অগ্রণী বাঙালি কবি, তিনি প্রগতিশীল প্রণোদনার জন্য সর্বাধিক পরিচিত। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম জনপ্রিয় সঙ্গীতজ্ঞ, সুর ও বানী স্রষ্টা, দার্শনিক কাজী নজরুল ইসলাম ( ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৬ - ১২ ভাদ্র , ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ)
'শির উচিয়ে দাঁড়া, দাঁড়া জগত মাঝ', এমন বানী শুধু তাঁর পক্ষেই সম্ভব হয়েছিলো। বাংলা সাহিত্যের আকাশে ধূমকেতু হয়ে আসা, বিরল প্রতিভা নজরুলের সাতচল্লিশতম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জ্ঞাপন করছি। গৌরব ও বেদনার একাত্তরে, তাঁর রচিত ও সুরারোপিত সঙ্গীত আমাদের প্রেরণা দিয়েছিল
সন্দেহাতীতভাবে।
কবি, তাঁর ৭৭ বছরের জীবনে সৃষ্টিশীল থেকেছেন ২২ অথবা ২৩ বছর, বাকী সময়টুকু কারাগার, দুই পুত্র বিয়োগের বেদনা এবং সর্বশেষ রোগাক্রান্ত হয়ে নীরব হয়ে যান। প্রায় দু'যুগ ব্যাপী সাহিত্য চর্চায় তিনি রবীন্দ্রপ্রভাবের বাইরে স্বকীয় অবস্থান গড়ে তুলতে সক্ষম হন।
কবিগুরু এবং বিদ্রোহী কবি একে অন্যের প্রতিযোগী নন, কখনো ছিলেন না। বাংলা ভাষার সাহিত্য, সঙ্গীতকে তাঁরা পুষ্ট করেছেন তাঁদের মেধায়। দু'জনের নাম প্রায় এক সঙ্গে উচ্চারিত হয়— 'রবীন্দ্র-নজরুল'। এই দু’জন মানুষ বাংলা ভাষাকেন্দ্রিক এক বিরাট জনগোষ্ঠীকে এক বাঁধনে বেঁধেছেন, বিভক্ত দেশের সব সীমারেখা মুছে দিয়ে। বলা চলে বাঙালির সংস্কৃতিকে অবিচ্ছেদ্য করে তুলেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলাম।
তিনি আধুনিক ভারতবর্ষীয় সঙ্গীতে ‘বুলবুল’ নামে খ্যাত। মানুষ তাঁর নামের সঙ্গে এক-এক সময় এক-একটি তকমা জুড়ে দিয়ে তাঁকে খণ্ডিতরূপে পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করে, তাঁর সঠিক মূল্যায়ন থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছে, সম্ভবত সমালোচকদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে এমনটি ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে বিরূপ সমালোচনার শিকার হন তিনি, এ অবস্থার বর্ণনায় নজরুল নিজেই বলেন―
‘হিন্দুরা ভাবে, ফার্শী শব্দে কবিতা লেখে, ও পা’ত-নেড়ে।
মৌ-লোভী যত মৌলভী আর মোল-লারা কন হাত নেড়ে―
দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে!
ফতোয়া দিলাম―কাফের কাজী ও
যদিও শহীদ হইতে রাজীও।’
কাজেই যারা হিন্দুধর্মকে আচার সর্বস্ব করে এবং যারা ইসলাম ধর্মকে ফতোয়া সর্বস্ব করে তাদের বিরুদ্ধে তিনি রুখে দাঁড়ান, দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেন―
‘আদি শৃঙ্খল সনাতন শাস্ত্র-আচার
মূল সর্বনার্শের এরে ভাঙিব এবার।"
তাঁর রচিত, 'পাপ' কবিতাটি বরং আজ বেশীই প্রাসঙ্গিক বাংলাদেশে। সেখানে দেখতে পাই উল্লেখিত পঙক্তিমালা-
''হেথা সবে সম পাপী,
আপন পাপের বাটখারা দিয়ে অন্যের পাপ মাপি!
জবাবদিহির কেন এত ঘটা যদি দেবতাই হও,
টুপি প'রে টিকি রেখে সদা বল যেন তুমি পাপী নও।"
অন্তত আজকের পৃথিবীতে যখন মানুষ সম্প্রদায় বা ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হতে হতে ক্রমশ ছোট হতে বসেছে, শেষ হতে বসেছে সম্প্রীতি, সমানুভাবের মতো শব্দমালা, তখন বোধহয় নতুন করে কাজী নজরুল প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন আমাদের চর্চায়, আমাদের মননে এবং সর্বোপরি যাপনে।
নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন সব ধর্মীয় চেতনার ঊর্ধ্বে। অন্তরে তিনি না ছিলেন হিন্দু না ছিলেন মুসলিম। তাঁর একটি কথাতেই এটা ছিল পরিষ্কার- 'জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত জালিয়াত খেলছো জুয়া'। তিনি সবার ঊর্ধ্বে মানবতার কবি। গোটা ভারতবর্ষেই তাঁর যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি।
প্রায় ৩ হাজার গান রচনা করেছিলেন এবং অধিকাংশ গানে নিজেই সুরারোপ করেছিলেন যেগুলো এখন ‘নজরুল গীতি’ নামেই পরিচিত। গজল, রাগপ্রধান, কাব্যগীতি, উদ্দীপক গান, শ্যামাসংগীত, ইসলামী গান বহু বিচিত্র ধরনের গান তিনি রচনা করেছেন। তাঁর রচিত গান ছাড়া রোজার ঈদ পূর্ণতা পায়না।
যদিও সাম্প্রতিককালের উচ্চিংড়ের দল অন্যান্য বহুকিছুর মতোই এ গানটির চূড়ান্ত বিকৃতি ঘটিয়েছে। একটি মাতাল (যার রেডিও অনুষ্ঠানে Hangover শব্দটি জুড়ে দেয়া হয়েছিল) নজরুলের একাধিক গানের স্বরলিপি ও সুরের চূড়ান্ত বিকৃতি করেছে। অবস্থা এতই কদর্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, ইউটিউবে বা অন্য কোথাও, 'দুর্গম গিরি কান্তার মরু', 'চল চল চল' এবং 'কারার ওই লৌহ কপাট' খুঁজলে সেই মাতালটির ষাঁড়তুল্য চিৎকার উঠে আসছে!
তাঁর সুর ও বাণীর সকল প্রকার বিকৃতি,অপব্যবহার বন্ধ করা হোক।

১৯৭৫ সালের ২৩ জুলাই অসুস্থ্য কবিকে তৎকালীন পিজি হাসপাতালে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) ভর্তি করা হয়। তিনি ১১৭ নম্বর কেবিনে আমৃত্যু ছিলেন। দীর্ঘ অসুস্থ্যতার অবসান হয় ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট রোববার, সকাল ১০: ১০ মিনিটে (মৃত্যু সনদ অনুসারে)। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পরলে ভক্ত-অনুগামিরা পিজি হাসপাতালের সামনে উপস্থিত হয়েছিলেন। কবিকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্র কেন্দ্রে (TSC).
কবির নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেদিন বিকেলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। জানাজার নামাজে অংশগ্রহণ করেন অগণিত মানুষ। জানাজা শেষে জাতীয় পতাকায় আচ্ছাদিত কবির দেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।

কবির জন্ম ও প্রয়াণদিবসে প্রচুর ভাবালু কথা শোনা যায়। আমরাও তাঁকে বলে আসছি 'জাতীয় কবি'। কিন্তু, তাঁর মহাপ্রয়াণের ৪৭ বছর হলেও জাতীয় কবির স্বীকৃতি সরকারি গেজেটে আজও আসেনি! কাজেই, চলমান 'মহা মাৎসান্যায়ের কালে' আর কতদিন তিনি 'মৌখিক জাতীয় কবি' হিসেবে টিকে থাকবেন সেটাই প্রশ্ন।