Loading..

শিক্ষায় অগ্রযাত্রা

রিসেট

০৫ জুন, ২০২৩ ০৩:১০ পূর্বাহ্ণ

প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে ডিজিটাল কন্টেন্টের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

শিক্ষাই একটি জাতির উন্নতির চাবিকাঠি। জ্ঞান, মেধা ও মননে আধুনিক এবং চিন্তা-চেতনায় অগ্রসর একটি সুশিক্ষিত জাতিই একটি দেশকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে পারে। আর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বর্তমান বিশ্বের সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মূল হাতিয়ার। আধুনিক যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে স্থান করে নিয়েছে তথ্য-প্রযুক্তি। আর তাইতো একবিংশ শতাব্দির সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ দুই-ই আবর্তিত হচ্ছে তথ্য-প্রযুক্তিকে ঘিরে। তথ্য-প্রযুক্তিই আগামী দিনে জাতীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিবে এবং শিক্ষা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করবে।  শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বর্তমানে সারা বিশ্বব্যাপী। জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০, জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালা ২০০৯ ও ৭ম পঞ্চবাষির্কী পরিকল্পনায় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়ও কম্পিউটার, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। শিক্ষা উপকরণ ডিজিটালাইজেশন ও তথ্য-প্রযুক্তির সমন্বয়ে শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন শিক্ষার মানোন্নয়নে যুগোপযোগী ভূমিকা পালন করছে। আর শিক্ষার প্রাথমিক স্তরেই এ ডিজিটালাইজেশনের ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করা উচিত।

প্রাথমিক শিক্ষার ডিজিটালাইজেশনের দুইটি দিক রয়েছেঃ

১। প্রাথমিক শিক্ষায় মাল্টিমিডিয়া তথা ডিজিটাল ক্লাসরুম এর ব্যবহার।

২। প্রাথমিক শিক্ষা কন্টেন্ট ইন্টারঅ্যাক্টিভ মাল্টিমিডিয়া ডিজিটাল ভার্সনে রুপান্তরকরণ 

  • প্রাথমিক শিক্ষায় মাল্টিমিডিয়া তথা ডিজিটাল ক্লাসরুম এর ব্যবহার

উদ্দেশ্যঃ

বিশ্বায়নের যুগে উন্নত দেশের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতকরনে শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্য-প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো এবং শ্রেণি কার্যক্রমে অন্যান্য শিক্ষা উপকরণের মতো প্রযুক্তিকেও একটি শিক্ষা উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা, যা শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন মেটাতে সহায়তা করবে।

      কর্মপদ্ধতিঃ

কম্পিউটার শিক্ষা বা ল্যাবভিত্তিক বদ্ধমূল ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে তথ্য-প্রযুক্তিকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমে কাজে লাগানো হচ্ছে। এক্ষেত্রে কম্পিউটার বা অন্যান্য তথ্য-প্রযুক্তি ব্ল্যাকবোর্ডের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে ব্যবহূত একটি আধুনিক শিক্ষা উপকরণ হিসেবে কাজ করছে। এ লক্ষ্যে সরকারের তরফ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ব্যবহূত বিভিন্ন উপকরণের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, ল্যাপটপ, ইন্টারনেট মডেম ও স্পীকারের সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। এ শ্রেণিকক্ষকেই বলা হচ্ছে ‘মাল্টিমিডিয়া ক্লাশরুম’।

প্রয়োজনীয়তাঃ

  • বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা লাভ এবং তা আয়ত্ত ও প্রয়োগ করা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত।
  • জাতিসংঘ গৃহীত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’য় (এসডিজি) সকলের জন্য টেকসই গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষার উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
  • শিশুদের শিক্ষার পরিবেশ, পাঠদান পদ্ধতি ও বিষয়বস্তু আকর্ষণীয় ও আনন্দময় করে তোলা অতি জরুরি।
  • মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে বিকশিত চিন্তাশক্তি, কল্পনাশক্তি এবং অনুসন্ধিৎসু মননের অধিকারী হয়ে সকল শিক্ষার্থী যাতে প্রতিস্তরে মানসম্পন্ন প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জন করতে পারে তা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল শিক্ষা কন্টেন্টের ব্যবহার অত্যাবশ্যক।
  • দেশজ আবহ ও উপাদান সমপৃক্ততার মাধ্যমে শিক্ষাকে শিক্ষার্থীর চিন্তা-চেতনা ও সৃজনশীলতার উজ্জীবন এবং তার জীবন-ঘনিষ্ঠ জ্ঞান বিকাশে সহায়ক।
  • প্রাথমিক শিক্ষা কন্টেন্ট ইন্টারঅ্যাক্টিভ মাল্টিমিডিয়া ডিজিটাল ভার্সনে রুপান্তরকরণ 

উদ্দেশ্যঃ

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃক প্রণীত প্রাথমিক শিক্ষাক্রমের (প্রথম-পঞ্চম শ্রেণি) আলোকে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান এবং বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় বিষয়ক (১৭টি বইয়ের) ইন্টারঅ্যাকটিভ মাল্টিমিডিয়া ডিজিটাল শিক্ষা কন্টেন্ট তৈরি করা এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য।

কর্মপদ্ধতিঃ

পাঠ্যপুস্তকের ধারণাসমূহ আরো আকর্ষণীয় ও সহজবোধ্য করতে বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের ছবি, চার্ট, ডায়াগ্রাম, অডিও, ভিডিও সহ মাল্টিমিডিয়া উপকরণসমূহ সংযোজন করে এ্যানিমেশনের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হচ্ছে। বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিষয়ভিক্তিক শিক্ষক, প্রশিক্ষক, প্যাডাগোজি বিশেষজ্ঞ, এডুকেশন সেক্টর বিশেষজ্ঞ, চাইল্ড সাইকোলজিস্ট, কালার, প্রোগ্রামিং ও এনিমেশন বিশেষজ্ঞদের সরাসরি অংশগ্রহণ ও মতামতের ভিত্তিতে প্রতিটি অধ্যায়ের কাংখিত শিখনফলের আলোকে এই ডিজিটাল শিক্ষা কন্টেন্টসমূহ প্রস্তুত করা হচ্ছে।

প্রয়োজনীয়তাঃ

  • কন্টেন্টসমূহ শ্রেণিকক্ষে ব্যবহারের মাধ্যমে পাঠ্যবিষয়কে সহজ এবং শিখন-শেখানো প্রক্রিয়াকে অংশগ্রহণমূলক, আকর্ষণীয় ও আনন্দদায়ক করে তোলা।
  • কন্টেন্টসমূহ শ্রেণিকক্ষে ব্যবহারের মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষকে শিক্ষার্থী কেন্দ্রিক শ্রেণিকক্ষে পরিণত করা ।
  • পাঠদানকে অধিকতর মনযোগ-আকর্ষন করা এবং বিষয়ভিত্তিক ধারণা স্পষ্ট করা ও উন্নততর প্রয়োগ ।
  • পাঠ্য সম্পর্কে শিক্ষকের অনুধাবন বৃদ্ধি ।
  • শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের জন্য স্ব-শিক্ষণের ব্যবস্থা করা ।
  • আধুনিক কম্পিউটার প্রযুক্তির সাথে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পরিচিত করানো ।

বর্তমান অগ্রগতিঃ
বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে কম্পিউটারকে শিক্ষাদানের উপকরণ হিসেবে ব্যবহারের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে নানারকম উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিম্নরুপঃ

  • ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রোগ্রামের উদ্যোগে ৭টি বিদ্যালয়ের ২৩ জন শিক্ষক নিয়ে পাইলট আকারে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল। এ পাইলট কর্মসূচির সফল অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে, এটুআই প্রোগ্রামের সহযোগিতায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সারাদেশে পঁচিশ হাজারের বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করেছে। এর মধ্যে ২০,৫০০ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘শিক্ষায় তথ্য-প্রযুক্তি’ প্রকল্পের মাধ্যমে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হয়েছে।
  • এটুআই প্রোগ্রামের সহযোগিতায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় উদ্যোগে ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৫৫ হাজারের বেশি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষককে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ও ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। শিক্ষকগণ বিজ্ঞান, গণিত, ভূগোল, ধর্ম, বাংলা, কৃষিশিক্ষাসহ প্রতিটি বিষয়ের ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করছেন ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমে ব্যবহার করছেন। বাংলাদেশের সকল শিক্ষকদের একটি কমন প্ল্যাটফরমে নিয়ে আসার জন্য ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহযোগিতায় এটুআই প্রোগ্রাম শিক্ষক বাতায়ন (gov.bd) তৈরি করেছে।
  • শিক্ষকগণ তাদের তৈরিকৃত ডিজিটাল কনটেন্ট, ভিডিও, এনিমেশন এখানে শেয়ার করেন এবং অন্যান্য শিক্ষকগণ তা প্রয়োজনে ডাউনলোড করে নেন। শিক্ষক বাতায়নে মোট ৪৫,০০০ জন শিক্ষক রয়েছেন, যারা নিয়মিত ডিজিটাল কনটেন্ট আপলোড করছেন ও ডাউনলোড করছেন। এখানে ২৫ হাজারের বেশি ব্লগপোস্ট ও ১২ হাজারের বেশি ডিজিটাল কনটেন্ট রয়েছে। শিক্ষক বাতায়নের সদস্য সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। গ্রাম-শহরের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যকার বৈষম্য দূর করছে শিক্ষক বাতায়ন।
মন্তব্য করুন