Loading..

শিক্ষায় অগ্রযাত্রা

রিসেট

০৫ জুলাই, ২০২৩ ০৫:৩৯ অপরাহ্ণ

শিশুবান্ধব শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করুন

শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ। প্রাথমিক শিক্ষায় প্রণয়ন হয় এ ভবিষ্যতের ভিত্তিপ্রস্তর। প্রাথমিক শিক্ষা দুর্বল হলে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চতর শিক্ষা সবল হয় না। অথচ দেশের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় প্রাথমিক শিক্ষা অতি অবহেলিত। জন আলাপে কিংবা সংবাদমাধ্যমে উচ্চতর শিক্ষা নিয়ে যত হইচই হয়, তার লেশমাত্র পরিলক্ষিত হয় না প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে। উন্নয়নের বয়ানে আমাদের পাবলিক পরিসর সয়লাব, কিন্তু আক্ষেপের বিষয় যে ২৭ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রাথমিক বিদ্যালয় জরাজীর্ণ। আরো উদ্বেগজনক যে মৌসুমি জলবায়ুর প্রভাব বলয়ে অবস্থিত হওয়ার কারণে চার মাসব্যাপী বর্ষামুখরিত থাকে এমন একটি দেশে বিদ্যালয়গুলোর ১৯ শতাংশ শ্রেণীকক্ষে বৃষ্টির পানি ঝরে।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, সরকার কর্তৃক বাস্তবায়িত ‘তৃতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৩)’-এর ওপর সরকারের প্রকল্প মনিটরিংয়ের একমাত্র প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষা প্রতিবেদনে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার এমন জরাজীর্ণ চিত্র ফুটে উঠেছে। বিবেচ্য যে পিইডিপি-৩ পরিচালিত হয়েছিল ১০টি উন্নয়ন-সহযোগী সংস্থার অর্থায়নে।

প্রতিবেদনে আরো দেখা যায়, ২৬ শতাংশ বিদ্যালয়ে সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই। ১৩ শতাংশ বিদ্যালয়ে কোনো টিউবওয়েলই নেই। ১৩ শতাংশ বিদ্যালয়ের টিউবওয়েল নষ্ট। স্যানিটেশনের সুব্যবস্থাও নেই অনেক বিদ্যালয়ে। ১৯ শতাংশ বিদ্যালয়ে টয়লেট খোলা থাকে না। পৃথক টয়লেট নেই ২৫ শতাংশ বিদ্যালয়ে।

এ রকম প্রতিকূল পরিবেশ কোমলমতি শিশুদের শিক্ষার জন্য কোনোভাবে উপযুক্ত নয়। প্রাথমিক শিক্ষার অবকাঠামোগত এমন জরাজীর্ণ দশা জাতির অগ্রাধিকারমূলক খাত নির্ধারণে আমাদের সামষ্টিক ব্যর্থতাকে নির্দেশ করে।

অথচ সংবিধানের ১৭ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সরকার একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরির জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সেই ১৯৯০ সালে প্রণীত বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইনের আলোকে ১৯৯৩ সালে সরকার দেশব্যাপী বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন করে। কিন্তু বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তনের পর তিন যুগ পেরিয়েও যদি আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা অবকাঠামোর সার্বিক অবস্থা এ রকম জরাজীর্ণ হয় তা অতি আক্ষেপজনক। কেননা শিক্ষাঙ্গনে শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত না করে শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করে লাভ হবে না। তাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিক্ষাঙ্গনে শিশুবান্ধব এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক সংবেদনশীলতার জন্য ক্ষতিকর হবে না। না হলে নিকট অতীতে দৃষ্ট বিদ্যালয়ে গিয়ে শিশুদের ডেঙ্গু কিংবা দাবদাহে আক্রান্ত হওয়ার খবর আমরা আবার পেতে পারি সংবাদমাধ্যমে।

আইএমইডির প্রতিবেদনে আরো দেখা যায়, বিদ্যালয়গুলোর শ্রেণীকক্ষ ভর্তি হওয়া শিশুদের স্থান সংকুলানে সক্ষম নয়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অনুপাতও উদ্বেগজনক, যা শিক্ষার মানোন্নয়নে সহায়ক নয়।

তাই বিদ্যমান বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অনুপাত কমিয়েও আনতে হবে। একই সঙ্গে দেশের সকল গ্রামের শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়ের সংখ্যাও বাড়াতে হবে। কেননা দেশে গ্রামের সংখ্যা ৮৭২২৩, অথচ বিদ্যালয়ের সংখ্যা এখনো ৬৪৯৫৫ (২০১৯ সালের তথ্যানুসারে)। অথচ গ্রামে গ্রামে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা না করে আগেই জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের অঙ্গীকার করা হয়েছে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমেই সব উচ্চতর শিক্ষার পাটাতনের পত্তন হয়ে থাকে।

কিন্তু আক্ষেপজনক যে নতুন ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) অনুপাতে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বিগত অর্থবছরের তুলনায় কমেছে। প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ জিডিপির তুলনায় ১ দশমিক ৭৬ শতাংশের কথা বলা হয়েছে। অথচ বিগত অর্থবছরে শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ ছিল জিডিপির ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে ছিল ২ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। ইউনেস্কোর পরামর্শ, একটি দেশের মোট জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করা উচিত।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের জন্য ২০২৩-২৪ সালের উন্নয়ন বাজেট মোট বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ১১ শতাংশ, যা ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় দশমিক ৪৭ শতাংশ কম। শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দের এমন দশা থেকে এই অনুমিত হয় যে শিক্ষা এখন আর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের খাত নেই।

আইএমইডি তাদের প্রতিবেদনে দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয়ে শিশুবান্ধব শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে নয়টি সুপারিশ করেছে। সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ২৬ শতাংশ স্কুলের অবকাঠামো ব্যবহারযোগ্য থাকা সত্ত্বেও নিয়মিত মেরামতের প্রয়োজন। আরো বলা হয়েছে সব বিদ্যালয়ে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে। শিক্ষক প্রশিক্ষণকে আরো কার্যকর এবং উদ্দিষ্ট শিক্ষকদের চাহিদা অনুযায়ী করার ব্যাপারে সরকারকে উৎসাহী হতে হবে। একই সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের ওপর প্রাথমিক শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার জন্য কোনো ট্র্যাকিং ব্যবস্থা সৃষ্টি করতে হবে। শিশুদের মধ্যে সামাজিক ও আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা বিকাশের স্বার্থে তাদের মধ্যে অংশগ্রহণমূলক মনোভাব তথা অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনা জাগিয়ে তুলতে হবে। আইএমইডি তাদের প্রতিবেদনে আরো বলেছে যে বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার সমতা নিশ্চিত করতে। প্রাথমিক শিক্ষা খাতের প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে বিলম্ব দূর করতে প্রসেস ডকুমেন্টেশনের সুপারিশ করাও হয়েছে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগমনে মানব সমাজ চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে এমন মানবসম্পদের বিকাশ করতে গেলে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে তথ্য ও প্রযুক্তিগত বিদ্যাচর্চা তথা প্রযুক্তির প্রায়োগিক দিকের সঙ্গে পরিচায়ন প্রয়োজন।

একই সঙ্গে শিশুদের মাঝে বিশ্লেষণাত্মক চিন্তার উন্মেষ করতে শিক্ষকদের পাঠদান পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। এজন্য শিক্ষকদের পাঠদান কৌশলের ওপর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত।

আমরা প্রত্যাশা করি যে আইএমইডি কর্তৃক সুপারিশমালা অনুসরণপূর্বক সরকার প্রাথমিক শিক্ষার অবকাঠামোগত উন্নয়ন করে শিক্ষাঙ্গনে শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করবে।

মন্তব্য করুন