Loading..

শিক্ষায় অগ্রযাত্রা

রিসেট

২৬ আগস্ট, ২০২৩ ০৮:২২ অপরাহ্ণ

রোগ প্রতিরোধে পুষ্টি

রোগ মূলত দু ধরনের—সংক্রামক এবং অসংক্রামক। সংক্রামক রোগ জীবাণু ঘটিত অর্থাত্ জীবাণু দ্বারা সৃষ্ট এবং এক জীব থেকে অন্য জীবে সংক্রমিত হয়। সংক্রামক রোগ বায়ুবাহিত ও পানিবাহিত। বায়ুবাহিত সংক্রামক রোগসমূহ সাধারণভাবে ‘ফ্লু’ হিসেবে পরিচিত। এগুলো সবই ভাইরাসের মাধ্যমে ঘটে। পানিবাহিত সংক্রামক রোগ বেশির ভাগই ব্যাকটেরিয়া দ্বারা হয়ে থাকে। তবে এসব ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়া জলে-স্থলে সর্বত্রই বিরাজমান। এছাড়া ফাংগাস, বিভিন্ন পরজীবীর মাধ্যমেও সংক্রামক রোগ ঘটে। ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়া, ফাংগাস, পরজীবী পরিবেশের এক উপাদান থেকে অন্য উপাদানে, এক জীব থেকে অন্য জীবে সংক্রমিত হয় এবং দ্রুত বংশবিস্তার করে দেহকে অসার করে ফেলে। আর অসংক্রামক রোগ হলো শরীরের বিভিন্ন ব্যাধি যা বংশগত বা ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাস বা নিয়ম-শৃঙ্খলার ক্রটির কারণে ঘটে। যেমন ডায়েবেটিকস, হূদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি। সংক্রামক রোগের চিকিত্সায় জীবাণুকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে ওষুধ খেতে হয় এবং প্রতিরোধের জন্য টিকা বা ভ্যাকসিন দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। অসংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে কিছু ওষুধের পাশাপাশি ব্যক্তির খাদ্যাভাস ও নিয়ম-শৃঙ্খলাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। তবে দুই ক্ষেত্রেই শরীর তার নিজস্ব ইমিউনিটি বা প্রতিরোধ ক্ষমতা দিয়ে রোগ মোকাবিলা করে। এই ইমিউনিটির প্রধান ভিত্তি হচ্ছে—খাদ্য ও পুষ্টি। অর্থাত্ প্রয়োজনীয় খাদ্য ও পুষ্টি উপাদান শরীরের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কার্যাবলির মাধ্যমে শরীরকে কর্মক্ষম করে এবং শরীরে ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে।ইদানীং বিজ্ঞানীদের ধারণা চিকিত্সা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। যে কোনো রোগের প্রতিষেধকের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। আর এই প্রতিরোধের কাজটির একমাত্র প্লাটফরম শরীরের ‘ইমিউনি সিস্টেম’। এই ইমিউনিটি বা প্রতিরোধের শক্তিটি গড়ে ওঠে কিছু খাদ্য ও পুষ্টি গ্রহণের মাধ্যমে। পুষ্টি হলো খাদ্যের সেইসব উপাদান যা দ্বারা শরীরের গঠন, বৃদ্ধিসাধন, ক্ষয়পূরণ, আত্তীকরণসহ প্রয়োজনীয় শক্তি উত্পাদন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি। মূলত শরীরের শ্বেত রক্তকণিকা এবং দেহ কোষের লিম্ফেটিক সিস্টেম দেহের ভিতরে সব জীবাণুর বিরুদ্ধে  মোকাবিলায় অংশ নেয় এবং জীবাণুকে প্রায়শ ঘায়েল করে। এই মোকাবিলাটি শারীরবৃত্তীয় কার্যাবলির সঙ্গে যুক্ত যেখানে খাদ্যের ভিটামিন ও খনিজ সরাসরি জড়িত এবং এর সঙ্গে খাদ্যের প্রধান উপাদান প্রোটিন বা এমাইনো অ্যাসিড ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। শরীরের রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে যেসব পুষ্টি উপাদান ক্রিয়াশীল—এক. প্রোটিন বা এমাইনো অ্যাসিড: দেহের শারীরবৃত্তীয় কার্যাবলি হরমোনাল সিগন্যালে ক্রিয়াশীল হয়। অর্থাত্ রোগ প্রতিরোধের জৈবিকক্রিয়ায় হরমোন মুখ্য ভূমিকা পালন করে। আর এই হরমোন খাদ্যের প্রোটিন দিয়ে গঠিত। রক্তের হিমোগ্লোবিন যা অক্সিজেন পরিবহন করে সেই হিমোগ্লোবিন প্রোটিন দিয়ে তৈরি। মাছ, মাংস, দুধ, ডিম প্রাণীজ প্রোটিনের এই খাদ্য উপাদান হরমোনাল সিগন্যালে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে এবং রোগ প্রতিরোধকে বেগবান করে। দুই. ভিটামিন এ: ফুসফুস, শ্বাসনালি, ত্বকের আবরণী কলা, যোজক কলার রক্ষাকবজ। রঙিন শাকসবজি, সামুদ্রিক মাছের তেল, যকৃত, দুধ, ডিম ভিটামিন-এর প্রধান উত্স। তিন. ভিটামিন ডি: বোন মেরু বা অস্থিমজ্জার প্রধান উপাদান, যা রক্তের লোহিত কণিকা তৈরির স্থান। দেহের কোষে অক্সিজেনের একমাত্র বাহক রক্তের লোহিত কণিকা। তৈলাক্ত মাছ, দুধ, সূর্যের আলো ভিটামিন ডির প্রধান উত্স। চার. ভিটামিন সি: বলা হয়ে থাকে রোগ প্রতিরোধের প্রধান হাতিয়ার। ফুসফুস, শ্বাসনালিসহ দেহের সমস্ত ব্লাড ভেসেলের সুরক্ষার প্রধান নিয়ামক ভিটামিন সি। রক্তের হিমোগ্লোবিনে আয়রন সংযোজন ও অন্ত্রের আয়রন পরিশোষণ দেহে বিভিন্ন কোষে অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করে। জীবাণুকে গ্রাস করার কাজে শ্বেত রক্তকণিকা ও লিম্ফ নোটকে সরাসরি সহায়তা করে। লেবু, পেয়ারা, কমলা, আমলকি, টমেটো, কাচামরিচ ইত্যাদি ভরপুর ভিটামিন সি-তে। পাঁচ. ভিটামিন ই: প্রধান এন্টি অক্সিডেন্ট। ভাইরাসের আক্রমণে রক্তের লোহিত কণিকা জারিত হয়ে ধ্বংস হয়। লোহিত রক্ত কণিকাকে জারণের হাত থেকে রক্ষা করে। হরমোনের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে জীবাণুর বিরুদ্ধে দ্রুত সাড়া দেয়। বীজ তেল ভিটামিন ইর উত্কৃষ্ট উত্স। বাদাম, ডিম ও শাকে ভিটামিন ই পাওয়া যায়। আয়রন বা লৌহ: ফুসফুস থেকে বিভিন্ন কোষে অক্সিজেন পরিবহন করে হিমোগ্লোবিন। আর এই (হিম+গ্লোবিন) হিম হলো লৌহ বা আয়রন আর গ্লোবিন হলো প্রোটিন। কলিজা, ডিমের কুসুম, মুরগির মাংস, ডাল, শাকপাতা লৌহের বিশেষ উত্স। কপার: দেহের বিভিন্ন জারণ-বিজারণে কো-এনজাইম হিসেবে কাজ করে। আয়রন বিপাক ও পরিবহনে কপার সরাসরি জড়িত। কলিজা, ডিম, বাদাম, শামুকের মাংসে কপার পাওয়া যায়। জিংক: শরীরের বিভিন্ন গ্রন্থি গঠন, বৃদ্ধি, অন্ত্রের সুরক্ষায় জিংক আবশ্যক। বিভিন্ন হরমোনের বার্তাবাহনেও সহায়তা করে। মাছ,  মাংস, কলিজা, ডিম জিংকের প্রধান উত্স।রোগ প্রতিরোধে পুষ্টি গ্রহণের পাশাপাশি বয়স ও ওজন অনুযায়ী অবশ্যই প্রতিদিন নির্ধারিত ক্যালরি গ্রহণ করতে হবে। পরিমিত হাঁটাচলা ও ব্যায়াম শরীরের রক্ত সঞ্চালনকে স্বাভাবিক রাখে। পর্যাপ্ত ঘুম এন্ডোক্রাইন গ্লান্ডগুলোকে রাখে চাপমুক্ত। ফলে শরীরের ইমিউন সিস্টেম হয় গতিশীল। সর্বোপরি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ইতিবাচক মন-মানসিকতা ও বিজ্ঞানভিত্তিক জীবনযাপন রোগ প্রতিহত করে দেহমনকে চাঙ্গা করতে পারে।

মন্তব্য করুন