সিনিয়র শিক্ষক
০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ ০৩:৪৩ অপরাহ্ণ
সিনিয়র শিক্ষক
‘খুব বিপদে আছি ভাই, কোনো ফার্মেসিতে স্যালাইন নাই’
রাজধানীর উত্তরা আধুনিক মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত
স্ত্রীকে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করেছেন মাহবুব জুয়েল। গত কয়েক দিনে তার রক্তের প্লাটিলেট
ওঠা-নামা করছে আশঙ্কাজনকভাবে। কোনোদিন প্লাটিলেট এক লাখ তো কোনোদিন নেমে আসছে ৮০ হাজারে।
আবার উঠছে এক লাখ ২০ হাজারে। এমন অবস্থায় রক্তদাতা প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি চিকিৎসকরা
রোগীকে নরমাল স্যালাইন দেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু হাসপাতালের আশপাশে তো দূরে থাক, পুরো
উত্তরা এলাকা ঘুরেও একটি স্যালাইন খুঁজে না পেয়ে দিশেহারা হয়ে মঙ্গলবার ভোরে বাংলামোটর
এলাকায় বসবাসকারী এক সহকর্মীকে ক্ষুদে বার্তা পাঠান। এতে বলেন, ‘ডাক্তার বলেছে তোমার
ভাবির জন্য নরমাল স্যালাইন লাগবে (ইন্টারভেনাস ইনফিউশন)। কিন্তু ফার্মেসিগুলোতে পাচ্ছি
না। কোনো কোনো ফার্মেসিতে থাকলেও দিতে চায় না। খুব বিপদে আছি রে ভাই।’
একই রকম আকুতি নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একটি
ডেঙ্গু ওয়ার্ডে এসেছেন পুরান ঢাকার বাসিন্দা কুতুব উদ্দিন (ছদ্মনাম)। ডেঙ্গু আক্রান্ত
স্ত্রীর জন্য স্যালাইন লাগবে। চিকিৎসকের পরামর্শমতো বাসাতেই চিকিৎসা নিলেও বাড়ির আশেপাশের
কোনো ফার্মেসিতে পাননি নরমাল স্যালাইনের একটি প্যাকেটও। এক বন্ধুর কাছে শুনেছেন ঢাকা
মেডিক্যালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে এটির পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। তাই একটি স্যালাইনের প্যাকেট
যদি পাওয়া যায় এক ওয়ার্ড থেকে আরেক ওয়ার্ডে দিশেহারা অবস্থায় ঘুরছেন। কিন্তু সরকারি
হাসপাতালের কোনো ওষুধ যে হাসপাতালের বাইরে নেওয়ার নিয়ম নেই সেটিই তার অজানা। তাই খালি
হাতেই ফিরতে হয়েছে তাকে।
শুধু মাহবুব জুয়েল বা কুতুব উদ্দিন নন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি
তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশের ফার্মেসিগুলোতে দেখা দেয় এর চিকিৎসায় জরুরিভাবে ব্যবহৃত
নরমাল স্যালাইনের। যদিও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে স্যালাইনের
কোনো সংকট নেই। কিন্তু বাজারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরকারি হাসপাতালগুলোতে সরবরাহ
কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর স্বজনদের একটি স্যালাইন
জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর পানিশূন্যতা ও রক্তের ঘনত্ব স্বাভাবিক
রাখতে তাদের শিরায় স্যালাইন দিতে হয়। আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় স্যালাইনের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। এর ফলে
এই পণ্যটির সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষত রাজধানীর ফার্মেসিগুলোতে কৃত্রিম সংকটও তৈরি করা
হয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়।
সরেজমিন রাজধানীর শাহবাগ, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ এলাকা
ও মগবাজারের বিভিন্ন ফার্মেসি ঘুরে স্যালাইনের তীব্র সংকটের চিত্র দেখা গেছে। বিক্রেতাদের
দাবি, গত দুই সপ্তাহ ধরে তাদের কাছে স্যালাইনের সরবরাহ নেই। তবে বিভিন্ন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, বাজারে স্যালাইনের
সংকট থাকলেও হাসপাতালে কোনো সংকট নেই। মগবাজারের নয়াটোলার মেখলা ফার্মেসির স্বত্বাধিকারী
মিঠু বলেন, ডেঙ্গু যেদিন থেকে বাড়তে শুরু করে, সেদিন থেকেই স্যালাইন পাচ্ছি না। কাস্টমার
মনে করে আমাদের কাছে স্যালাইন মজুত রেখে না করছি। কিন্তু এতে আমাদের লাভ কী? বেচলে
তো আমাদেরই লাভ।
একশ’ টাকা দামের এই স্যালাইনটির দাম ৩০০ টাকা দাবি করেন
রাজধানীর শাহবাগের নিউ মডেল ফার্মেসির বিক্রেতা। কেন এই বাড়তি দামÑ জানতে চাইলে বলেন, আমরা তো কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে স্যালাইন
কম পাচ্ছি। যে কয়টা পাচ্ছি সেগুলো আমাদেরও বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে। ব্যবসার ক্ষতি করে
তো আর বিক্রি করা যাবে না। তাই না?
তবে সরকারি হাসপাতালে স্যালাইনের সংকট নেই জানিয়ে ঢাকা
মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার নাজমুল হক বলেন, আমাদের এখন প্রতি মাসে
এক লাখ ব্যাগ স্যালাইন লাগে। ডেঙ্গু আসার পর থেকে ৪০-৪৫ হাজার ব্যাগ বেশি লাগছে। অর্থাৎ প্রতিদিন রোগীভেদে
স্যালাইন প্রয়োজন হচ্ছে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার ব্যাগ। এখন পর্যন্ত হাসপাতালে স্যালাইনের
কোনো সংকট নেই। রোগীদের প্রয়োজনীয় স্যালাইন হাসপাতাল থেকেই দেওয়া হচ্ছে।
বাজারে স্যালাইন সংকটের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র
অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেন, আমাদের জানামতে সংকট থাকার কথা না। দেশের
বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, সরকারি হাসপাতালগুলোতে ওষুধ ও স্যালাইন সরবরাহ করে
এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল)