সহকারী শিক্ষক
১৪ জুন, ২০২৩ ০৯:৪৯ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
প্রাণ থাকলেও গাছের হাত, পা, মুখ নেই। তাই বলে যে শুধু ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে, অমনটাও ভেবো না। গাছও কিন্তু আমাদের মতোই সামাজিক জীবন যাপন করে। ওদেরও আছে অনুভূতি।
গাছ শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে না। ওরাও একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ভাবছ, সে আবার কী করে সম্ভব! মুখ নেই, চোখ নেই, এমনকি কানটাও নেই গাছের। তাহলে? হুম, গাছের চোখ, কান নেই বটে, তবে একটা জিনিস দিব্যি আছে।
শিকড়। গাছ নড়াচড়া করতে না পারলেও তাদের শিকড় বসে থাকে না। তারা তরতরিয়ে মাটির নিচ দিয়ে এমাথা-ওমাথা করে ছড়িয়ে পড়ে। এই শিকড় দিয়েই অন্য আরেকটা গাছের শিকড়ের সঙ্গে লেনদেন করে বেড়ায় গাছ।
তারা শিকড়ের সাহায্য নিয়েই তথ্য আদান-প্রদান করে, খাবার ভাগাভাগি করে, এমনকি লড়াই পর্যন্ত করতে পারে!
মাটির নিচে নেটওয়ার্ক
জানোই তো, গাছ শিকড় দিয়ে মাটি থেকে পানি শোষণ করে। সেই পানি দিয়েই তৈরি হয় তাদের খাবারদাবার। তাই মাটি খুঁড়লেই আমরা জালের মতো গাছের শিকড়বাকড় দেখি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এসব শিকড়ের গায়ে আবার বিভিন্ন ছত্রাক থাকে।
একবার মাটি খুঁড়ে শিকড় তুলে হাতে নাও। দেখবে, শিকড়ের গায়ে একটা সাদা আস্তরণ আছে। ওগুলোই হচ্ছে ছত্রাক। ছত্রাকগুলো শিকড়ের গায়ে কাপড়ের মতো করে জড়িয়ে থাকে। তাই অমন সাদাটে দেখায়।
অবশ্য অন্য রঙেরও হয় ছত্রাক। ফলে সব সময় সাদা না-ও দেখা যেতে পারে শিকড়টি।
ছত্রাকে মোড়ানো এসব শিকড়কে বলে ‘মাইকোরিঝিয়া’। এসব মাইকোরিঝিয়া শিকড় কী করে? আরেক গাছের মাইকোরিঝিয়া শিকড়ের সঙ্গে সুন্দরভাবে জোড়া লেগে যায়। ঠিক যেমন তারের সঙ্গে আরেকটা তার জুড়ে দেওয়া হয়, এমন। এভাবেই এক গাছের শিকড়ের সঙ্গে আরেকটা গাছের শিকড়, তার সঙ্গে আবার আরো একটা গাছের শিকড় জুড়ে যায়। এমন করে জালের মতো নেটওয়ার্ক তৈরি হয়। দিন যায় আর বাড়ে সেই নেটওয়ার্ক। ফলে এক গাছের অনুভূতি সহজেই পৌঁছে যেতে পারে আরেকটা গাছে!
ছত্রাক যেমন গাছের উপকার করে, তেমনি গাছও ছত্রাকের প্রয়োজন মেটায়। ছত্রাক মাটি থেকে পানি আর ভিটামিন নিয়ে গাছের শিকড়ে পৌঁছে দেয়। গাছ সেসব দিয়ে মজাদার খাবার বানায়। খাবারটা হলো চিনি। ছত্রাকের তো ক্লোরোফিল থাকে না। তাই সে গাছের বানানো সেই খাবারে ভাগ বসায়! শিকড় থেকে শুষে নেয় ভিটামিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান।
গাছের গোপন ভাষা!
মাইকোরিঝিয়া শিকড়কে মাটি থেকে পানি এনে দেয়। বিনিময়ে সে কী পায়? ঠিক ধরেছ, খাবার। তবে এখানেই শেষ নয়। মাইকোরিঝিয়া শিকড়ের আরো কাজ আছে। সে অপর গাছের মাইকোরিঝিয়া শিকড়ের সঙ্গেও যোগাযোগ তৈরি করে। আর এভাবেই একটা গাছের খবরাখবর জানা হয়ে যায় আরেকটা গাছের। ধরো, কোনো একটা গাছের খাবারের দরকার হলো, মাইকোরিঝিয়া শিকড়ের মাধ্যমে তা জেনে ফেলল আরেকটা গাছ। তখন নিজের খাবার থেকে সেই ক্ষুধার্ত গাছকে কিছু খাবার পাঠিয়ে দেয়! সেটাও অবশ্য শিকড়ের মাধ্যমেই!
মনে মনে ভাবছ, আদতেই কি এক গাছ আরেক গাছকে খাবার দিতে পারে? এটা পরীক্ষা করে দেখেছেন এক বিজ্ঞানী। নাম সুজানা সিমার্ড। তিনি বড় বড় গাছের মাঝখানে একটা ছোট্ট গাছের চারা বেছে নিয়েছিলেন। তারপর ওটাকে কিছু দিয়ে ঢেকে দিলেন, যেন একটুও রোদ না পায়। আর রোদ না পেলে কী হবে, সে তো জানোই! গাছের সালোকসংশ্লেষণ হবে না। খাবারও তৈরি হবে না। ফলে চারাটা না খেতে পেয়ে মারা যাবে।
এভাবেই কয়েক দিন গেল। হঠাৎ সুজানা সিমার্ড ভারি আশ্চর্য হয়ে দেখলেন, সেই চারাটা দিব্যি বেড়ে উঠছে! কারণটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ এখন! কারণ অন্য সব বড় গাছ তাদের মাইকোরিঝিয়া শিকড় দিয়ে ছোট চারাগাছটার শিকড়ে খাবার পাঠিয়েছে।
নেটওয়ার্ক হ্যাক করতে জানে!
কিছু গাছ আবার বড্ড চালাক। তারা মাইকোরিঝিয়া শিকড়কে ইচ্ছামতো কাজে লাগায়। যেমন ধরো, অর্কিড। আগেই তো বলেছি, অনেক গাছের মাইকোরিঝিয়া শিকড় একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকে। ফলে গড়ে ওঠে এক বিশাল নেটওয়ার্ক, যে নেটওয়ার্কের মধ্য দিয়ে এক গাছ থেকে পুষ্টি, খাবার, পানি সহজেই অন্য কোনো গাছে যাওয়া-আসা করতে পারে। সুযোগটা লুফে নেয় অর্কিড। ক্লোরোফিল থাকে না বলে তারা কখনোই খাবার তৈরি করতে পারে না। তাই তারা এই নেটওয়ার্ক থেকে খাবার বাগিয়ে নিয়ে খেতে থাকে। হয়তো বাকি গাছগুলোও সেটা জানে। তবু কিচ্ছুটি বলে না!
এমনকি কিছু গাছ এই মাইকোরিঝিয়া শিকড়ের নেটওয়ার্কে বিষও ছেড়ে দেয়। কালো কাঠবাদাম তেমনই এক গাছ। সে ‘জাগলোন’ নামের এক প্রকার বিষ ছড়িয়ে দেয় মাইকোরিঝিয়া শিকড়ের নেটওয়ার্কে। ফলে আশপাশের অন্য গাছগুলো আর বাড়তে পারে না ঠিকঠাক। কোনো কোনোটা তো মরেই যায়। কাঠবাদাম এমনটা করে কেন? ওর একটু বেশি পুষ্টির দরকার হয়। তাই আশপাশের গাছকে হটিয়ে সে বেশি পুষ্টি নেওয়ার চিন্তায় ব্যস্ত থাকে।
কিছু গাছ আবার অন্য কারণেও বিষ ছড়ায়। জানোই তো, শীতের দিনে মাটিতে পুষ্টির বেশ ঘাটতি পড়ে। তখন সূর্যের আলোও থাকে কম। ফলে গাছ ঠিকমতো খাবার পায় না। তাই বেঁচে থাকার জন্য রসুন, সরিষার মতো উদ্ভিদ মাইকোরিঝিয়া শিকড়ের নেটওয়ার্কে বিষ ছড়িয়ে দেয়, যে কারণে আশপাশে থাকা গাছগুলো মরে ভূত হয়। এতে সরিষা ও রসুন ঠিকমতো পুষ্টি পেতে পারে। তা ছাড়া এসব বিষ গাছগুলোকে শক্তপোক্ত হতেও সাহায্য করে। ফলে যা হয়, প্রবল শীতেও তারা চমৎকার টিকে থাকতে পারে। বিষ ছড়িয়ে দেওয়ার পর পোকামাকড়ও এসব গাছের কাছে ভিড়তে পারে না!
জটিল বন্ধন!
এভাবেই একটা গাছের শিকড় অনেক গাছের শিকড়ের সঙ্গে জুড়ে যায়, যেন সব গাছ মিলে একটাই বড়সড় গাছ! তাইতো এক গাছের বিপদ হলে তক্ষুনি জেনে যায় অন্য গাছগুলো! ধরো, কোনো একটা গাছের পাতায় একটা শুঁয়াপোকা এসে বসল। পাতা খেতে শুরু করল কুচকুচ করে। তখন সেই গাছটা কী করবে? তার নিজের মাইকোরিঝিয়া শিকড় থেকে নেটওয়ার্কে রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে দেবে। সেটা নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়তেই অন্য গাছগুলো তা টের পেয়ে যাবে। ফলে তারাও এমন কিছু রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে দেবে পাতায় আর কাণ্ডে, যা শুঁয়াপোকার একেবারেই পছন্দ হবে না। তখন শুঁয়াপোকাকে মানে মানে কেটে পড়তে হবে।
এবার বলো, গাছ কি আমাদের মতোই সুন্দর একটা সামাজিক জীবন যাপন করে না? তাই কখনো শুধু শুধু গাছের ডাল ভেঙো না। পাতাও ছিঁড়ো না। জানোই তো, যাদের এত বুদ্ধি আছে, তাদের নিশ্চয়ই ব্যথাও আছে। বলতে পারে না, তবে ব্যথাটা ঠিকই পায়!