Loading..

শিক্ষায় অগ্রযাত্রা

রিসেট

০৬ মে, ২০২৩ ০২:২৭ অপরাহ্ণ

✅✅ রাঙামাটির তিনটি উপজেলা যুক্ত হবে সড়ক পথে।
ষাটের দশকে খরস্রোতা কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ নির্মাণের ফলে সৃষ্টি হয় ৭২৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বিস্তৃত কাপ্তাই হ্রদ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্ববৃহৎ এ কৃত্রিম জলাধার সৃষ্টির ফলে বিস্তীর্ণ সড়ক পথ তলিয়ে যায় কাপ্তাই হ্রদে। যে কারণে আয়তনে দেশের সবচেয়ে বড় জেলা রাঙ্গামাটির তিনটি উপজেলাই পুরোপুরি হ্রদবেষ্টিত হয়ে পড়ে। বিলাইছড়ি, জুরাছড়ি ও বরকল নামের এ তিনটি উপজেলা সদরে যাতায়াতে নৌ-পথ ছাড়া বিকল্প নেই। এতে এসব এলাকার বাসিন্দারা দুর্গমতা ও ভৌগোলিক কারণে রয়েছেন বিপাকে। পাহাড়ি কৃষি পণ্য পরিবহন কিংবা বাজারজাতে দুর্ভোগ, স্বাস্থ্যসেবা ও দৈনন্দিন জীবনযাপনে ভোগান্তির কারণে মৌলিক সেবা থেকেও বঞ্চিত তারা। শুষ্ক মৌসুমে ভোগান্তির মাত্রা বেড়ে যায় কয়েকগুণ।এদিকে পুরোপুরি কাপ্তাই হ্রদবেষ্টিত তিনটি উপজেলাকে পাশের বাঘাইছড়ি-লংগদু ও কাপ্তাই উপজেলার সঙ্গে সড়ক পথে সংযোগ করতে একটি উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার কারিগরপাড়া বাজার থেকে বাঘাইছড়ি উপজেলার বাঘাইহাট পর্যন্ত ২০০ কিলোমিটার গ্রামীণ পাকা সড়ক তৈরির প্রস্তাবনা তৈরি করে প্রধান কার্যালয়ে পাঠিয়েছে এলজিইডি। এ প্রস্তাবনার আওতায় কাপ্তাই থেকে বিলাইছড়ি উপজেলা, বিলাইছড়ি থেকে জুরাছড়ি হয়ে বরকল এবং বরকল থেকে লংগদু উপজেলার তিনটি ইউনিয়নসহ বাঘাইছড়ি উপজেলার বাঘাইহাট পর্যন্ত ২০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দুই লেনের সড়ক নির্মাণ করা হবে। 
সংশ্লিষ্ট দপ্তর জানিয়েছে, প্রস্তাবনাটি এরই মধ্যে এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাবটি অনুমোদন পেলে পরবর্তী সময়ে পূর্ণাঙ্গভাবে উন্নয়ন প্রকল্প পরিকল্পনা (ডিপিপি) প্রস্তুত করা হবে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষে ডিপিপিতে কোন উপজেলায় কয়টি সেতু, কয়টি কালভার্ট নির্মাণের করা লাগবে, সেসব বিষয় উঠে আসবে।
এলজিইডি রাঙ্গামাটি কার্যালয় সূত্র জানায়, ‘কোর রোড নেটওয়ার্ক’ বা প্রধান সড়ক সংযোগ কার্যক্রমের আওতায় কাপ্তাই উপজেলার কারিগরপাড়া বাজার থেকে বাঘাইছড়ি উপজেলার বাঘাইহাট পর্যন্ত ২০০ কিলোমিটার সড়ক হবে। গ্রামীণ হলেও সড়কটি মোট ২৪ ফুট প্রশস্ত হবে। এর মধ্যে ১৮ ফুট দুই লেনের পাকা সড়ক হবে। মূলত কাপ্তাই হ্রদের পূর্বদিকের তিন উপজেলাকে সড়ক পথে সংযুক্ত করার এ উদ্যোগে কাপ্তাই, লংগদু ও বাঘাইছড়ি উপজেলাও সম্পৃক্ত করা হয়েছে। 
প্রস্তাবিত ২০০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরে কাপ্তাই উপজেলার কারিগরপাড়া বাজার থেকে ভালুকিয়া হয়ে বিলাইছড়ি উপজেলা পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন কার্যক্রমের আওতায় এসেছে। ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের ৪০ কিলোমিটার সড়কে ১৬টি ছোট-বড় সেতু নির্মাণ করা হবে।  
স্থানীয় ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্ষা মৌসুমে কাপ্তাই হ্রদে নৌ-পথের মাধ্যমে পাহাড়ি কৃষি পণ্য পরিবহন ও যাতায়াতের ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তি হলেও শুষ্ক মৌসুমে দুর্ভোগ বেড়ে যায়। মূলত গ্রীষ্ম মৌসুমে জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি ও বরকলে লঞ্চসহ অন্যান্য নৌ-যান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিপাকে পড়েন স্থানীয়রা। তাই ২০০ কিলোমিটারের এ সড়কটি যদি বাস্তবায়ন হয় সেক্ষেত্রে পাহাড়ি এলাকার মানুষের কৃষিপণ্য বাজারজাত ও পরিবহন ব্যয় কমার পাশাপাশি দুর্ভোগ লাঘব হবে। অন্যদিকে ছয়টি উপজেলার মধ্যে অভ্যন্তরীণ সড়ক পথে যোগাযোগের দ্বার উন্মোচন হবে।জানতে চাইলে জুরাছড়ি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সুরেশ কুমার চাকমা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জুরাছড়ি উপজেলার সঙ্গে পাশের দুই উপজেলা বিলাইছড়ি ও বরকলের সঙ্গে পাহাড়ি সড়ক রয়েছে। তবে এ দুটি সড়কে যানবাহন চলাচলের কোনো উপায় নেই। হেঁটে জুরাছড়ি থেকে বরকল সদরে যেতে ৩-৪ ঘণ্টা সময় লাগে। আর জুরাছড়ি থেকে বিলাইছড়ি সদরে যেতে ৮-৯ ঘণ্টা সময় লাগে। জুরাছড়ি থেকে বিলাইছড়ি পর্যন্ত পাকিস্তান আমলের এ সড়কটির জন্য আমরা বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রণালয়ের লিখলেও কিছুই হয়নি। আমি উপজেলা পরিষদের দায়িত্ব নেয়ার পর সংসদ সদস্যের ডিওলেটার নিয়ে একাধিকবার আবেদন জমা দিলেও কোনো কাজ হয়নি। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় স্থানীয় কৃষক বাজারে কৃষিপণ্য আনতে পারেন না। দুর্গম অঞ্চলে উৎপাদিত কৃষিপণ্য যদি সহজে উপজেলা সদর ও জেলা সদরে পরিবহন করা যেত সেক্ষেত্রে আমাদের এলাকার কৃষক ও জুমিয়া পরিবারগুলো আর্থিকভাবে আরো লাভবান হতো। এখন ফসল ফলালেও বাজারে আনতে পারেন না, রাস্তা না থাকায়।’
এলজিইডি রাঙ্গামাটি কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আহামদ শফি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কোর রোড নেটওয়ার্কের আওতায় রাঙ্গামাটির উপজেলাকে সড়ক পথে সংযোগ করতে ২০০ কিলোমিটার সড়ক ও সেতু নির্মাণের একটি প্রস্তাবনা হেড কোয়ার্টারে পাঠানো হয়েছে। এ প্রস্তাবনায় কাপ্তাইয়ের কারিগরপাড়া বাজার থেকে বিলাইছড়ি পর্যন্ত, বিলাইছড়ি-জুরাছড়ি-বরকল হয়ে লংগদু উপজেলার ভাসান্যাদাম, বগাচতর, গুলশাখালী ইউনিয়নের ওপর দিয়ে বাঘাইছড়ির আমতলী, সারোয়াতলী ও বাঘাইছড়ি ইউনিয়ন হয়ে সড়ক বাঘাইহাট বাজার পর্যন্ত প্রায় ২০০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হবে। এ সড়কে বিভিন্ন জায়গায় এখনো কাঁচা রয়েছে, কিছু পাহাড়ি এলাকায় হাঁটার উপযোগী সরুপথও রয়েছে। তবে প্রস্তাবিত প্রকল্প পাস হলে পুরো সড়কটি ২৪ ফুট ও দুই লেনের পাকা সড়কে পরিণত হবে।’
প্রাক্কলিক ব্যয় সম্পর্কে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, আমরা মূলত ১ কিলোমিটারে ৩ কোটি টাকা ব্যয় ধরে থাকি, সে হিসাবে ২০০ কিলোমিটার সড়কে ৬০০ কোটি টাকা এবং সেতু, কালভার্ট মিলিয়ে ৮০০ কোটি টাকার ওপর হতে পারে। তবে প্রস্তাবনাটি অনুমোদন পেলে আমরা বাস্তবিক সমীক্ষা করে ডিপিপিতে চূড়ান্ত প্রাক্কলিক ব্যয় নির্ধারণ করব।’ প্রকৌশলী আরো বলেন, ‘বিশেষত কাপ্তাই হ্রদের পূর্বপাড়ের (বিলাইছড়ি, জুরাছড়ি ও বরকল) তিন উপজেলাসহ পাহাড়ি এলাকার মানুষ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে কৃষি পণ্য বাজারজাত, মালাপত্র, রোগী ও যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে দীর্ঘকাল ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। এলজিইডির এ উদ্যোগটি বাস্তবায়ন হলে হ্রদবেষ্টিত তিন উপজেলা ছাড়াও বাঘাইছড়ি, লংগদু ও কাপ্তাই উপজেলার কিছু অংশের মানুষ দুর্ভোগ থেকে পরিত্রাণ পাবে।’
মন্তব্য করুন