Loading..

শিক্ষায় অগ্রযাত্রা

রিসেট

০৫ জুলাই, ২০২৩ ০৬:৫৫ অপরাহ্ণ

গুণগত শিক্ষক ছাড়া গুণগত শিক্ষা সম্ভব নয়।

গুণগত শিক্ষক ছাড়া গুণগত শিক্ষা সম্ভব নয়

--------------------------------------------------------------    "সারা পৃথিবীতেই শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করেন শিক্ষকগণ। নার্সারি থেকে সর্বোচ্চ শিক্ষা এবং উচ্চতর গবেষণা পর্যন্ত পরিচালিত হয় শিক্ষকদের তত্ত্বাবদানে। সুতরাং শিক্ষক ছাড়া কোনো শিক্ষাকার্যক্রমই চলতে পারে না। এই শিক্ষকদের মধ্যে রকমফের আছে। কেউ অতি উত্তম শিক্ষক, কেউ উত্তম শিক্ষক, কেউ মাজারি মানের শিক্ষক এবং কেউ বা নিম্নমানের শিক্ষক। আর শিক্ষকদের এই মানের উপর নির্ভর করে গুণগত শিক্ষা। এখন খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে যে, ভালো শিক্ষক বা সর্বোত্তম শিক্ষক বলতে আমরা কী বুঝি? এই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য আমাদের পাণ্ডিত্য অর্জনের দরকার নেই। আপনার স্কুল পড়ুয়া শিশুকে জিজ্ঞেস করুন, “তোমার প্রিয় শিক্ষকের নাম কী?” অবলীলায় সে তার প্রিয় শিক্ষকের নাম বলে দেবে। তার পরে যদি জিজ্ঞেস করেন, “ওই শিক্ষক কেন তোমার প্রিয়?” তাহলে শিশু কিছুটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়বে। কারণ শিশুদের মনের গড়নটাই এমন যে, সে মনে করে, প্রিয় তো প্রিয়ই, তার আবার ‘কেন’ থাকবে কেন! তবুও এই বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যেই সে বলতে চেষ্টা করবে যে, ওই শিক্ষক ক্লাসে খুব ভালো বোঝান, রাগ করেন না, চিৎকার-চেঁচামিচি করেন না, খুব আদর করেন। দুষ্টুমি করলে বকেন। এভাবে আপনি আপনার শিশুর কাছ থেকেই ভালো শিক্ষকের বা সর্বোত্তম শিক্ষকের কিছু বৈশিষ্ট্য পেয়ে যাবেন। আর যদি ওই শিশুকেই আপনি জিজ্ঞেস করেন, ক্লাসে তোমার সবচেয়ে অপছন্দের শিক্ষকের নাম কী? এবারও সে বিব্রতকর অবস্থায় পড়বে। কারণ শিক্ষককে অপছন্দ করার বোধ তার মধ্যে তৈরি হয়নি। সে শুধু পছন্দ করতেই শিখেছে, ভালোবাসতেই শিখেছে। তবুও সে একটি বা দুটি নাম বলবে। এবারও যদি আপনি জিজ্ঞেস করেন, ওই শিক্ষক তোমার অপছন্দের কারণ কী? তাহলে আগে যে কথাগুলো সে বলেছিল, সেই কথাগুলোই উলটো করে বলবে -  ওই শিক্ষক ভালো পড়াতে পারেন না, ক্লাসে খুব রাগারাগি করেন, খুব চিৎকার-চেঁচামিচি করেন এবং তাদেরকে মাঝেমধ্যে শাস্তিও দেন। এখান থেকেও বোঝা যায় যে, একজন খারাপ শিক্ষকের বৈশিষ্ট্যগুলো কী। 

ভালো শিক্ষক ও খারাপ শিক্ষকের সঙ্গে শিখন-শেখানো কার্যক্রমের সম্পর্কের অনুপাত নির্ধারিত হয়েছে পৃথিবীর অনেক তাৎপর্যপূর্ণ গবেষণায়। ১৯৯৬ সালের নভেম্বর মাসে উইলিয়াম এল সেন্ডার্স এবং জন সি রিভার্স ‘কমুলেটিভ এন্ড রিসিডুয়াল ইফেক্টস অব টিচার্স অন ফিউচার স্টুডেন্ট একাডেমিক এসিভমেন্ট’ বিষয়ে একটি গবেষণা করেন। ওই গবেষণায় তাঁরা দেখিয়েছেন, সাধারণ মানের দুইজন শিক্ষার্থীকে যদি ভালো ও খারাপ শিক্ষকের নিকট শিখন-শেখানো কার্যক্রমে পাঠানো হয়, তাহলে তিন বছরে তাদের সামগ্রিক ফলাফলের মধ্যে ৫০ ভাগ ডেভিয়েশন বা তারতম্য সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থী অন্যজন থেকে কৃতিত্বের মাপকাঠিতে ৫০ ভাগ পিছিয়ে পড়বে। তাঁরা আরও দেখিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের কৃতিত্বের উপর শিক্ষকদের প্রভাব একদিকে যোজনীয় (ধফফরঃরাব) এবং অন্যদিকে ক্রমবর্ধিষ্ণু (পঁসঁষধঃরাব)।  অর্থাৎ শিক্ষকের প্রভাবে একদিকে শিক্ষার্থীর উপর কছু সদগুণাবলি সংযুক্ত হয় এবং অন্যদিকে ওই গুণগুলো বিস্তৃত হতে থাকে।

ভালো শিক্ষকদের দ্বারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয় কোন শিক্ষার্থীরা? এর জবাবে অনেকেই বলবেন, ভালো বা মেধাবী শিক্ষার্থীদের কথা। কিন্তু ওই গবেষকগণ দেখিয়েছেন যে, ভালো শিক্ষকদের সান্নিধ্যে সব শক্ষার্থী উপকৃত হলেও সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয় দুর্বল শিক্ষার্থীরা এবং এই শিক্ষার্থীদের কৃতিত্বের পরিমানও অধিক। এই পর্যবেক্ষণ নিঃসন্দেহে তাপর্যপূর্ণ।

এই যে ভালো শিক্ষকের কথা বলা হলো, তার কি কোনো সুনির্দিষ্ট গুণাবলি আছে? এই প্রশ্নের উত্তরে অধিকাংশ গবেষণায় মিশ্র পর্যবেক্ষণ ও অভিব্যক্তি পাওয়া গেছে। প্রথমত, একজন শিক্ষক একটি দেশের ভৌগোলিক সীমানায় ও তার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও ধর্মীয় পটভূমিতে শিক্ষকতা করেন। এই পটভূমি নিঃসন্দেহে ইউনিক। সুতরাং গুণগত শিক্ষা এই পটভূমির উপর নির্ভশীল হলেও ব্যক্তি-শিক্ষকের উপর এর উৎকর্ষ অনেকাংশে নির্ভর করে। 

শিক্ষকতার পেশা আর দশটি চাকরির মতো নয়। এখানে তিনি অন্য চাকরির মতো কোনো দাপ্তরিক কাজকর্ম করেন না, কোনো নথিপত্র নিয়েও তাকে ব্যস্ত থাকতে হয় না, নাগরিকদের সেবা প্রধানের বিষয়ও এখানে নেই। শিক্ষককে কাজ করতে হয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। এই শিক্ষার্থীদের একটি অংশ প্রতিবছরই নতুন এবং আরেকটি অংশ বিদ্যালয় থেকে বিদায় নেয়। সুতরাং শিক্ষককে প্রতিনিয়ত একটি প্রাণবন্ত ও প্রচণ্ড গতিশীল তরুণ জনসমাজের সঙ্গে কাজ করতে হয়। অনিবার্যভাবেই একজন শিক্ষককে প্রবল প্রাণশক্তির অধিকারী হতে হয় এবং জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে, বিদ্যাবুদ্ধি চর্চার ক্ষেত্রে তাকে প্রতিনিয়ত হালনাগাদ থাকতে হয়। তিনি প্রতিনিয়ত মুখোমুখি হন কোমলমতি তরুণ-তরুণীদের, যাদের কৌতূহল, জিজ্ঞাসা, জীবনাকাঙ্ক্ষা ও জীবনতৃষ্ণা প্রবল। এই তরুণ জনগোষ্ঠী খুবই স্পর্শকাতর, আবেগপ্রবণ, সহজ-সরল এবং মনোদৈহিক দিক থেকে প্রচণ্ডরকম চঞ্চল। এদের সামাল দেওয়া এবং জ্ঞানার্জনের প্রতি প্রত্যয়নিষ্ট করে তোলা দুর্বল শিক্ষকদের দ্বারা সম্ভব নয়। এবং যেসব শিক্ষক এই তরুণ প্রজন্মের মনোদৈহিক অবস্থার সঙ্গে পরিচিত নন, যারা এদের মনস্তত্ত্ব বুঝতে অক্ষম এবং যারা এদের যথার্থ সম্মান, মর্যাদা, স্নেহ, ভালোবাসা ও তাৎপর্যপূর্ণ শাসন করতে পারেন না, তারা কিছুতেই এদের জন্য কার্যকর কোনো কৃতিত্ব বয়ে আনতে পারেন না। সুতরাং একজন শিক্ষক এদেরকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য এবং সর্বোতভাবে সুনাগরিক হিসেবে তৈরি করার জন্য নিরন্তর নিজেকে প্রস্তুত রাখেন।

নানা রকম গবেষণায় এই প্রস্তুতির বেশ কয়েকটি ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথমেই হলো শিক্ষকের যোগাযোগ ক্ষমতা। বিষয়জ্ঞান থেকে শুরু করে বিদ্যায়তনিক জীবনে একজন শিক্ষককে তরুণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা চালিয়ে যেতে হয়। এমনটা আর কোনে পেশায় নেই। এই যোগাযোগ যেমন ক্লাসরুমের ভেতরে, তেমনি ক্লাসের বাইরে। যে শিক্ষক ওই পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা যতটা সাফল্যের সঙ্গে নির্বাহ করতে পারেন, তিনি শিক্ষার্থীদের কৃতিত্ব অর্জনে ততই মজবুত হবে। 

মন্তব্য করুন