সহকারী প্রধান শিক্ষক
২২ আগস্ট, ২০২৩ ০২:৪১ অপরাহ্ণ
সহকারী প্রধান শিক্ষক
দেশে কয়েক দিন পরপর কোনো না কোনো চটকদার উদ্যোগ এসে হাজির হয়। শতকোটি থেকে হাজার কোটি টাকা নিয়ে লোপাট হওয়ার পর দেখা যায় তদারককারীদের চোখে ধুলা দিয়ে তারা অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে এবং হাজারো গ্রাহককে পথে বসিয়েছে। বিকল্প আয়ের সন্ধানে থাকা মানুষ হয়তো ভালো কিছুর সন্ধানে এসব উদ্যোগে অর্থ ঢালে, সাময়িক লাভও পেয়ে থাকে। কিন্তু মূল হোতাদের অসৎ উদ্দেশ্য থাকায় শেষমেশ একেকটা ফাঁদ হিসেবেই আবির্ভূত হয় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে। গতকাল প্রকাশিত বণিক বার্তার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কীভাবে এমটিএফইর মতো কোম্পানি হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে ডিজিটাল পেমেন্ট সুবিধা ব্যবহার করে।
বণিক বার্তার প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রথম মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানি হিসেবে জিজিএন বা গ্লোবাল গার্ডিয়ান নেটওয়ার্কের আবির্ভাব হয় ১৯৯৮ সালে। এরপর পর্যায়ক্রমে টংচং, ডেসটিনি, ইউনিপে, নিউওয়ের মতো প্রতিষ্ঠানও প্রায় একই মডেলে ব্যবসা জুড়ে বসে। তারও আগে যুব কর্মসংস্থান সোসাইটি (যুবক) নামে বহুল আলোচিত কোম্পানি প্রায় একই পদ্ধতিতে দেশব্যাপী কার্যক্রম শুরু করে। তবে সে সময় লেনদেনের আধুনিক কোনো উপায় না থাকায় অর্থ সংগ্রহের প্রক্রিয়া ছিল ধীর। বর্তমানে লেনদেন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন হয়েছে। এসেছে ডিজিটাল পেমেন্ট পদ্ধতি। এতে ঘরে বসেই লেনদেন করা যাচ্ছে নিমিষে। এ সুযোগই কাজে লাগিয়েছে দুবাইভিত্তিক এমএলএম প্রতিষ্ঠান অ্যাপ মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ গ্রুপ বা এমটিএফই। প্রতারণার ফাঁদে ফেলে লক্ষাধিক মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। অবৈধ অনলাইন গ্যাম্বলিং ক্রিপ্টো ট্রেডিং করা এ প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাতের পথ মূলত ডিজিটাল পেমেন্টেই ত্বরান্বিত হয়েছে বলে মনে করেন আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি আগাম আর্থিক অপরাধ শনাক্তে দেশে মজবুদ ভিত্তি গড়ে না ওঠাকেও দায়ী করছেন তারা।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা অনেক আগে থেকেই প্লাটফর্মটি নিয়ে সতর্কতা জানিয়ে এলেও মানুষ লোভের ফাঁদে পড়ে এখানে টাকা দিচ্ছিল। জানা গেছে, অ্যাপের মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিং বা বাইন্যান্সের মাধ্যমে তারা টাকা নিত। পরে স্থানীয় এজেন্টরা সেটি বাইরে পাচার করত। বাংলাদেশে এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মুনাফার লোভ দেখিয়ে টার্গেট করা হতো।
বাংলাদেশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী এমএলএম ব্যবসা পরিচালনা ও ক্রিপ্টো কারেন্সিতে লেনদেন অবৈধ ও নিষিদ্ধ। কিন্তু বড় অংকের আয়ের প্রলোভনে গ্রাহকরা বিনিয়োগ শুরু করেন এমটিএফইতে। অনেকে গহনা ও মূল্যবান সামগ্রী বন্ধক রেখেও বিনিয়োগ করেছিলেন। অ্যাপের মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিং বা বাইন্যান্সের মাধ্যমে টাকা নিত এমটিএফই। পরে স্থানীয় এজেন্টরা সেই অর্থ বাইরে পাচার করত। শুধু বিনিয়োগের ওপর লাভই নয়, কাউকে দিয়ে বিনিয়োগ করাতে পারলে তাদের লাভের ওপর পাওয়া যেত ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন। এমন করে কারো মাধ্যমে ১০০ গ্রাহক বিনিয়োগ করলে ওই ব্যক্তির পদবি হতো সিইও। কমিশন আর নিজের বিনিয়োগের অর্থ মিলিয়ে কথিত সিইওকে মাসে ১৫-৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করার প্রলোভন দেখানো হতো।
ডিজিটাল পেমেন্ট সুবিধা নিয়ে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে অ্যাপের মাধ্যমে এমটিএফই দেশে অবৈধ এমএলএম ব্যবসা পরিচালনা করে এলেও লাপাত্তা হওয়ার দুই সপ্তাহ আগে বিষয়টি আলোচনায় আসে। ততক্ষণে প্রায় ৭০ হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে ১১ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয় বলে দাবি করেন ক্ষতিগ্রস্তরা। কেউ কেউ এ হাতিয়ে নেয়া অর্থের পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকা বলছেন। এসব লেনদেনের পুরোটাই হয়েছে ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করে। এমটিএফই গ্রাহকরাও পাওনা পরিশোধের ক্ষেত্রে পুরোপুরি ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করেছেন। আর ট্রেডিংয়ের ক্ষেত্রে বাইন্যান্স ব্যবহার করেছে এমটিএফই। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টো কারেন্সি এক্সচেঞ্জগুলোর মধ্যে বাইন্যান্স অন্যতম। ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এ ডিজিটাল প্লাটফর্ম কিমান আইল্যান্ডে অবস্থিত।
আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমএলএমের মাধ্যমে ডেসটিনি-ইউনিপেসহ আরো অনেকেই প্রতারণা করেছে। তবে সে সময় ডিজিটাল পেমেন্টের সুবিধা না থাকায় সরাসরি গিয়ে টাকা জমা দিতে হতো। এক জেলা থেকে অন্য জেলা বা এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে এ ধরনের লেনদেনের ক্ষেত্রে বেশ সময়ের ব্যাপার ছিল। কিন্তু ডিজিটাল পেমেন্টের যুগে টাকা বহন করে নেয়া বা অতিরিক্ত সময় কোনোটিরই প্রয়োজন হচ্ছে না। এ সুযোগই এমটিএফইর অর্থ আত্মসাতের পথ ত্বরান্বিত করেছে। পাশাপাশি এ ধরনের আর্থিক অপরাধের ক্ষেত্রে আগাম শনাক্তকরণ ব্যবস্থা গড়ে না ওঠাকেও এ ধরনের অপরাধ বিস্তারের কারণ হিসেবে মনে করছেন তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট বিএফআইইউ এক বছরেও বড় অংকের এ আর্থিক জালিয়াতি ধরতে পারেনি, এটা খতিয়ে দেখা দরকার। ডিজিটাল পেমেন্ট প্লাটফর্ম ব্যবহার করে দেশে বিভিন্ন আর্থিক লুটপাট হচ্ছে তা তদারকি সংস্থাগুলো খেয়াল রাখছে কি? আগাম শনাক্তকরণ ব্যবস্থা থাকলে শুরুর দিকেই এ লুটপাট পরিকল্পনা ভেস্তে দেয়া যেত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মতো এটাও বড় আকারের চুরি এবং তা ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় বিএফআইইউ তার দায় এড়াতে পারে না। ইন্টারনেটের ব্যবহার বৃদ্ধি সত্ত্বেও ডিজিটাল লিটারেসি ততটা শক্তিশালী না হওয়ায় সামনের দিনগুলোতেও মানুষ এ ধরনের পঞ্জি স্কিমে অর্থ বিনিয়োগ করতে পারে। এজন্য জনপ্রিয় গণমাধ্যম কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষকে সতর্ক করে প্রচারণা চালাতে হবে। তদারকি সংস্থা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকেও এ ধরনের কার্যক্রম সম্পর্কে যথাযথভাবে ওয়াকিবহাল থাকতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। হুন্ডি বা কোনো মাধ্যমে যাতে লোপাট হওয়া অর্থ পাচার না হতে পারে সেজন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। মূল হোতারা বর্তমানে যে দেশে অবস্থান করছে সে দেশের সরকারের সঙ্গে কথা বলে তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের চটকদার কার্যক্রম ঠেকাতে সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ কাম্য।