।
থম্পসন বলেন-‘শিক্ষা হলো মানুষের আচরণের উপর পরিবেশ ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব, যা তার স্বভাবের মধ্যে একটি স্থায়ী পরিবর্তনের সূচনা করে।’
জন মিলটন বলেন-‘দেহ, মন ও আত্মার সুসমন্বিত উন্নয়নই শিক্ষা।’
শিক্ষার সুবিধা
বলা হয়, শিক্ষাই জাতির মেরুদ-। মেরুদ- ছাড়া যেমন মানুষ সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, তেমনি শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি উন্নত করতে পারে না, মর্যাদার আসন লাভ করতে পারে না। মানব জীবনে শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধির জন্য আমরা প্রথমে এর সুবিধা বা উপকার গুলো নিয়ে সংক্ষেপে আলোকপাত করতে পারি। শিক্ষা গ্রহণ করলে আমরা নি¤œলিখিত সুনির্দিষ্ট সুবিধাগুলো পেয়ে থাকি।
শিক্ষার সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হলো, এটি মানুষকে যথার্থ জীবনবোধ লাভ করতে এবং মানব সন্তানকে সত্যিকার মনুষ্যত্ববোধে উদ্বুদ্ধ হতে সাহায্য করে।
শিক্ষা মানব জীবনে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন বয়ে আনে। এটি একজন ব্যক্তির জ্ঞান, দক্ষতা এবং বুদ্ধিকে জোরদার করে এবং তাকে একটি সফল জীবন পরিচালনা করতে সক্ষম করে তোলে।
আমাদের দেশের বেকারত্বের সমস্যা দূর করার জন্য শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া কারিগরি ও প্রযুক্তি শিল্প, ব্যবসায়-বাণিজ্য উন্নতি করার জন্য এবং আমাদের দেশের সমৃদ্ধি অর্জনের জন্যও এটি অপরিহার্য। এছাড়া, সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি কারিগরি বা কর্মমুখি শিক্ষার প্রসার ঘটানোও অত্যন্ত প্রয়োজন।
শিক্ষা মানুষকে পরিশোধিত বা পরিশিলীত, সুরুচিসম্পন্ন, ন¤্র, ভদ্র ও বিনয়ী করে তোলে। এটি আমাদেরকে সচেতন করে তোলে এবং আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে বিস্তৃত করে। শিক্ষা আমাদেরকে নিজেদের সম্পর্কে যেমন অধিক আত্মসচেতন করে, তেমনি সমাজ সম্পর্কে এবং আমাদের চারপাশের সেসব বিষয় সম্পর্কেও অধিক সচেতন হতে সাহায্য করে যেগুলো আমাদের জীবনকে প্রভাবিত করে ।
শিক্ষা আমাদেরকে সুশৃংখল জীবন-যাপনে সাহায্য করে এবং যারাই জীবনে সফল হতে চায় তাদের জন্য ডিসিপ্লিন্ড বা সুশৃংখল হওয়া অপরিহার্য।
শিক্ষিত ব্যক্তি অন্যকে সম্মান দিতে জানেন এবং নিজেও সমাজে সম্মান লাভ করেন।
শিক্ষা আমাদেরকে জীবিকা উপার্জনে- ভালো কর্মসংস্থান লাভে সক্ষম করে তোলে এবং স্বনির্ভর হতে সাহায্য করে। জীবন-যাপনের জন্য আমাদের অর্থ প্রয়োজন। বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে পাল্লা দিয়ে আমাদের চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার মত জীবনের মৌলিক চাহিদা গুলোর পাশাপাশি বিনোদন, যোগাযোগ ও আরামদায়ক জীবন যাপনের জন্য টেলিভিশন, স্মার্ট ফোন, এয়ার কন্ডিশনার, গাড়ী ইত্যাদিও প্রয়োজন। একটি পরিপূর্ণ এবং ফলপ্রসূ ক্যারিয়ার সন্তোষজনক জীবনযাপনকে নিশ্চিত করে।
আমরা দ্রুত বর্ধনশীল তথ্যপ্রযুক্তি ও ইন্টারনেট ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার যোগ্যতা অর্জন করতে পারবো।
আমাদের দেশে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত সকল শিক্ষার্থীই বিনা মূল্যে সাধারণ শিক্ষা গ্রহণ করার সুযোগ পায়, যার মাধ্যমে তারা নিজ দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং ভূগোল সম্পর্কে ভালোভাবে জানর পাশাপাশি নিজ নিজ ঝোক-প্রবণতা অনুযায়ী বিজ্ঞান ও ব্যবসায়-বাণিজ্য সম্পর্কেও ধারণা লাভ ও অধ্যয়নের সুযোগ পায়। এরপর অবশ্য উচ্চতর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভের জন্য তাদেরকে সুনির্দিষ্ট কোনো বিষয় বেছে নিতে হয়। এছাড়া দক্ষতা ভিত্তিক প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ গ্রহণেরও সুযোগ রয়েছে। এজন্য সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে বহু প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
সূত্র- ছাত্রজীবন: সাফল্যের শর্তাবলী