সহকারী প্রধান শিক্ষক
২২ আগস্ট, ২০২৩ ০২:৪৭ অপরাহ্ণ
সহকারী প্রধান শিক্ষক
বাংলাদেশে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর সাধারণ লোকদের বিশ্বাস এখন তলানিতে। এমনটি কখনো ছিল না, তলানির প্রক্রিয়াটা শুরু হয়েছে গত পাঁচ-ছয় বছরে। আগেও কোনো কোনো ব্যাংক সমস্যায় ছিল, কিন্তু সেটা ছিল ব্যতিক্রম। এখন সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ধস নেমেছে। অনেক লোক জিজ্ঞাসা করে অমুক ব্যাংকে অর্থ রাখা নিরাপদ কিনা। উত্তর দিতে চাইলেও ভালো উত্তর দেয়া যায় না। অনেক ব্যাংক এখন ঋণখেলাপির জালে আটকা পড়েছে। ব্যাংকগুলোয় দুর্বৃত্তায়ন দিন দিন শুধু বেড়েছে।
ব্যাংকের কথিত মালিকরা জনগণের অর্থকে নিজেদের অর্থ মনে করছে। খুশিমতো তারা নিজেরা ঋণ দেয়া-নেয়ার নামে ব্যাংকের অর্থ লুট করেছে। ১০ বছর আগে যে ব্যাংকের কুঋণ ছিল ৩ শতাংশ, আজকে সেটা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১০ শতাংশে বা আরো ওপরে। সরকারি ব্যাংকগুলোয় সরকার জনগণের করের টাকা ব্যয় করে বারবার পুঁজি ঠিক রাখার নামে পুঁজিতে পুনর্ভরণ করেছে। কিন্তু ওইগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্যের উন্নতির কোনো লক্ষণ নেই। ওইসব সরকারি ব্যাংক উঠে দাঁড়ানোরও কোনো সম্ভাবনা নেই। ওইগুলো হবে ভবিষ্যতে আরো বড় আকারে জনগণের অর্থকে গিলে খাওয়ার প্রতিষ্ঠান।
ব্যক্তি খাতের কয়েকটি ব্যাংক ছাড়া অন্যগুলোর অবস্থা বড়ই শোচনীয়। ওইগুলোর কোনো কোনোটিতে পরিশোধিত মূলধনের ক্ষয় হতে চলেছে। অন্য দেশ হলে এসব ব্যাংকের কোনো কোনোটি এত দিনে বন্ধ হয়ে যেত। এটাই হলো আজকে ব্যাংক খাতে বাস্তবতা যে ব্যাংক নিজের পুঁজি নিজেই খেয়ে ফেলছে। লোকজন জিজ্ঞাসা করে অমুক ব্যাংকে অর্থ রাখা নিরাপদ তো? উত্তর দেয়া সত্যি কঠিন। তবুও বলি, বেশি টাকা হলে অমুক ব্যাংক ছেড়ে অমুক ব্যাংকে যাওয়াই ভালো। ব্যাংক চলে আস্থা আর বিশ্বাসে। কোনো ব্যাংক সম্পর্কে জনগণের আস্থা যদি তলানিতে পৌঁছে যায় সেই ব্যাংক এমনিতেই বসে যাবে। ব্যাংক ব্যবসা করে জনগণের টাকায়। ব্যাংক আয়ের বড় খাত হলো সুদ আয়। কম সুদে এসব প্রতিষ্ঠান জনগণ ও প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ গ্রহণ করে, আর বেশি সুদে সেই অর্থ আবার অন্যকে ঋণ দেয়। এ দুই সুদের পার্থক্যকে অর্থনীতি বিজ্ঞানে বলে স্প্রেড। সংবাদমাধ্যমে খবর দেখে আশ্চর্য হলাম যে দেশে কোনো কোনো ব্যাংক বেশি সুদে আমানত নিয়ে কম সুদে ঋণ দিচ্ছে। এর অর্থ হলো সুদের স্প্রেড ঋণাত্মক। এই যদি ব্যাংকিং ব্যবস্থা হয় তাহলে ওই ব্যাংকগুলোয় তো অবশ্যই লালবাতি জ্বলবে। কী বুঝে কিছু কথিত উদ্যোক্তা ৪০০ কোটি টাকা দিয়ে নতুন নতুন ব্যাংক স্থাপন করলেন তা আজও বুঝে আসে না। একটা উদ্দেশ্য এই হতে পারত যে সময়মতো শেয়ারবাজারে আইপিও বা প্রাথমিক বাজারে শেয়ার বিক্রি করে একপর্যায়ে তাদের শেয়ারগুলো বেচে বড়লোক হয়ে যাবে। কিন্তু তাদের সেই আশায় আপাতত গুড়েবালি। ব্যাংকের আইপিও বাজারে দারুণ খরা যাচ্ছে। ব্যাংকের শেয়ারের ক্রেতা নেই।
অনেক পুরনো ব্যাংকেরই শেয়ারমূল্য অভিহিত মূল্যের নিচে। তাও ক্রেতা নেই। শেয়ার বেচে যারা বড়লোক হয়েছে তারা প্রথম, দ্বিতীয় এমনকি তৃতীয় প্রজন্মের ব্যাংকের উদ্যোক্তা হয়েছিলেন। আমার জানামতে, এখন নতুন ব্যাংকগুলো অনেক অসুবিধায় পড়ে গেছে। লোকের ভয় এগুলোর মধ্যে কোনো কোনোটি ফারমার্স ব্যাংক হয় কিনা। নাম বদল করে এ ব্যাংক হয়েছে পদ্মা ব্যাংক। কিন্তু এর পরও এ ব্যাংক কি ব্যবসা করতে পারছে? আজও আমানতকারীরা এ ব্যাংকের কাছে জমাকৃত অর্থ চেয়ে বসে আছে বলে সংবাদমাধ্যম খবর দেয়। নতুন ব্যাংকগুলোকে বেশি সুদে আমানত নিতে হবে। কারণ আমানতকারীরা তাদের ঝুঁকির বিপরীতে বেশি সুদ দাবি করবেন এটাই স্বাভাবিক। এ অবস্থায় এসব ব্যাংক উঁচু সুদে ঋণ বেচার জন্য ভালো গ্রাহক পাচ্ছে না। ফলে এদের ব্যবসা যে কীভাবে হবে তা বুঝে আসে না। ২০২২ সালজুড়ে ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্য নিয়ে জনগণ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। গুজব বা সত্য ছড়িয়ে পড়ল ওমুক ওমুক ব্যাংক গ্রাহকদের অর্থ দিতে পারছে না। এসব শোনার পর যাদের নগদ অর্থের প্রয়োজন নেই তারাও গিয়ে লাইনে দাঁড়াল অর্থ তোলার নামে। কোনো কোনো ব্যাংকে জমার থেকে উত্তোলন অনেক বেশি হলো। ফলে ওইসব ব্যাংকে দারুণ তারল্য সংকট দেখা দিল। বাংলাদেশ ব্যাংক এগিয়ে এল। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সুদে ঋণ করে এনে ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের পাওনা মেটাল। এখনো অনেক ব্যাংক তারল্য সংকটে আছে। কেন এমন হলো? দুই কারণে হতে পারে—হয় তারা অতিরিক্ত ঋণ বিতরণ করে ফেলেছে, যেগুলো এখন ফেরত আসছে না। না হলে তাদের পুরনো গ্রাহকরা ওইসব ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে হয় নগদ ধারণ করছেন, না হয় অন্য ব্যাংকে নিয়ে জমা করেছেন। বেশি বেশি লোক নগদ ধারণ করলে অর্থনীতির জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ ওইসব অর্থ আর চালু অবস্থায় থাকে না।
ব্যাংকিং পদ্ধতি চলে ডিপোজিট ঋণ নিয়ে বহু ডিপোজিট সৃষ্টির মাধ্যমে। নগদ অর্থ তুলে নিলে ঋণের জন্য কম অর্থপ্রাপ্তি হবে। ফলে অর্থনীতিতে গতি কমে যেতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকও তার মুদ্রানীতির বাস্তবায়ন করতে পারবে না। সিস্টেমে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ দিল ঠিকই, কিন্তু সেই অর্থ জনগণ তুলে নিয়ে বাড়িতে নগদ ধারণ করল, তাহলেও কি কাঙ্ক্ষিত ডিপোজিট সৃষ্টি হবে? হবে না। এজন্য নগদ ধারণের প্রবণতা বাড়লে মুদ্রানীতি কোনো কাজে দেয় না। যেসব ব্যাংক সিআরআর, এসএলআর সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, ওইসব ব্যাংকের ওপর আমানতকারীদের আস্থা অবশ্যই কমে যাবে। ব্যাংক নিজে ঋণের ব্যবসা করে, অথচ সেই ব্যাংকই দৈনন্দিন চলার জন্য ঋণের দ্বারস্থ হচ্ছে। এটা কেমন ব্যাংকিং? ব্যাংক স্থাপনের এ প্রতিযোগিতা কেন শুরু হলো? এটা কি সহজ ব্যবসা বলে? না, ব্যাংক স্থাপনের মাধ্যমে জাতে ওঠার জন্য। অনেকে বলেন, ব্যাংক স্থাপন করে পরিচালক-চেয়ারম্যান হলে সমাজে জাতে ওঠা যায়। নিদেনপক্ষে কার্ড তো ছাপানো যায়, যাতে লেখা থাকবে—ওমুক ব্যাংকের পরিচালক-চেয়ারম্যান ইত্যাদি। তবে অনেক লোকের সঙ্গে আমিও এখন একমত যে অনেকে ব্যাংক স্থাপন করেছে লুট করার উদ্দেশ্যে। ব্যাংকে উদ্যোক্তারা পুঁজি যা দিয়েছে তার অনেক অনেক গুণ বেশি অর্থ ব্যাংক সাইনবোর্ড টাঙিয়ে, বিজ্ঞাপন দিয়ে নিচ্ছে জনগণ থেকে। কিছু কিছু ব্যাংক উদ্যোক্তা জনগণের অর্থকে নিজ অর্থ মনে করে কৌশলে তাদের দেয়া পুঁজির অনেক বেশি গুণ অর্থ সরিয়ে নিয়েছে।
প্রথম প্রজন্মের ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের মধ্যে সততা ছিল এবং তাদের উদ্দেশ্যও ভালো ছিল, কিন্তু অসৎ কিছু লোক যখন দেখল প্রথম প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর উদ্যোক্তারা সমাজে একটা অবস্থান করে নিয়েছে তখন তারাও এ দৌড়ে নামে এবং ব্যাংক ব্যবসার দারুণ প্রসার ঘটতে লাগল। আজকে অর্থনীতিতে যত ব্যাংক দরকার তার থেকে অনেক বেশি ব্যাংক সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে ব্যবসা শুরু করেছে। প্রথম দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবসায় প্রতিযোগিতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্যাংকগুলোকে অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক এরপর আর চাপ সহ্য করতে পারেনি। তদবির ও হুকুমের কাছে নতিস্বীকার করেছে।
এখন অর্থনীতিতে এত ব্যাংক এবং অন্যান্য ধরনের এত আর্থিক প্রতিষ্ঠান আছে যে এদের কোনো ব্যবসা নেই। ব্যাংক খাতে যা ঘটবে তা হলো নতুন ও ছোট ব্যাংকগুলো যদি প্রথম থেকে গায়ে কাদা না লাগিয়ে আমানতকারীদের আস্থা অর্জন করতে পারে তাহলে এদের কোনো কোনোটি টিকে যাবে। তবে তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্মের সব ব্যাংক টিকে যাবে তা মনে হয় না। মানুষ এখন কোন ব্যাংকের মালিক কারা, তাদের নৈতিক অবস্থান কী, ব্যাংক স্থাপনে তাদের অবস্থান কী —এসব খবর রাখে। ব্যাংকের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে টাকা নেয়ার একটা দোকান খুলে বসলেই যে মানুষ বিনা বাক্য ব্যয়ে ওই ব্যাংকে আমানত রাখবে ব্যাপারটি এখন এমন নয়। এত ব্যাংকের ব্যবসাই যদি না থাকে তাহলে আরো নতুন নতুন ব্যাংক হচ্ছে কীভাবে? সেই প্রশ্নের উত্তর সৎ দৃষ্টিকোণে খুঁজলে পাওয়া যাবে না।
বাংলাদেশে ব্যাংক খাত একসময় অতি মনোযোগের সঙ্গে রেগুলেটেড বা তদারকি হতো। কিন্তু গত ১০ বছরে রেগুলেশন প্র্যাকটিসে ধস নেমেছে। যারা ঋণের গ্রাহক, যাদের মধ্যে অনেকে আবার খেলাপি, তারাই হয়ে পড়ল আদেশদাতা—ব্যাংক এই করা উচিত, ওই করা উচিত। এদের কাছে রেগুলেটর বাংলাদেশ ব্যাংকও আত্মসমর্পণ করল। আর সেই আত্মসমর্পণ বা নির্লিপ্ততা ব্যাংক খাতে আস্থাহীনতার গর্তগুলোকে আরো গভীরে নিয়ে গেছে। পরিবারের হাতে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ চলে গেল বাংলাদেশ ব্যাংকের নীরব সম্মতিতে। আর তার ফল তো আজ জনগণ দেখতে পাচ্ছে তাদের আমানত হারানোর শঙ্কার মাধ্যমে। ব্যাংক পরিচালনায় যারা ব্যাংকে অর্থ রাখে তাদের তেমন কোনো ভূমিকা নেই। ইকুইটি বা পরিশোধিত মূলধনের মাত্র ৩০ শতাংশের মালিক—তারাই ব্যাংকগুলোকে দখল করে বসে আছে। তারা নাকি উদ্যোক্তা, প্রথম প্রজন্মের একটি ব্যাংক শুধু পারিবারিক মালিকানার কারণে আজ ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে। অথচ সেই ব্যাংক একদিন চারদিকে জ্যোতি ছড়িয়েছিল। হায়রে বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক! এই ব্যাংকের সম্পদই হলো এই ব্যাংকের জন্য কাল। অথচ যারা প্রথমে এ ব্যাংক স্থাপন করেছিল তারা ছিল সৎ ও নিবেদি প্রাণ। এ ব্যাংক যখন যৌবনে পৌঁছল তখন শকুনদের নজর পড়ল ব্যাংকটির দিকে। আর আজকে ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক দুরবস্থা হয়ে পড়েছে ব্যাংকিং পাড়ার আলোচনার বড় ইস্যু।
ইসলামী ব্যাংকের সাফল্য দেখে দেশে অন্য অনেক ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অন্য সুদভিত্তিক ব্যাংকগুলো মানুষের চাহিদা মেটানোর জন্য ইসলামী ব্রাঞ্চ খুলে বসেছে। আর আজকে আদি ইসলামী ব্যাংক অর্থ সংকটে পড়ে বারবার বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বারস্থ হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক তার দায় এড়াতে পারবে না। গত ১০ বছর শক্ত রেগুলেশনের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংককে যুদ্ধ করতে দেখেনি। তারা দেখেছে, সহ্য করেছে, কিন্তু ব্যাংক খাতে লুটপাটের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়নি। আমরা আবারো অনুরোধ করব ব্যাংক খাতকে বাঁচাতে পরিবারের নিয়ন্ত্রণ থেকে ব্যাংকগুলোকে আগে উদ্ধার করুন। অন্তত যুদ্ধটা করে দেখুন না।
আবু আহমেদ: অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক