সহকারী প্রধান শিক্ষক
২২ আগস্ট, ২০২৩ ০২:৩৬ অপরাহ্ণ
সহকারী প্রধান শিক্ষক
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় নারীর অংশগ্রহণ ও সফলতার হার বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা কার্যক্রমে ছেলেদের তুলনায় পিছিয়ে থাকার পর মেয়েদের এ অগ্রযাত্রা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। প্রচলিত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নারীরা একসময় শিক্ষা ক্ষেত্রে বঞ্চিত হতো, নারীদেরও শিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে—এমন মনোভাব পোষণ না করায় মেয়েদের পড়াশোনার গণ্ডি প্রাথমিক স্তরের পর আর অগ্রসর হতো না। সেখান থেকে উচ্চ বিদ্যালয় ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের অংশগ্রহণের হার বৃদ্ধি পাওয়া আমাদের জাতিগত উন্মেষের পরিচয়। বিশেষ করে শিক্ষার ক্ষেত্রে ছেলেমেয়েদের মধ্যে বৈষম্য না করে সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করা অনেক বড় একটি অর্জন।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, বুধবার প্রকাশ হওয়া চলতি বছরের উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের জিপিএ ৫ পাওয়ার সংখ্যা ও পাসের হার বেড়েছে। ছাত্রদের পাসের হার যেখানে ৮৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ, সেখানে ছাত্রীদের এ হার ৮৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। সে হিসাবে ২ দশমিক ৯৫ শতাংশ বেশি মেয়ে পাস করেছেন। ছেলেদের চেয়ে এবার জিপিএ ৫ পাওয়া মেয়ের সংখ্যাও বেশি। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, ছাত্রদের চেয়ে ১৫ হাজার ১৬০ ছাত্রী বেশি জিপিএ ৫ পেয়েছেন। এ বছর জিপিএ ৫ পাওয়া ছাত্রী ও ছাত্রের সংখ্যা যথাক্রমে ৯৫ হাজার ৭২১ ও ৮০ হাজার ৫৬১।
পরিসংখ্যানটি শিক্ষা ক্ষেত্রে মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার উদাহরণ হিসেবে গণ্য হয়। বস্তুত করোনা মহামারীর সময় গত দুই বছর শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পড়াশোনার যে ব্যাঘাত ঘটে তখন বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোনোর আগেই মেয়েরা বাল্যবিবাহের সম্মুখীন হয়। ফলে অনেক মেয়েরই শিক্ষার্থী জীবনের ইতি ঘটে। এমন অপ্রত্যাশিত সময় কাটিয়ে আমরা আবারো যখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলাম তখন এমন চিত্র আমাদের আশান্বিত করে। আমাদের দেশে নারীদের শিক্ষার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ধীরে ধীরে বদলেছে। এজন্য সমাজ বিনির্মাণে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের ভূমিকা অপরিসীম। যুগে যুগে নারীর পথচলা মোটেও মসৃণ ছিল না। নারীরা ঘরের কাজ করবেন, প্রয়োজনীয় অক্ষরজ্ঞান থাকলেই চলবে—এমন সংকীর্ণ মনমানসিকতা দীর্ঘদিন এ অঞ্চলে বিরাজ করেছে। মেয়েদের স্কুলে ভর্তি করলেও পঞ্চম শ্রেণীর পর আর না পড়ানোর মানসিকতা বা বড়জোর সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পর্যন্ত পড়িয়ে বিয়ে দেয়ার প্রথা আমাদের গ্রামগুলোয় প্রচলিত ছিল। সে জায়গা থেকে মেয়েরা এখন হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট বা (এইচএসসি) পরীক্ষায় ছেলেদের তুলনায় বেশি পাস করছেন। এমনকি জিপিএ ৫ পাওয়ার সংখ্যাও বেশি যা দীর্ঘদিনের অবহেলা আর বঞ্চনারই যেন মূর্ত প্রকাশ। মেয়েদের মেয়ে হিসেবে না দেখে মানুষ হিসেবে মূল্যায়নের ফলাফল ক্রমাগত দৃশ্যমান হচ্ছে। আগে পত্রিকায় পাবলিক পরীক্ষা এবং ফলাফল প্রকাশের দিন মেয়েদের ছবি ছাপালে তির্যক মন্তব্য উঠে আসত, কিন্তু বর্তমানে বোধহয় সে দিন বদলের পালা এসেছে। কারণ এখন পরীক্ষার ফলাফলই পরীক্ষাসংক্রান্ত ছবিতে মেয়েদের প্রাধান্য দেয়ার বলিষ্ঠ দাবি রাখছে। পাসের হারের পাশাপাশি মেয়েদের জিপিএ ৫ বেশি পাওয়ার যে যাত্রাটি শুরু হলো, সেটি ধরে রাখা দরকার। কারণ পাস করা সবাই যে পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবেন সেটি কিন্তু নিশ্চিত করে বলা যাবে না। যদিও এখন উচ্চশিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বেড়েছে, কিন্তু সবাই যে গ্র্যাজুয়েশন বা স্নাতক স্তর শেষ করতে পারছেন সেটিও কিন্তু নয়। এক্ষেত্রে বিয়ের পর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উদাহরণও রয়েছে। যা-ই হোক, প্রতিবন্ধকতার মাঝেও মেয়েরা এখন উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে যাচ্ছেন এটি অস্বীকার করার উপায় নেই।
ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশনের (বিবিসি) প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা সময় নারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট কয়েকটি বিভাগেই পড়াশোনা করতেন, বেশির ভাগ কলা অনুষদের কয়েকটি বিভাগে পড়তে চাইতেন। কিন্তু ক্রমে সে অবস্থাটিও পরিবর্তন হয়, এবং বিজ্ঞান ও বাণিজ্য অনুষদেও নারীর সংখ্যা বাড়ে। এখন প্রায় সব অনুষদেই নারী শিক্ষার্থীর অনুপাত প্রায় সমানের কাছাকাছি। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানে ছাত্রীর সংখ্যা ছাত্রের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে।
প্রায় এক শতাব্দী আগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা নেয়া নারীদের বড় অংশটি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে নারীশিক্ষা বিস্তারে এ নারীদের বড় ভূমিকা রয়েছে। দেশের প্রথম সরকার অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (এনএসইউ) ৪৬ শতাংশ শিক্ষার্থীই নারী। নারীদের মধ্যে উচ্চশিক্ষার হার বৃদ্ধি পাওয়ায় সমাজে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। নারীদের মতামতকে এখন সমাজ ও রাষ্ট্রে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এই যে মতামত দেয়া, সে ব্যাপারটিই ১০০ বছর আগে এ অঞ্চলের নারীর ছিল না। এরপর রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী বিষয় থেকে খেলাধুলা, সামরিক বাহিনী থেকে বিমান চালনা সব ক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণ আজ দেখা যায়। সমাজে অবস্থাটি তৈরির পেছনে উচ্চশিক্ষিত ও অগ্রসর নারীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা আছে। নারীর এ অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক, আমরা সে প্রত্যাশাই করি।
সুযোগ পেলে মেয়েরাও মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারেন, এর প্রমাণই আমরা শিক্ষা ক্ষেত্রে দেখতে পাচ্ছি। এর ফলাফল সুদূরপ্রসারী হতে বাধ্য। উচ্চশিক্ষায় নারীর সদর্প পদচারণে মুখর হোক দেশের উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পুরুষতান্ত্রিক এ সমাজে মেধার আলোয় নারী উদ্ভাসিত হোক সেটিই আমাদের কাম্য। পুরুষের পাশাপাশি নারীর সমানুপাতিক অর্জন এবং পুরুষকেও ছাড়িয়ে যাওয়া ভবিষ্যতে ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গড়তে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে, আমরা সেটিই প্রত্যাশা করি। এক্ষেত্রে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পর স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের ক্ষেত্রেও নারীদের এ অগ্রযাত্রার ধারা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। সেজন্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আবাসন সংকট দূরসহ নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এছাড়া বাল্যবিবাহের কারণে আর কোনো নারীকে যেন ঝরে পড়তে না হয় এবং নারী যেন নির্বিঘ্নে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন সেটি বাস্তবায়ন করাও জরুরি। এজন্য রাষ্ট্র ও সমাজের পাশাপাশি পরিবার থেকেও নারীর উচ্চশিক্ষাকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে।