সহকারী শিক্ষক
১৩ এপ্রিল, ২০২৩ ১০:২৪ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশে বিজ্ঞানের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এ কারণে শিক্ষা ব্যবস্থায় বিজ্ঞান শিক্ষার গুরুত্ব সবসময়ই ছিল। বিজ্ঞানের প্রসারের কারণেই বিশ্ব আজ এতটা উন্নত হতে পেরেছে। পুরো বিশ্বের সর্বত্র যেখানে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসার ঘটেছে, সেখানে আমাদের দেশে এখনো বিজ্ঞান শিক্ষাকে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে জনপ্রিয় করে তোলা সম্ভব হয়নি। যে কারণে বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম রয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ের কারিকুলামে সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলা হলেও সেটি আর করা হয়নি। এর সঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায়ও বর্তমানে প্রচুর পরিমাণে শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে, কিন্তু তারা সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার শিক্ষার্থীদের মতো বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ সেভাবে পায় না। এছাড়া নারীরা বিজ্ঞানচর্চায় পিছিয়ে রয়েছে, যে কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো বেশিসংখ্যক নারী ও মেয়েকে বিজ্ঞানে উৎকর্ষ লাভের সুযোগ দিতে বৈশ্বিক প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে শুক্রবার অনুষ্ঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ডে অব উইমেন অ্যান্ড গার্লস ইন সায়েন্স’ বা বিজ্ঞানে নারীবিষয়ক আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে প্রদত্ত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী সবার মানসিকতা পরিবর্তনে জোর দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নিজেদের পরিবর্তনের লক্ষ্যে এজেন্ট হিসেবে কাজ করার জন্য নারীদের প্রতি আহ্বান জানান। বিজ্ঞানে নারীদের অংশগ্রহণের হার অনেক কম জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী এটি দুর্ভাগ্যজনক হিসেবে গণ্য করেছেন। বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞানীদের মধ্যে নারী মাত্র ১২ শতাংশ ও গবেষক ৩০ শতাংশ। এজন্য মানসিকতা ও শিক্ষার পরিবেশের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তাগিদ দেন যাতে আরো বেশিসংখ্যক নারী ও মেয়েরা বিজ্ঞানে উৎকর্ষ লাভ করতে পারে। অন্যদিকে একই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল মিলনায়তনে ‘১৩তম জাতীয় বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড ২০২৩’-এর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বিজ্ঞানচর্চার ওপর গুরুত্বারোপ ও সব ক্ষেত্রে বিজ্ঞানচর্চা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন। বিজ্ঞান অধ্যয়ন, শেখার তাগিদ, বিজ্ঞানচর্চার মাধ্যমে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের উপলব্ধির বিষয়ে জোর দেয়ার পাশাপাশি সব ক্ষেত্রে বিজ্ঞানচর্চার কথা বলেছেন। বর্তমান শিক্ষা নীতিমালায় বিজ্ঞান শিক্ষার অন্তর্ভুক্তিসহ নতুন শিক্ষা ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিজ্ঞানকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে বিজ্ঞান শিক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্ব অনেক বেশি। এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। প্রথাগত শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা চার দেয়ালের মাঝে আটকে থাকে। নির্দিষ্ট সিলেবাস এবং শ্রেণী কার্যক্রমের বাইরে তাদের যেন আর কোনো ফুরসত নেই। অথচ চারদিকের পরিবেশ থেকে আনন্দের সঙ্গে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। ড. কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের মাধ্যমে যে শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল তা আজও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। সে নীতিকে আবারো বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা করা হচ্ছে যা সব শিক্ষার্থীর বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানসিক বিকাশে সাহায্য করবে বলে শিক্ষামন্ত্রী জানান।
বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে অন্য অতিথিদের আলোচনায় বিজ্ঞানকে দেশের একটি অঙ্গ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করার কথা বলা হয়। এটা শুধু বিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয় নয় উল্লেখ করে ২২ বছর ধরে বিজ্ঞানীদের বহু প্রচেষ্টার ফলে সৃষ্ট ন্যানো টেকনোলজিকে বিজ্ঞানের অনবদ্য আবিষ্কার হিসেবে গণ্য করার বিষয়টি উঠে আসে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই বিশ্বকে হাতের মুঠোয় দেখার সুযোগ করেছে ন্যানো টেকনোলজি। বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের মূল উদ্দেশ্য হলো ছাত্রছাত্রীদের বিজ্ঞানের মূল বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত করানো। যেন উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে।
আমাদের দেশে গণিত অলিম্পিয়াডের পর বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডও নিয়মিত আয়োজিত হচ্ছে। দেশে বিজ্ঞানচর্চাকে ছড়িয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড আয়োজন করা হলেও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বিজ্ঞানচর্চায় আমাদের দেশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর তুলনায় আমাদের দেশে বিজ্ঞান শিক্ষা জনপ্রিয় নয়। স্কুল-কলেজে শুধু বিজ্ঞান শাখার শিক্ষার্থীরা এ বিষয়ে যতটুকু পড়াশোনা করে, সাধারণ ও বাণিজ্য শাখার শিক্ষার্থীদের সে তুলনায় বিজ্ঞান অনেক কম অধ্যয়ন করতে হয়। যার ফলে বিজ্ঞান সম্পর্কে জানার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট শাখার শিক্ষার্থীরাই এগিয়ে থাকে।
এছাড়া বাংলাদেশে বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে নারীদের গুরুত্ব ও নেতৃত্ব দেয়ার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তুলে ধরেছেন। মেয়েদের উৎসাহিত করার জন্য সারা দেশে ডিজিটাল সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মোট কথা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে দেশে বিজ্ঞানচর্চার পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ে জোর দেয়া হচ্ছে।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠের মতো কিছু চিত্র উদ্বেগজনক। গত বছর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অধীন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউট পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়েও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে যোগ্য প্রার্থী খুঁজে পায়নি। এক্ষেত্রে যোগ্য প্রার্থী খুঁজে না পাওয়ার কারণ হিসেবে আমাদের দেশে গবেষণা করার সুযোগ কম। গবেষণা করার জন্য যেসব সহায়তা দরকার, সেসব পাওয়া যায় না। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণার পরিবেশ কম। সেই সঙ্গে প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদটি উচ্চপর্যায়ের। এ পদের জন্য যারা আবেদনের যোগ্য, তাদের অনেকে বিদেশে ভালো বেতনে চাকরি করছেন। তাদের দেশে আনতে হলে গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ ও ভালো সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। এমন বিষয় উঠে আসে।
মোদ্দা কথা, দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় বিজ্ঞানচর্চার পরিবেশ নেই। যে কারণে মেধাবী মানুষগুলো গবেষণার জন্য উন্নত দেশগুলোয় চলে যাচ্ছেন। ফলে মেধা পাচার হচ্ছে, কিন্তু আমাদের কিছু করার থাকে না। কারণ বিজ্ঞানীদের জন্য দেশে উপযুক্ত পরিবেশ আমরা দিতে পারিনি। এক্ষেত্রে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতারও অভাব রয়েছে। বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার জন্য প্রচুর অর্থ দরকার, কিন্তু সে পরিমাণ বরাদ্দ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় করা হয় না।
যে কারণে স্কুল পর্যায়ে বিজ্ঞান মেলায় খুদে শিক্ষার্থীদের কোমল মনে বিজ্ঞান নিয়ে যে স্বপ্নের ডালপালা জন্মায়, তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে উপযুক্ত পরিবেশ না পাওয়ায় তারা বিজ্ঞানচর্চায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তাই আমাদের শিক্ষার্থীদের আগ্রহকে ধরে রাখতে হবে। তারা যেন বিজ্ঞানচর্চায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে, সেজন্য বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় বিজ্ঞান অধ্যয়নে অধিক মাত্রায় গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও বিজ্ঞানচর্চার জন্য বাজেট বৃদ্ধি করতে হবে। মূলধারার শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি মাদ্রাসাগুলোয় বিজ্ঞান পড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে কিনা সেটিও তদারকি করা প্রয়োজন।
নতুন শিক্ষাক্রমে স্কুলে বিজ্ঞান শিক্ষার ক্ষেত্রে চর্চার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ‘অনুসন্ধানী পাঠ’ নামে অনুশীলনমূলক বই অনুমোদন করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের মনে বিজ্ঞানচর্চার প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে তুলছে বলে ফলাফলও পাওয়া গেছে।
এ অবস্থায় দেশে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। আর আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে বিজ্ঞানই সব জ্ঞানের মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেয়। বিজ্ঞানের বাইরে কোনো কিছুই নেই। তাই বিজ্ঞানচর্চার বিকল্প ভাবা যায় না। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে দেশ ও সমাজ পরিচালনা হলে তাতে দেশই লাভবান হবে। একবিংশ শতাব্দীর এ সময়ে তাই বিজ্ঞানকে আশ্রয় করে আমাদের সামগ্রিক কর্মপরিকল্পনা ঢেলে সাজাতে হবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে অবলম্বন হিসেবে ধরে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জরুরি। আমরা এরই মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলছি, এখন স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে যে পদক্ষেপগুলো নেয়া হবে তাতে বিজ্ঞানের সংস্পর্শ থাকতে হবে। আমরা প্রত্যাশা করব, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে দেশের সর্বত্র বিজ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরি হবে এবং এজন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতাও নিশ্চিত করা হবে।